লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৬:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নির্ধারিত ফি উপেক্ষা করে ঢাকায় চলছে ময়লা সংগ্রহের বাড়তি বাণিজ্য

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) কর্তৃক নির্ধারিত ১০০ টাকার ফি মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বাসিন্দারা বলছেন, অনেক জায়গায় নির্ধারিত ফিয়ের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে, অথচ নিয়মিত ময়লা নেওয়া হচ্ছে না। এতে ময়লা জমে থাকা ও দুর্গন্ধ ছড়ানোর মতো ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে।

ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দা লামিয়া আক্তার জানান, তাঁর বাসায় প্রতি মাসে ১২০ টাকার রসিদ আসলেও তাঁকে আরও অতিরিক্ত ৫০ টাকা গুনতে হয়, যার কোনো রসিদ দেওয়া হয় না। একই এলাকার আরেক বাসিন্দার ভাষ্যমতে, প্রতি বাসা থেকে ১৬০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। যাত্রাবাড়ীর মীর হাজীরবাগের বাসিন্দা আরভীন সোনিয়া অভিযোগ করেন, সেখানে প্রতি মাসে ২০০ টাকা নেওয়া হলেও প্রতিদিন ময়লা নেওয়া হয় না। দু-তিন মাস ধরে কর্মীরা দুই বা তিন দিন পরপর ময়লা নিতে আসছেন। এছাড়া সেন্ট্রাল রোডের এক বাসিন্দা জানান, তাদের ফ্ল্যাটপ্রতি মাসে ২০০ টাকা করে ফি নেওয়া হচ্ছে।

এমন অনিয়ম ও ময়লা-বাণিজ্য নিয়ে গত মে মাসে প্রথম আলোতে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে উঠে আসে, ময়লা সংগ্রহের কষ্টের কাজটি নিম্ন আয়ের কর্মীরা করলেও আদায়ের বড় অংশ যায় স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারীদের পকেটে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম ঠিকাদারদের সতর্ক করে বলেছিলেন, নির্ধারিত ১০০ টাকার বেশি বিল নিলে বা প্রতিদিনের ময়লা প্রতিদিন না নিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের খবর পাওয়া যায়নি।

অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে গত ৪ জুন ডিএসসিসির সচিবের স্বাক্ষরিত একটি অফিস আদেশে ১০টি অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের (পিসিএসপি) কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়। আদেশে প্রতিদিন বর্জ্য সংগ্রহ হচ্ছে কি না, ১০০ টাকার বেশি ফি নেওয়া হচ্ছে কি না এবং সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে (এসটিএস) কার্যক্রম ঠিকভাবে চলছে কি না—তা তদারকি করে সাত দিন পরপর প্রশাসক বরাবর প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে গেলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব তেমন দেখা যাচ্ছে না। ডিএসসিসির সূত্রমতে, নিয়মিত প্রতিবেদন জমা না পড়ায় কোন ওয়ার্ডে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে বা কোন প্রতিষ্ঠান শর্ত ভাঙছে, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।

নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রসিদের বাইরে টাকা নেওয়া সেবা নয়, বরং চাঁদাবাজি। তিনি মনে করেন, শুধু অফিস আদেশে এই বাণিজ্য বন্ধ হবে না; ওয়ার্ডভিত্তিক ঠিকাদারদের তালিকা, নির্ধারিত ফি, অভিযোগ জানানোর নম্বর ও অনিয়মের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার তথ্য প্রকাশ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, কর্মকর্তারা প্রতিবেদন না দিলে তাঁরা অনিয়মে সুযোগ দিচ্ছেন এবং এই ব্যর্থতার দায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও নিতে হবে।

তবে সব জায়গায় চিত্র একই নয়। ডিএসসিসির ৭১ নম্বর ওয়ার্ডের মান্ডা এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম জানান, আগে ১২০ টাকা নেওয়া হলেও ঈদুল আজহার পর থেকে তাদের এলাকায় ১০০ টাকা করেই বিল নেওয়া হচ্ছে। অঞ্চল-৫-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উননেছা শিউলী দাবি করেন, তাদের কাছে বড় ধরনের অভিযোগ আসেনি এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে তদারকি দল গঠন করা হয়েছে। এদিকে অঞ্চল-১-এর নতুন নির্বাহী কর্মকর্তা মুহা. মাছুম বিল্লাহ জানান, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত নন, তবে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবেন।

বাসিন্দাদের অনেকের আশঙ্কা, অভিযোগ করলে ময়লা নেওয়াই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। পুরান ঢাকার কায়েতটুলী এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান জানান, সপ্তাহে এক-দুই দিন ময়লা আসায় তারা নিজেরাই এখন নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা রেখে আসছেন। ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম পুনরায় জোর দিয়ে বলেছেন, ১০০ টাকার বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই এবং অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের গাফিলতি থাকলেও তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আবার অভিযোগ করলে ময়লা নেওয়াই বন্ধ হয়ে যায় কি না, এ আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।পুরান ঢাকার কায়েতটুলী এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের এলাকায় প্রতিটি বাসা থেকে মাসে ১৫০ টাকা করে ময়লার বিল নেওয়া হয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইয়াবা পাচার রোধে এআই ক্যামেরা ও নতুন চেকপোস্টের প্রস্তাব পুলিশের

