লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৬:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের যুদ্ধকবলিত জনজীবন: বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এল এক ভিন্ন চিত্র

বিবিসির জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদক নওয়াল আল-মাগাফি তার ইরান সফরের প্রতিবেদনে যুদ্ধের বহুমুখী ও গভীর প্রভাব তুলে ধরেছেন। তিনি মিনাবের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ধ্বংসস্তূপ, বন্দর আব্বাসের অচলাবস্থা এবং তেহরানের জনসমাগম পর্যবেক্ষণ করে যুদ্ধকবলিত ইরানের সাধারণ মানুষের ভাবনা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের চিত্রটি বোঝার চেষ্টা করেছেন। বিবিসির ‘গ্লোবাল আই’-এর জন্য করা এই প্রতিবেদনটি দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত হয়েছে।

মিনাবের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পাঁচ মাস পরও ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। খননযন্ত্রের সাহায্যে এখনো একটি শিশুর মরদেহের সন্ধান করা হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পাওয়া গেছে মাহিয়া সালারি নামের আট বছর বয়সী এক শিশুর খাতা, যার পাতাগুলো এখনো অক্ষত। মিনাবের প্রসিকিউটর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিনে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় সেখানে ১৫৬ জন নিহত হন, যার মধ্যে ১২০ জনই শিশু। শিক্ষক আমাইনে নাদেমি জানান, স্কুলটি এখন কেবল দেয়াল দাঁড়িয়ে থাকা এক ধ্বংসস্তূপ, যেখান থেকে মৃত্যু ও শোকের গন্ধ ভেসে আসে। হামলায় নিহত ৯ বছর বয়সী সেতায়েশের মা মাসুমেহ মেহরান শেখাবাদি জানান, তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছে শুধু ধোঁয়া ও শিশুদের ছিন্নভিন্ন শরীরের চিহ্ন দেখেছিলেন।

এই সংঘাত ইরানকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে যা অনেকে প্রত্যাশা করেননি। তেহরান থেকে বন্দর আব্বাসগামী ৯০০ মাইল বা ১ হাজার ৪৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ট্রেন যাত্রায় শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও ফুটবলারদের সঙ্গে কথা বলে যুদ্ধের ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জানা যায়। আইনজীবী আজাদেহ জানান, ইরানিদের স্বভাবই হলো মানিয়ে নেওয়া, তবে প্রকাশ্যে রাজনীতি নিয়ে কথা বলা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রূপচর্চাবিশেষজ্ঞ সেপিদেহ বলেন, তিনি ইরানকে ভালোবাসলেও তারুণ্য ও স্বপ্ন হারিয়ে যাওয়ায় দেশ ছাড়ার কথা ভাবছেন। ফুটবলার আবদুল্লাহ জানান, শিশুভর্তি স্কুলে হামলার ঘটনায় পুরো দেশ শোকে ভেঙে পড়েছিল।

বন্দর আব্বাস, যা হরমুজ প্রণালির মূল প্রবেশদ্বার এবং ইরানের সামরিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র, সেখানে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিলের মধ্যে অন্তত ৯৬টি মার্কিন হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। জেলেরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় অনেকের রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে, তেহরানের পরিস্থিতি ভিন্ন। সেখানে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর চার মাস পর অনুষ্ঠিত জানাজায় লাখো মানুষের অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক ঐক্যের প্রদর্শনী দেখা গেছে। সুরাইয়া নামের এক তরুণী জানান, আগে সরকারের বিরোধিতা করলেও এখন অনেকে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারকে সমর্থন করছেন।

চলতি বছরের শুরুতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট ও মূল্যস্ফীতির জেরে ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক দমন-পীড়নে হাজারো মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হয়েছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে মিনাব শহর। সরকারবিরোধী এক বিক্ষোভকারী জানান, তিনি যুদ্ধ মেনে নিলেও নিরপরাধ মানুষ হত্যার বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। যুদ্ধ এখনো চলমান, আর এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত কী ধরনের উত্তরাধিকার রেখে যাবে, তা নিয়ে এক অনিশ্চিত লড়াই চলছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন

