লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০১:৪৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্যের বিমান টিকিটে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষিত

মধ্যপ্রাচ্যগামী প্রবাসী কর্মীদের পকেট কেটে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিমান টিকিটের সিন্ডিকেট। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একের পর এক নির্দেশনা জারি থাকলেও মাঠ পর্যায়ে তার কোনো বাস্তবায়ন নেই। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে যে টিকিট তদারকি ব্যবস্থা চালু ছিল, তাও এখন প্রায় বন্ধ। ফলে ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর স্বেচ্ছাচারিতায় জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।

মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি জারি করা এক পরিপত্রে স্পষ্ট বলা হয়েছিল যে, যাত্রীর নাম ও পাসপোর্ট নম্বর ছাড়া কোনো টিকিট বুকিং করা যাবে না। এমনকি গ্রুপ বুকিংয়ের ক্ষেত্রেও ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যাত্রীর নামসহ বুকিং নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা ছিল। বর্তমানে এই নিয়মের তোয়াক্কা না করে নামবিহীন গ্রুপ বুকিংয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় আসন আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী টিকিটে ট্রাভেল এজেন্সির নাম, লাইসেন্স নম্বর এবং প্রকৃত মূল্য উল্লেখ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না।

কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে অতীতে কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে পার পেয়ে গেছে। এরপর আর কোনো কার্যকর তদারকি দেখা যায়নি। যদিও আকাশপথে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং যাত্রী হয়রানি বন্ধে ‘ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অনিয়মে জড়িত ৩০টি সংস্থাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান সরকারের সময়ে এই তদারকি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে।

যাত্রীস্বার্থ রক্ষায় গঠিত মন্ত্রণালয়ের বিশেষ টাস্কফোর্সও এখন নিষ্ক্রিয়। অথচ এই টাস্কফোর্সের অধীনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। যার মধ্যে ছিল—জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) ও এয়ারলাইন্স কার্যালয়ে নজরদারি জোরদার করা, কৃত্রিম সংকট তৈরিতে ছোট উড়োজাহাজ ব্যবহার হচ্ছে কি না তা তদন্ত করা, এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে বিমানবন্দরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, ডিজিএফআই এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে যুক্ত করে টাস্কফোর্স শক্তিশালী করার কথা থাকলেও বর্তমানে এসব কার্যক্রমের কোনোটিই মাঠে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।

রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর প্যাকেজ বিক্রির আড়ালেও চলছে বড় ধরনের কারসাজি। তারা বিমানভাড়া ও নিজেদের কমিশন আলাদাভাবে উল্লেখ না করে এককালীন প্যাকেজ মূল্য নির্ধারণ করে, যা ন্যায্যমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে বিমানভাড়া কমলেও প্রবাসী কর্মীরা এর কোনো সুফল পান না। তদন্তে দেখা গেছে, গ্রুপ বুকিংয়ের নামে অগ্রিম অর্থ দিয়ে টিকিট ব্লক করে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে অননুমোদিত এজেন্টরা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বিজ্ঞাপন দিয়ে চড়া দামে সেসব টিকিট বিক্রি করে। অতীতে এই কারসাজির দায়ে আত-তাইয়্যারা ট্রাভেলস ইন্টারন্যাশনাল, এনএমএসএস ইন্টারন্যাশনাল, আরবিসি ইন্টারন্যাশনাল, কিং এয়ার, সিটিকম, কাজী এয়ার ও আল গাজী এয়ারসহ বেশ কিছু এজেন্সির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

বিমানের টিকিট মূল্যের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ওমরাহর টিকিটের দাম ছিল প্রায় ৫৫০ থেকে ৭৩৫ ডলার এবং শ্রমিকদের টিকিট ছিল ৩৭০ থেকে ৫৪০ ডলার। ২০২৫ সালে ওমরাহর গড় ভাড়া ছিল ৪৭০ ডলার, যা রমজানে বেড়ে দাঁড়ায় ৬০০ থেকে ৯০০ ডলারে; তখন শ্রমিকদের ভাড়া ছিল ৪০০ থেকে ৬০০০ ডলার। আর ২০২৬ সালে ওমরাহর টিকিট বিক্রি হয়েছে ৫১০ থেকে ৮০০ ডলারে। বর্তমানে সৌদি আরবে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় যাত্রী চাপ কিছুটা কম, যার ফলে শ্রমিকদের টিকিটের দাম এখন ২৫০ থেকে ৫৩০ ডলারের মধ্যে রয়েছে। তবে সুযোগ পেলেই সিন্ডিকেট আবারও টিকিটের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিচার ও পুনর্মিলন ছাড়া সমাজ বিভক্তই থেকে যায়: বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন

