লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০১:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মিরপুরে জমি দখল ও চাঁদাবাজিতে সক্রিয় মামুন বাহিনীর ত্রাস

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী থানার বাইগারটেক এলাকায় আবাসন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলীর প্রায় ২৮ কাঠা জমি রয়েছে। তিনি সেখানে সীমানাপ্রাচীর দিয়ে পাঁচটি টিনের ঘর তৈরি করে ভাড়া দিয়েছিলেন। মোহাম্মদ আলী ১৭ সেপ্টেম্বর জানান, গত ৩০ এপ্রিল রাতে একদল সন্ত্রাসী বুলডোজার দিয়ে তাঁর জমির সীমানাপ্রাচীর ও ঘরগুলো গুঁড়িয়ে দিয়ে জমিটি দখল করে নেয়। তিনি বলেন, 'আমার জমির দাম প্রায় ২৫ কোটি টাকা। মামুন বাহিনীর সন্ত্রাসীরা সে জমি দখল করে নিয়েছে। মামুনের ভাই মশিউর রহমান আমাকে ফোন করে জমিতে যেতে নিষেধ করেছেন।'

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে মিরপুরে মামুন বাহিনীর বিরুদ্ধে জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ঝুট ব্যবসা, কেব্‌ল টেলিভিশন ও ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ বস্তির ঘর থেকে ভাড়া আদায়ের অভিযোগ বাড়ছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, বিদেশে থাকা চারজন সন্ত্রাসী মিরপুরে চারটি বাহিনী পরিচালনা করছে, যাদের একত্রে ‘ফোর স্টার গ্রুপ’ বলা হয়। এর মধ্যে মামুন বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মফিজুর রহমান মামুন। এছাড়া ভাষানটেক থানা বিএনপির ১ নম্বর আহ্বায়ক মো. ইব্রাহিম ওরফে ‘কিলার ইব্রাহিম’, মিরপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহাদত হোসেন এবং মোক্তার নামের আরেক সন্ত্রাসী আলাদা তিনটি দল নিয়ন্ত্রণ করেন।

ইব্রাহিম ও তাঁর অনুসারীরা মিরপুর-১৩, ১৪, ভাষানটেক ও কালশী এলাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করেন। শাহাদত ও তাঁর দল মিরপুর-১, ২ ও ৬ নম্বর এবং মোক্তার মিরপুর-১০ ও ১১ নম্বরের কিছু এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন। সবচেয়ে বড় বাহিনীটির নিয়ন্ত্রক মফিজুর রহমান মামুন মালয়েশিয়ায় থেকে পল্লবী, মিরপুর-১২, সাগুফতা ও বাউনিয়া এলাকার চাঁদাবাজি ও জমি দখল নিয়ন্ত্রণ করেন। মামুন ২০০১ সালে কিছুদিন কারাভোগের পর ২০০৪ সালে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে যান। সেখানে পাসপোর্ট জালিয়াতি ও অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে ২০০৮ সালে গ্রেপ্তার হয়ে ১০ বছর সাজা ভোগ করেন এবং জেল থেকে বসেই মিরপুরের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতেন। ২০২১ সালে বাংলাদেশে আসার পর তিনি গ্রেপ্তার হন। তখন পুলিশ জানায়, তাঁর বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় চাঁদাবাজি, খুন, মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও ডাকাতিসহ ২৭টি মামলা, ১৫টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও ২টি সাজা পরোয়ানা রয়েছে। জামিনে বেরিয়ে তিনি আবার পালিয়ে যান এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তাঁর প্রভাব আরও বেড়েছে।

বিদেশে থাকলেও মামুনের আপন দুই ভাই মো. জামিল রহমান ও মশিউর রহমান দেশে বসে বাহিনী পরিচালনা করেন। বাহিনীতে দেলোয়ার হোসেন রুবেল, মো. রফিকুল, আলমগীর, মোতালেব, রাজন, সামি, ভাগনে মামুন, সোহেল, কায়েস, সেলিম, প্রকাশ, সুজন, হাবিব, সাগর, রোকন, শামিম ও জনিসহ অনেকে রয়েছেন। জনি ও রোকন যুবদল নেতা কিবরিয়া হত্যা মামলায় কারাগারে আছেন। গত মার্চে ডিএমপির তালিকায় মিরপুরের ৭২ জন চাঁদাবাজ ও তাদের ২৫ জন আশ্রয়দাতার মধ্যে মামুন ও তাঁর দুই ভাইয়ের নাম রয়েছে। মশিউর রহমান চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জমি নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ থাকে, তাঁরা কেবল বৈধ নথিপত্র থাকলে সহায়তা করেন।

