লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০২:৩২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে ইরান: কতটা বদলাবে দেশটির নীতি?

গত মাসে ভার্সাই প্রাসাদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করেন, তখন অনেকেই এর মধ্যে এক ধরনের বিদ্রূপাত্মক দিক দেখেছিলেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ হয়তো নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যাতে ট্রাম্প মত পরিবর্তনের আগেই সমঝোতা স্মারকে সই করে নেন। সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন যে স্বর্ণালংকৃত ‘হল অব মিররস’ তার মার্কিন অতিথির পছন্দ হবে।

দেড় পৃষ্ঠার ওই চুক্তি এবং এই ভেন্যু নির্বাচনের বিষয়টি ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তির তুলনা টেনে আনে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে স্বাক্ষরিত সেই চুক্তি ইউরোপকে নতুন রূপ দিয়েছিল। তবে জার্মানির ওপর বিপুল ক্ষতিপূরণ চাপানোয় দেশটিতে ব্যাপক ক্ষোভ ও তিক্ততা জন্ম নেয়, যা মাত্র ২০ বছর পর আরেকটি বৈশ্বিক সংঘাতের পথ তৈরি করেছিল। বর্তমান চুক্তিটি ভিন্ন হলেও, এটিও কি সমানভাবে ভাগ্যনির্ধারক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে—সেই প্রশ্ন উঠছে।

স্বাক্ষরের প্রায় তিন সপ্তাহ পরও একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি মোটামুটিভাবে টিকে আছে। তবে হরমুজ প্রণালির আশপাশে কয়েকটি সংঘর্ষের পর এবং যুদ্ধের মূল কারণগুলোর সমাধান না হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। এরই মধ্যে ইরান এক গভীর পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে এবং দেশটি তার সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে বিদায় জানাচ্ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই নিহত হন আলি খামেনি। ওই হামলায় তেহরানের শাসনব্যবস্থার বড় অংশই কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছিল। এটি দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যা পুরোনো নেতৃত্বের বিদায় ও নতুনদের আসার স্মারক। নেতৃত্বে নতুন মুখের সঙ্গে এসেছে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সাবেক নেতাদের হত্যা করলেও তাদের জায়গায় এখন আরো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ তৈরি হয়েছে কি-না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ভ্যালি নাসর বলেন, এই যুদ্ধের প্রভাব ভাবনার চেয়েও অনেক বড়। এই মাত্রার যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত দাবার ছক নতুনভাবে সাজিয়ে দেয়, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও তাই হবে। অথচ গত জানুয়ারিতে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছিল, যাকে ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখেছিলেন। দশকের পর দশক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই বিপর্যস্ত ছিল। ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের ক্ষতও তখনো সারেনি।

ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়নি, তবে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ১০ বা ১১টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়ামের মজুত দেশটির ঠিক কোথায় আছে, তা নিশ্চিত ছিল না। ধারণা করা হচ্ছিল, এর বড় অংশ ইসফাহান পারমাণবিক কমপ্লেক্সের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।

গাজা যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং লোহিত সাগরে জাহাজ হামলা শুরু করলে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য পাল্টা হামলা চালায়। দেশে-বিদেশে এত বিপর্যয়ের পর ধারণা ছিল ইরান অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় আছে। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছিল, ট্রাম্প একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন পেয়েছিলেন যে ১৯৭৯ সালের পর ইরান এখন সবচেয়ে দুর্বল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরান সমানে সমান লড়াই করতে পারবে—এ ধারণা একেবারেই অবাস্তব মনে হচ্ছিল।

কিন্তু বাস্তবে ঠিক সেটাই ঘটেছে এবং ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখনো টিকে আছে। এর একটি কারণ, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপে ফেলার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন বলে দাবি করলেও অধ্যাপক ভালি নাসর মনে করেন, পরিবর্তনটি শেষ পর্যন্ত তেহরানের পক্ষেই গেছে। ইরানে এখন একেবারে নতুন একটি প্রজন্ম ক্ষমতায় এসেছে যাদের লক্ষ্য খুবই স্পষ্ট। তারা যুদ্ধ সামলেছে এবং এখন শান্তিচুক্তি ও বাকি সবকিছুও সামলাবে। নতুন নেতৃত্ব ওয়াশিংটনের ভাষায় ‘মতাদর্শিক মানুষ’ নয়। তারা বিপ্লব-পরবর্তী প্রজন্মের নেতা, যারা দেশ রক্ষায় চরমভাবে একমুখী এবং আগের নেতৃত্বের তুলনায় অনেক বেশি শক্ত পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।

৫৬ বছর বয়সি নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বয়সে তার বাবা আলি খামেনির চেয়ে ৩০ বছরের ছোট। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের বয়স ৭১ বছর হলেও ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের প্রজন্মের সবাই এখন আর ক্ষমতায় নেই। এই মূহুর্তে ইরানের প্রধান দুই ব্যক্তি—পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং বিপ্লবী গার্ডের প্রধান আহমাদ বাহিদি, দুইজনের বয়সই ষাটের ঘরে। নতুন সর্বোচ্চ নেতার মতো তাদেরও ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