মধ্যপ্রাচ্যের বিমান টিকিটে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষিত

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:২৮:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যগামী প্রবাসী কর্মীদের পকেট কেটে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিমান টিকিটের সিন্ডিকেট। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একের পর এক নির্দেশনা জারি থাকলেও মাঠ পর্যায়ে তার কোনো বাস্তবায়ন নেই। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে যে টিকিট তদারকি ব্যবস্থা চালু ছিল, তাও এখন প্রায় বন্ধ। ফলে ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর স্বেচ্ছাচারিতায় জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।

মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি জারি করা এক পরিপত্রে স্পষ্ট বলা হয়েছিল যে, যাত্রীর নাম ও পাসপোর্ট নম্বর ছাড়া কোনো টিকিট বুকিং করা যাবে না। এমনকি গ্রুপ বুকিংয়ের ক্ষেত্রেও ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যাত্রীর নামসহ বুকিং নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা ছিল। বর্তমানে এই নিয়মের তোয়াক্কা না করে নামবিহীন গ্রুপ বুকিংয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় আসন আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী টিকিটে ট্রাভেল এজেন্সির নাম, লাইসেন্স নম্বর এবং প্রকৃত মূল্য উল্লেখ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না।

কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে অতীতে কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে পার পেয়ে গেছে। এরপর আর কোনো কার্যকর তদারকি দেখা যায়নি। যদিও আকাশপথে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং যাত্রী হয়রানি বন্ধে ‘ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অনিয়মে জড়িত ৩০টি সংস্থাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান সরকারের সময়ে এই তদারকি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে।

যাত্রীস্বার্থ রক্ষায় গঠিত মন্ত্রণালয়ের বিশেষ টাস্কফোর্সও এখন নিষ্ক্রিয়। অথচ এই টাস্কফোর্সের অধীনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। যার মধ্যে ছিল—জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) ও এয়ারলাইন্স কার্যালয়ে নজরদারি জোরদার করা, কৃত্রিম সংকট তৈরিতে ছোট উড়োজাহাজ ব্যবহার হচ্ছে কি না তা তদন্ত করা, এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে বিমানবন্দরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, ডিজিএফআই এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে যুক্ত করে টাস্কফোর্স শক্তিশালী করার কথা থাকলেও বর্তমানে এসব কার্যক্রমের কোনোটিই মাঠে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।

রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর প্যাকেজ বিক্রির আড়ালেও চলছে বড় ধরনের কারসাজি। তারা বিমানভাড়া ও নিজেদের কমিশন আলাদাভাবে উল্লেখ না করে এককালীন প্যাকেজ মূল্য নির্ধারণ করে, যা ন্যায্যমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে বিমানভাড়া কমলেও প্রবাসী কর্মীরা এর কোনো সুফল পান না। তদন্তে দেখা গেছে, গ্রুপ বুকিংয়ের নামে অগ্রিম অর্থ দিয়ে টিকিট ব্লক করে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে অননুমোদিত এজেন্টরা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বিজ্ঞাপন দিয়ে চড়া দামে সেসব টিকিট বিক্রি করে। অতীতে এই কারসাজির দায়ে আত-তাইয়্যারা ট্রাভেলস ইন্টারন্যাশনাল, এনএমএসএস ইন্টারন্যাশনাল, আরবিসি ইন্টারন্যাশনাল, কিং এয়ার, সিটিকম, কাজী এয়ার ও আল গাজী এয়ারসহ বেশ কিছু এজেন্সির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

বিমানের টিকিট মূল্যের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ওমরাহর টিকিটের দাম ছিল প্রায় ৫৫০ থেকে ৭৩৫ ডলার এবং শ্রমিকদের টিকিট ছিল ৩৭০ থেকে ৫৪০ ডলার। ২০২৫ সালে ওমরাহর গড় ভাড়া ছিল ৪৭০ ডলার, যা রমজানে বেড়ে দাঁড়ায় ৬০০ থেকে ৯০০ ডলারে; তখন শ্রমিকদের ভাড়া ছিল ৪০০ থেকে ৬০০০ ডলার। আর ২০২৬ সালে ওমরাহর টিকিট বিক্রি হয়েছে ৫১০ থেকে ৮০০ ডলারে। বর্তমানে সৌদি আরবে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় যাত্রী চাপ কিছুটা কম, যার ফলে শ্রমিকদের টিকিটের দাম এখন ২৫০ থেকে ৫৩০ ডলারের মধ্যে রয়েছে। তবে সুযোগ পেলেই সিন্ডিকেট আবারও টিকিটের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।