মিরপুরে ছোট-বড় প্রায় ২৩০টি পোশাক কারখানা রয়েছে, যার শতাধিক কারখানা মামুন বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। অভিযোগ রয়েছে, তারা কারখানা থেকে মাসে ২০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা তোলে। সাগুফতা হাউজিং এলাকায় ১৮টি পরিবারের জমি ও মো. ইউনুস মিয়ার ৫ কাঠার প্লটসহ মোট ১০ কাঠা জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের জুলাই মাসে পল্লবীতে এ কে বিল্ডার্সের কার্যালয়ে চাঁদা না পেয়ে হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় মামুনের ভাই জামিল জড়িত বলে পুলিশ জানায়। কিবরিয়া হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার শুটাররাও মামুন বাহিনীর সদস্য বলে পুলিশ জানিয়েছে। কিবরিয়ার স্ত্রী সাবিহা আক্তারের অভিযোগ, মশিউর শুটার ভাড়া করে তাঁর স্বামীকে হত্যা করেছেন।

ডিএমপির মিরপুর বিভাগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে জুলাই পর্যন্ত ৮৯টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ে চাঁদাবাজির ২২৪টি, চুরির ৫৩০টি, ছিনতাইয়ের ১২৮টি ও ডাকাতির ৮টি মামলা হয়েছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ওসমান গণি জানান, অপরাধীদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়া চলছে। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক জানান, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সমাজকল্যাণ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ না হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এছাড়া পল্লবীতে ‘ভইরা দে গ্রুপ’ ও ‘বাহুবলী গ্রুপ’ নামে কিশোর গ্যাংও সক্রিয় রয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই, মজুতদারির বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি

মিরপুরে জমি দখল ও চাঁদাবাজিতে সক্রিয় মামুন বাহিনীর ত্রাস

প্রকাশিত হয়েছে: ০৭:০৫:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী থানার বাইগারটেক এলাকায় আবাসন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলীর প্রায় ২৮ কাঠা জমি রয়েছে। তিনি সেখানে সীমানাপ্রাচীর দিয়ে পাঁচটি টিনের ঘর তৈরি করে ভাড়া দিয়েছিলেন। মোহাম্মদ আলী ১৭ সেপ্টেম্বর জানান, গত ৩০ এপ্রিল রাতে একদল সন্ত্রাসী বুলডোজার দিয়ে তাঁর জমির সীমানাপ্রাচীর ও ঘরগুলো গুঁড়িয়ে দিয়ে জমিটি দখল করে নেয়। তিনি বলেন, 'আমার জমির দাম প্রায় ২৫ কোটি টাকা। মামুন বাহিনীর সন্ত্রাসীরা সে জমি দখল করে নিয়েছে। মামুনের ভাই মশিউর রহমান আমাকে ফোন করে জমিতে যেতে নিষেধ করেছেন।'

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে মিরপুরে মামুন বাহিনীর বিরুদ্ধে জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ঝুট ব্যবসা, কেব্‌ল টেলিভিশন ও ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ বস্তির ঘর থেকে ভাড়া আদায়ের অভিযোগ বাড়ছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, বিদেশে থাকা চারজন সন্ত্রাসী মিরপুরে চারটি বাহিনী পরিচালনা করছে, যাদের একত্রে ‘ফোর স্টার গ্রুপ’ বলা হয়। এর মধ্যে মামুন বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মফিজুর রহমান মামুন। এছাড়া ভাষানটেক থানা বিএনপির ১ নম্বর আহ্বায়ক মো. ইব্রাহিম ওরফে ‘কিলার ইব্রাহিম’, মিরপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহাদত হোসেন এবং মোক্তার নামের আরেক সন্ত্রাসী আলাদা তিনটি দল নিয়ন্ত্রণ করেন।