চ্যাথাম হাউসের পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জাহাজ এখন আর ৮৬ বছর বয়সি কেউ পরিচালনা করছেন না। ব্যবস্থার বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিলেন আলি খামেনি। দশকের পর দশক ধরে তিনি ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ নীতি অনুসরণ করেছিলেন। তার উত্তরসূরিরা তুলনামূলক বেশ সাহসী। তারা অঞ্চলের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এমন শর্তে যুদ্ধ শেষের আলোচনা টেবিলে এসেছে, যা তেহরানের জন্য অপমানজনক নয়।

অধ্যাপক নাসর বলেন, তারা আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মকভাবে যুদ্ধে জড়াতে প্রস্তুত। ২০২০ সালে ট্রাম্প যখন কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার নির্দেশ দেন, তখন ইরান মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের প্রতিশোধের কথা জানিয়ে দিয়েছিল। ওই সময় কোনো মার্কিন সামরিক কর্মী নিহত হননি। কিন্তু এ বছর মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার মুখে ইরান কোনো সংযম দেখায়নি। তারা বাহরাইনে ফিফথ ফ্লিটের সদর দফতর এবং কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটিসহ অঞ্চলজুড়ে একাধিক মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। কুয়েতে ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরো শত শত সৈন্য।

উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলা ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার এই আগ্রাসী মনোভাব সম্ভবত হোয়াইট হাউজকে অবাক করেছে। ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার মার্কিন কৌশল আর কাজ করছে না। ইন্টারন্যাশনল ক্রাইসিস গ্রুপের আলি ওয়ায়েজ বলেন, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এখন মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে আভাস মিলছে যে বেশিরভাগ উপসাগরীয় দেশ ইরানের সাথে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করছে। বার্তা সংস্থা এএফপি এক কূটনীতিকের বরাতে জানায়, কয়েক দশকের শত্রুতার পর ২০২৩ সালে তেহরানের সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা সৌদি আরব একটি ‘পুনর্মিলন সম্মেলন’ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তবে ওয়ায়েজ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে এদের কেউই মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাথে পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন করতে প্রস্তুত নয়। তারা মূলত ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি একটি ‘প্লাস্টিক মোমেন্ট’ বা পরিবর্তনশীল মুহূর্ত বলে অভিহিত করেছেন, যা পুরনো শত্রুদের ভিন্ন মাত্রার সম্পর্কের সম্ভাবনা তৈরি করে।

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৮: ১৪আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৮: ২৯

জনপ্রিয় সংবাদ

আঙুলের শব্দে আম্পায়ার বিভ্রান্ত, ইংল্যান্ডের ক্রিকেটে প্রতারণার নজির

নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে ইরান: কতটা বদলাবে দেশটির নীতি?

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:৩১:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

গত মাসে ভার্সাই প্রাসাদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করেন, তখন অনেকেই এর মধ্যে এক ধরনের বিদ্রূপাত্মক দিক দেখেছিলেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ হয়তো নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যাতে ট্রাম্প মত পরিবর্তনের আগেই সমঝোতা স্মারকে সই করে নেন। সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন যে স্বর্ণালংকৃত ‘হল অব মিররস’ তার মার্কিন অতিথির পছন্দ হবে।

দেড় পৃষ্ঠার ওই চুক্তি এবং এই ভেন্যু নির্বাচনের বিষয়টি ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তির তুলনা টেনে আনে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে স্বাক্ষরিত সেই চুক্তি ইউরোপকে নতুন রূপ দিয়েছিল। তবে জার্মানির ওপর বিপুল ক্ষতিপূরণ চাপানোয় দেশটিতে ব্যাপক ক্ষোভ ও তিক্ততা জন্ম নেয়, যা মাত্র ২০ বছর পর আরেকটি বৈশ্বিক সংঘাতের পথ তৈরি করেছিল। বর্তমান চুক্তিটি ভিন্ন হলেও, এটিও কি সমানভাবে ভাগ্যনির্ধারক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে—সেই প্রশ্ন উঠছে।

স্বাক্ষরের প্রায় তিন সপ্তাহ পরও একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি মোটামুটিভাবে টিকে আছে। তবে হরমুজ প্রণালির আশপাশে কয়েকটি সংঘর্ষের পর এবং যুদ্ধের মূল কারণগুলোর সমাধান না হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। এরই মধ্যে ইরান এক গভীর পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে এবং দেশটি তার সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে বিদায় জানাচ্ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই নিহত হন আলি খামেনি। ওই হামলায় তেহরানের শাসনব্যবস্থার বড় অংশই কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছিল। এটি দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যা পুরোনো নেতৃত্বের বিদায় ও নতুনদের আসার স্মারক। নেতৃত্বে নতুন মুখের সঙ্গে এসেছে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সাবেক নেতাদের হত্যা করলেও তাদের জায়গায় এখন আরো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ তৈরি হয়েছে কি-না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ভ্যালি নাসর বলেন, এই যুদ্ধের প্রভাব ভাবনার চেয়েও অনেক বড়। এই মাত্রার যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত দাবার ছক নতুনভাবে সাজিয়ে দেয়, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও তাই হবে। অথচ গত জানুয়ারিতে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছিল, যাকে ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখেছিলেন। দশকের পর দশক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই বিপর্যস্ত ছিল। ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের ক্ষতও তখনো সারেনি।

ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়নি, তবে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ১০ বা ১১টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়ামের মজুত দেশটির ঠিক কোথায় আছে, তা নিশ্চিত ছিল না। ধারণা করা হচ্ছিল, এর বড় অংশ ইসফাহান পারমাণবিক কমপ্লেক্সের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।

গাজা যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং লোহিত সাগরে জাহাজ হামলা শুরু করলে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য পাল্টা হামলা চালায়। দেশে-বিদেশে এত বিপর্যয়ের পর ধারণা ছিল ইরান অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় আছে। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছিল, ট্রাম্প একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন পেয়েছিলেন যে ১৯৭৯ সালের পর ইরান এখন সবচেয়ে দুর্বল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরান সমানে সমান লড়াই করতে পারবে—এ ধারণা একেবারেই অবাস্তব মনে হচ্ছিল।

কিন্তু বাস্তবে ঠিক সেটাই ঘটেছে এবং ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখনো টিকে আছে। এর একটি কারণ, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপে ফেলার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন বলে দাবি করলেও অধ্যাপক ভালি নাসর মনে করেন, পরিবর্তনটি শেষ পর্যন্ত তেহরানের পক্ষেই গেছে। ইরানে এখন একেবারে নতুন একটি প্রজন্ম ক্ষমতায় এসেছে যাদের লক্ষ্য খুবই স্পষ্ট। তারা যুদ্ধ সামলেছে এবং এখন শান্তিচুক্তি ও বাকি সবকিছুও সামলাবে। নতুন নেতৃত্ব ওয়াশিংটনের ভাষায় ‘মতাদর্শিক মানুষ’ নয়। তারা বিপ্লব-পরবর্তী প্রজন্মের নেতা, যারা দেশ রক্ষায় চরমভাবে একমুখী এবং আগের নেতৃত্বের তুলনায় অনেক বেশি শক্ত পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।

৫৬ বছর বয়সি নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বয়সে তার বাবা আলি খামেনির চেয়ে ৩০ বছরের ছোট। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের বয়স ৭১ বছর হলেও ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের প্রজন্মের সবাই এখন আর ক্ষমতায় নেই। এই মূহুর্তে ইরানের প্রধান দুই ব্যক্তি—পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং বিপ্লবী গার্ডের প্রধান আহমাদ বাহিদি, দুইজনের বয়সই ষাটের ঘরে। নতুন সর্বোচ্চ নেতার মতো তাদেরও ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

চ্যাথাম হাউসের পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জাহাজ এখন আর ৮৬ বছর বয়সি কেউ পরিচালনা করছেন না। ব্যবস্থার বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিলেন আলি খামেনি। দশকের পর দশক ধরে তিনি ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ নীতি অনুসরণ করেছিলেন। তার উত্তরসূরিরা তুলনামূলক বেশ সাহসী। তারা অঞ্চলের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এমন শর্তে যুদ্ধ শেষের আলোচনা টেবিলে এসেছে, যা তেহরানের জন্য অপমানজনক নয়।

অধ্যাপক নাসর বলেন, তারা আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মকভাবে যুদ্ধে জড়াতে প্রস্তুত। ২০২০ সালে ট্রাম্প যখন কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার নির্দেশ দেন, তখন ইরান মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের প্রতিশোধের কথা জানিয়ে দিয়েছিল। ওই সময় কোনো মার্কিন সামরিক কর্মী নিহত হননি। কিন্তু এ বছর মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার মুখে ইরান কোনো সংযম দেখায়নি। তারা বাহরাইনে ফিফথ ফ্লিটের সদর দফতর এবং কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটিসহ অঞ্চলজুড়ে একাধিক মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। কুয়েতে ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরো শত শত সৈন্য।

উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলা ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার এই আগ্রাসী মনোভাব সম্ভবত হোয়াইট হাউজকে অবাক করেছে। ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার মার্কিন কৌশল আর কাজ করছে না। ইন্টারন্যাশনল ক্রাইসিস গ্রুপের আলি ওয়ায়েজ বলেন, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এখন মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে আভাস মিলছে যে বেশিরভাগ উপসাগরীয় দেশ ইরানের সাথে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করছে। বার্তা সংস্থা এএফপি এক কূটনীতিকের বরাতে জানায়, কয়েক দশকের শত্রুতার পর ২০২৩ সালে তেহরানের সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা সৌদি আরব একটি ‘পুনর্মিলন সম্মেলন’ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তবে ওয়ায়েজ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে এদের কেউই মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাথে পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন করতে প্রস্তুত নয়। তারা মূলত ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি একটি ‘প্লাস্টিক মোমেন্ট’ বা পরিবর্তনশীল মুহূর্ত বলে অভিহিত করেছেন, যা পুরনো শত্রুদের ভিন্ন মাত্রার সম্পর্কের সম্ভাবনা তৈরি করে।

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৮: ১৪আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৮: ২৯