নির্ধারিত ফি উপেক্ষা করে ঢাকায় চলছে ময়লা সংগ্রহের বাড়তি বাণিজ্য

প্রকাশিত হয়েছে: ০৭:৩০:৫৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) কর্তৃক নির্ধারিত ১০০ টাকার ফি মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বাসিন্দারা বলছেন, অনেক জায়গায় নির্ধারিত ফিয়ের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে, অথচ নিয়মিত ময়লা নেওয়া হচ্ছে না। এতে ময়লা জমে থাকা ও দুর্গন্ধ ছড়ানোর মতো ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে।

ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দা লামিয়া আক্তার জানান, তাঁর বাসায় প্রতি মাসে ১২০ টাকার রসিদ আসলেও তাঁকে আরও অতিরিক্ত ৫০ টাকা গুনতে হয়, যার কোনো রসিদ দেওয়া হয় না। একই এলাকার আরেক বাসিন্দার ভাষ্যমতে, প্রতি বাসা থেকে ১৬০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। যাত্রাবাড়ীর মীর হাজীরবাগের বাসিন্দা আরভীন সোনিয়া অভিযোগ করেন, সেখানে প্রতি মাসে ২০০ টাকা নেওয়া হলেও প্রতিদিন ময়লা নেওয়া হয় না। দু-তিন মাস ধরে কর্মীরা দুই বা তিন দিন পরপর ময়লা নিতে আসছেন। এছাড়া সেন্ট্রাল রোডের এক বাসিন্দা জানান, তাদের ফ্ল্যাটপ্রতি মাসে ২০০ টাকা করে ফি নেওয়া হচ্ছে।

এমন অনিয়ম ও ময়লা-বাণিজ্য নিয়ে গত মে মাসে প্রথম আলোতে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে উঠে আসে, ময়লা সংগ্রহের কষ্টের কাজটি নিম্ন আয়ের কর্মীরা করলেও আদায়ের বড় অংশ যায় স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারীদের পকেটে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম ঠিকাদারদের সতর্ক করে বলেছিলেন, নির্ধারিত ১০০ টাকার বেশি বিল নিলে বা প্রতিদিনের ময়লা প্রতিদিন না নিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের খবর পাওয়া যায়নি।

অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে গত ৪ জুন ডিএসসিসির সচিবের স্বাক্ষরিত একটি অফিস আদেশে ১০টি অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের (পিসিএসপি) কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়। আদেশে প্রতিদিন বর্জ্য সংগ্রহ হচ্ছে কি না, ১০০ টাকার বেশি ফি নেওয়া হচ্ছে কি না এবং সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে (এসটিএস) কার্যক্রম ঠিকভাবে চলছে কি না—তা তদারকি করে সাত দিন পরপর প্রশাসক বরাবর প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে গেলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব তেমন দেখা যাচ্ছে না। ডিএসসিসির সূত্রমতে, নিয়মিত প্রতিবেদন জমা না পড়ায় কোন ওয়ার্ডে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে বা কোন প্রতিষ্ঠান শর্ত ভাঙছে, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।

নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রসিদের বাইরে টাকা নেওয়া সেবা নয়, বরং চাঁদাবাজি। তিনি মনে করেন, শুধু অফিস আদেশে এই বাণিজ্য বন্ধ হবে না; ওয়ার্ডভিত্তিক ঠিকাদারদের তালিকা, নির্ধারিত ফি, অভিযোগ জানানোর নম্বর ও অনিয়মের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার তথ্য প্রকাশ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, কর্মকর্তারা প্রতিবেদন না দিলে তাঁরা অনিয়মে সুযোগ দিচ্ছেন এবং এই ব্যর্থতার দায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও নিতে হবে।

তবে সব জায়গায় চিত্র একই নয়। ডিএসসিসির ৭১ নম্বর ওয়ার্ডের মান্ডা এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম জানান, আগে ১২০ টাকা নেওয়া হলেও ঈদুল আজহার পর থেকে তাদের এলাকায় ১০০ টাকা করেই বিল নেওয়া হচ্ছে। অঞ্চল-৫-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উননেছা শিউলী দাবি করেন, তাদের কাছে বড় ধরনের অভিযোগ আসেনি এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে তদারকি দল গঠন করা হয়েছে। এদিকে অঞ্চল-১-এর নতুন নির্বাহী কর্মকর্তা মুহা. মাছুম বিল্লাহ জানান, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত নন, তবে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবেন।

বাসিন্দাদের অনেকের আশঙ্কা, অভিযোগ করলে ময়লা নেওয়াই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। পুরান ঢাকার কায়েতটুলী এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান জানান, সপ্তাহে এক-দুই দিন ময়লা আসায় তারা নিজেরাই এখন নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা রেখে আসছেন। ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম পুনরায় জোর দিয়ে বলেছেন, ১০০ টাকার বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই এবং অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের গাফিলতি থাকলেও তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আবার অভিযোগ করলে ময়লা নেওয়াই বন্ধ হয়ে যায় কি না, এ আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।পুরান ঢাকার কায়েতটুলী এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের এলাকায় প্রতিটি বাসা থেকে মাসে ১৫০ টাকা করে ময়লার বিল নেওয়া হয়।