ইব্রাহিম ও তাঁর অনুসারীরা মিরপুর-১৩, ১৪, ভাষানটেক ও কালশী এলাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করেন। শাহাদত ও তাঁর দল মিরপুর-১, ২ ও ৬ নম্বর এবং মোক্তার মিরপুর-১০ ও ১১ নম্বরের কিছু এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন। সবচেয়ে বড় বাহিনীটির নিয়ন্ত্রক মফিজুর রহমান মামুন মালয়েশিয়ায় থেকে পল্লবী, মিরপুর-১২, সাগুফতা ও বাউনিয়া এলাকার চাঁদাবাজি ও জমি দখল নিয়ন্ত্রণ করেন। মামুন ২০০১ সালে কিছুদিন কারাভোগের পর ২০০৪ সালে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে যান। সেখানে পাসপোর্ট জালিয়াতি ও অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে ২০০৮ সালে গ্রেপ্তার হয়ে ১০ বছর সাজা ভোগ করেন এবং জেল থেকে বসেই মিরপুরের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতেন। ২০২১ সালে বাংলাদেশে আসার পর তিনি গ্রেপ্তার হন। তখন পুলিশ জানায়, তাঁর বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় চাঁদাবাজি, খুন, মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও ডাকাতিসহ ২৭টি মামলা, ১৫টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও ২টি সাজা পরোয়ানা রয়েছে। জামিনে বেরিয়ে তিনি আবার পালিয়ে যান এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তাঁর প্রভাব আরও বেড়েছে।

বিদেশে থাকলেও মামুনের আপন দুই ভাই মো. জামিল রহমান ও মশিউর রহমান দেশে বসে বাহিনী পরিচালনা করেন। বাহিনীতে দেলোয়ার হোসেন রুবেল, মো. রফিকুল, আলমগীর, মোতালেব, রাজন, সামি, ভাগনে মামুন, সোহেল, কায়েস, সেলিম, প্রকাশ, সুজন, হাবিব, সাগর, রোকন, শামিম ও জনিসহ অনেকে রয়েছেন। জনি ও রোকন যুবদল নেতা কিবরিয়া হত্যা মামলায় কারাগারে আছেন। গত মার্চে ডিএমপির তালিকায় মিরপুরের ৭২ জন চাঁদাবাজ ও তাদের ২৫ জন আশ্রয়দাতার মধ্যে মামুন ও তাঁর দুই ভাইয়ের নাম রয়েছে। মশিউর রহমান চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জমি নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ থাকে, তাঁরা কেবল বৈধ নথিপত্র থাকলে সহায়তা করেন।

মিরপুরে ছোট-বড় প্রায় ২৩০টি পোশাক কারখানা রয়েছে, যার শতাধিক কারখানা মামুন বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। অভিযোগ রয়েছে, তারা কারখানা থেকে মাসে ২০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা তোলে। সাগুফতা হাউজিং এলাকায় ১৮টি পরিবারের জমি ও মো. ইউনুস মিয়ার ৫ কাঠার প্লটসহ মোট ১০ কাঠা জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের জুলাই মাসে পল্লবীতে এ কে বিল্ডার্সের কার্যালয়ে চাঁদা না পেয়ে হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় মামুনের ভাই জামিল জড়িত বলে পুলিশ জানায়। কিবরিয়া হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার শুটাররাও মামুন বাহিনীর সদস্য বলে পুলিশ জানিয়েছে। কিবরিয়ার স্ত্রী সাবিহা আক্তারের অভিযোগ, মশিউর শুটার ভাড়া করে তাঁর স্বামীকে হত্যা করেছেন।

ডিএমপির মিরপুর বিভাগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে জুলাই পর্যন্ত ৮৯টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ে চাঁদাবাজির ২২৪টি, চুরির ৫৩০টি, ছিনতাইয়ের ১২৮টি ও ডাকাতির ৮টি মামলা হয়েছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ওসমান গণি জানান, অপরাধীদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়া চলছে। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক জানান, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সমাজকল্যাণ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ না হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এছাড়া পল্লবীতে ‘ভইরা দে গ্রুপ’ ও ‘বাহুবলী গ্রুপ’ নামে কিশোর গ্যাংও সক্রিয় রয়েছে।