ইরানের যুদ্ধকবলিত জনজীবন: বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এল এক ভিন্ন চিত্র

প্রকাশিত হয়েছে: ১১:৩১:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

বিবিসির জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদক নওয়াল আল-মাগাফি তার ইরান সফরের প্রতিবেদনে যুদ্ধের বহুমুখী ও গভীর প্রভাব তুলে ধরেছেন। তিনি মিনাবের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ধ্বংসস্তূপ, বন্দর আব্বাসের অচলাবস্থা এবং তেহরানের জনসমাগম পর্যবেক্ষণ করে যুদ্ধকবলিত ইরানের সাধারণ মানুষের ভাবনা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের চিত্রটি বোঝার চেষ্টা করেছেন। বিবিসির ‘গ্লোবাল আই’-এর জন্য করা এই প্রতিবেদনটি দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত হয়েছে।

মিনাবের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পাঁচ মাস পরও ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। খননযন্ত্রের সাহায্যে এখনো একটি শিশুর মরদেহের সন্ধান করা হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পাওয়া গেছে মাহিয়া সালারি নামের আট বছর বয়সী এক শিশুর খাতা, যার পাতাগুলো এখনো অক্ষত। মিনাবের প্রসিকিউটর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিনে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় সেখানে ১৫৬ জন নিহত হন, যার মধ্যে ১২০ জনই শিশু। শিক্ষক আমাইনে নাদেমি জানান, স্কুলটি এখন কেবল দেয়াল দাঁড়িয়ে থাকা এক ধ্বংসস্তূপ, যেখান থেকে মৃত্যু ও শোকের গন্ধ ভেসে আসে। হামলায় নিহত ৯ বছর বয়সী সেতায়েশের মা মাসুমেহ মেহরান শেখাবাদি জানান, তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছে শুধু ধোঁয়া ও শিশুদের ছিন্নভিন্ন শরীরের চিহ্ন দেখেছিলেন।

এই সংঘাত ইরানকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে যা অনেকে প্রত্যাশা করেননি। তেহরান থেকে বন্দর আব্বাসগামী ৯০০ মাইল বা ১ হাজার ৪৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ট্রেন যাত্রায় শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও ফুটবলারদের সঙ্গে কথা বলে যুদ্ধের ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জানা যায়। আইনজীবী আজাদেহ জানান, ইরানিদের স্বভাবই হলো মানিয়ে নেওয়া, তবে প্রকাশ্যে রাজনীতি নিয়ে কথা বলা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রূপচর্চাবিশেষজ্ঞ সেপিদেহ বলেন, তিনি ইরানকে ভালোবাসলেও তারুণ্য ও স্বপ্ন হারিয়ে যাওয়ায় দেশ ছাড়ার কথা ভাবছেন। ফুটবলার আবদুল্লাহ জানান, শিশুভর্তি স্কুলে হামলার ঘটনায় পুরো দেশ শোকে ভেঙে পড়েছিল।

বন্দর আব্বাস, যা হরমুজ প্রণালির মূল প্রবেশদ্বার এবং ইরানের সামরিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র, সেখানে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিলের মধ্যে অন্তত ৯৬টি মার্কিন হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। জেলেরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় অনেকের রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে, তেহরানের পরিস্থিতি ভিন্ন। সেখানে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর চার মাস পর অনুষ্ঠিত জানাজায় লাখো মানুষের অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক ঐক্যের প্রদর্শনী দেখা গেছে। সুরাইয়া নামের এক তরুণী জানান, আগে সরকারের বিরোধিতা করলেও এখন অনেকে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারকে সমর্থন করছেন।

চলতি বছরের শুরুতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট ও মূল্যস্ফীতির জেরে ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক দমন-পীড়নে হাজারো মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হয়েছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে মিনাব শহর। সরকারবিরোধী এক বিক্ষোভকারী জানান, তিনি যুদ্ধ মেনে নিলেও নিরপরাধ মানুষ হত্যার বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। যুদ্ধ এখনো চলমান, আর এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত কী ধরনের উত্তরাধিকার রেখে যাবে, তা নিয়ে এক অনিশ্চিত লড়াই চলছে।