লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৮:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন

সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে সম্প্রতি নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. মো. জাকির হুসাইন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০ সালের আইনের বিধান অনুসরণ করে এবং রাষ্ট্রপতি ও আচার্যের অনুমোদনক্রমে তাঁকে এই উচ্চপদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ড. জাকির হুসাইন এর আগে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তবে এই নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষায়িত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন নিয়োগের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অ-বিজ্ঞান বা অ-প্রযুক্তি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য আগে বাণিজ্য বিভাগের প্রধান ছিলেন। এছাড়া নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপককে উপ-উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি অতীতে ‘বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো)’–এর চেয়ারম্যান পদে কৃষিতে পড়াশোনা করা আমলাকে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল, যা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। একজন উপাচার্যের দায়িত্ব কেবল প্রশাসনিক ফাইল সই করা নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার গতিপথ নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক ল্যাবগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং বৈজ্ঞানিক কারিকুলাম উন্নয়ন করা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যেমন একজন চিকিৎসক হওয়া বাঞ্ছনীয়, তেমনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন বিজ্ঞানী বা প্রকৌশলী থাকা জরুরি। ইসলামিক স্টাডিজ, সমাজকল্যাণ বা দর্শনের মতো মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের অধ্যাপকেরা স্বীয় ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ হলেও, এসটিইএম (সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যাথমেটিক্স) খাতের নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে।

নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাবরেটরি অবকাঠামো নির্মাণ, কারিগরি জনবল নিয়োগ এবং বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম ক্রয়ের মতো প্রাথমিক কাজগুলোতে উপাচার্যের সরাসরি কারিগরি জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। মানবিক শাখার শিক্ষকের পক্ষে ল্যাবের মান বা বিশেষায়িত যন্ত্রপাতির প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করা কঠিন, যা দীর্ঘমেয়াদে অপচয় বা ভুল ক্রয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলো ফান্ড প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের ট্র্যাক রেকর্ড যাচাই করে। একজন বিজ্ঞানীর পক্ষে ব্যক্তিগত পরিচিতি ও গবেষণার প্রোফাইল ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক সহায়তা আকর্ষণ করা সহজতর, যা একজন অবৈজ্ঞানিক ব্যাকগ্রাউন্ডের ব্যক্তির জন্য প্রায় অসম্ভব।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা ও মেধার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন নিয়োগের সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যান্ড ইমেজ এবং আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য যদি কেবল সার্টিফিকেট প্রদান না হয়ে জ্ঞান সৃজন ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব দেওয়া হয়, তবে বিশেষজ্ঞ নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

জনপ্রিয় সংবাদ

মেঘনায় সিমেন্টবোঝাই ট্রলার ডুবি, কোটি টাকার ক্ষতির দাবি মালিকের

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশিত হয়েছে: ১২:৩৮:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে সম্প্রতি নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. মো. জাকির হুসাইন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০ সালের আইনের বিধান অনুসরণ করে এবং রাষ্ট্রপতি ও আচার্যের অনুমোদনক্রমে তাঁকে এই উচ্চপদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ড. জাকির হুসাইন এর আগে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তবে এই নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষায়িত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন নিয়োগের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অ-বিজ্ঞান বা অ-প্রযুক্তি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য আগে বাণিজ্য বিভাগের প্রধান ছিলেন। এছাড়া নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপককে উপ-উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি অতীতে ‘বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো)’–এর চেয়ারম্যান পদে কৃষিতে পড়াশোনা করা আমলাকে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল, যা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। একজন উপাচার্যের দায়িত্ব কেবল প্রশাসনিক ফাইল সই করা নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার গতিপথ নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক ল্যাবগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং বৈজ্ঞানিক কারিকুলাম উন্নয়ন করা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যেমন একজন চিকিৎসক হওয়া বাঞ্ছনীয়, তেমনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন বিজ্ঞানী বা প্রকৌশলী থাকা জরুরি। ইসলামিক স্টাডিজ, সমাজকল্যাণ বা দর্শনের মতো মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের অধ্যাপকেরা স্বীয় ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ হলেও, এসটিইএম (সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যাথমেটিক্স) খাতের নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে।

নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাবরেটরি অবকাঠামো নির্মাণ, কারিগরি জনবল নিয়োগ এবং বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম ক্রয়ের মতো প্রাথমিক কাজগুলোতে উপাচার্যের সরাসরি কারিগরি জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। মানবিক শাখার শিক্ষকের পক্ষে ল্যাবের মান বা বিশেষায়িত যন্ত্রপাতির প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করা কঠিন, যা দীর্ঘমেয়াদে অপচয় বা ভুল ক্রয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলো ফান্ড প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের ট্র্যাক রেকর্ড যাচাই করে। একজন বিজ্ঞানীর পক্ষে ব্যক্তিগত পরিচিতি ও গবেষণার প্রোফাইল ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক সহায়তা আকর্ষণ করা সহজতর, যা একজন অবৈজ্ঞানিক ব্যাকগ্রাউন্ডের ব্যক্তির জন্য প্রায় অসম্ভব।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা ও মেধার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন নিয়োগের সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যান্ড ইমেজ এবং আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য যদি কেবল সার্টিফিকেট প্রদান না হয়ে জ্ঞান সৃজন ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব দেওয়া হয়, তবে বিশেষজ্ঞ নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।