লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১০:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পূজার ছুটিতেও যাত্রীশূন্য সদরঘাট, সংকটে লঞ্চ মালিক ও শ্রমিকরা

দুর্গাপূজার ছুটিতে একসময় ঘরমুখী মানুষের ভিড়ে মুখর থাকত রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল। বুড়িগঙ্গার তীরে টিকিট সংগ্রহের ব্যস্ততা, কুলিদের হাঁকডাক আর যাত্রীদের পদচারণায় সবসময় প্রাণবন্ত থাকত এই এলাকা। তবে এবার ছুটির মৌসুমেও চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও যাত্রীসংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ৪৩টি নৌপথে সক্রিয় লঞ্চের সংখ্যা ২১০টি থেকে কমে বর্তমানে ১৭০টিতে নেমে এসেছে। একসময় সদরঘাট থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৪০টি লঞ্চ ছেড়ে যেত, কিন্তু এখন সেই সংখ্যা মাত্র ৪০ থেকে ৪৫টিতে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বরিশাল রুটে আগে প্রতিদিন আটটি লঞ্চ চলাচল করলেও এখন চলছে মাত্র দুটি। যাত্রী সংকটের কারণে অনেক নৌপথে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

পদ্মা সেতু চালুর ফলে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সহজ ও দ্রুততর হয়েছে। অনেক যাত্রী এখন সময়ের প্রয়োজনে লঞ্চের পরিবর্তে বাসে যাতায়াত করছেন। গুলিস্তান থেকে বরিশালগামী একজন যাত্রী জানান, আগে বাড়ি যাওয়ার প্রধান মাধ্যম ছিল লঞ্চ। কিন্তু এখন বাসে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো যায়, বিশেষ করে যখন ছুটির সময় কম থাকে, তখন বাসই তাদের প্রথম পছন্দ। তবে তিনি লঞ্চ ভ্রমণের আলাদা আনন্দের কথা স্বীকার করেছেন।

যাত্রী কমলেও লঞ্চ পরিচালনার খরচ কমেনি। জ্বালানি, শ্রমিকদের বেতন ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ মালিকদের নিয়মিত ব্যয় করতে হচ্ছে। টিকিট ও কেবিন বিক্রি কমে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। লোকসান এড়াতে বিভিন্ন রুটে লঞ্চের ট্রিপ কমানো হচ্ছে, আবার কোনো কোনো লঞ্চ অলস পড়ে থাকছে। চাঁদপুরগামী ঈগল-৩ লঞ্চের টিকিট বিক্রেতা মো. আনসারী জানান, ভাড়া আগের মতোই রয়েছে, কিন্তু যাত্রী বাড়েনি। পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে অধিকাংশ ট্রিপেই লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।

লঞ্চ ব্যবসার এই মন্দার প্রভাব পড়েছে সদরঘাটকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের ওপরও। যাত্রীদের মালামাল বহন করে জীবিকা নির্বাহ করা কুলিরা আগের মতো কাজ পাচ্ছেন না। একইভাবে হকার ও ছোট দোকানিদের বিক্রিও কমেছে। সদরঘাটে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে কুলির কাজ করা ৫৫ বছর বয়সী মাজহারুল হক বলেন, আগে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় হলেও এখন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবে দেশের নদীবেষ্টিত ও চরাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগে এখনো নৌপথের গুরুত্ব অপরিসীম। যেসব এলাকায় সড়ক যোগাযোগ সীমিত, সেখানে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে নৌযানই প্রধান ভরসা। সংশ্লিষ্টদের মতে, নৌপরিবহন খাতকে টিকিয়ে রাখতে রুটভিত্তিক পরিকল্পনার পাশাপাশি যাত্রীসেবার মান বাড়াতে হবে। নাব্যতা রক্ষা, ঘাটে যাতায়াত সহজ করা এবং নিরাপদ ও সাশ্রয়ী ভ্রমণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পদ্মা সেতু নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও নৌপরিবহন খাতকে আধুনিক ও কার্যকর করতে না পারলে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল হাজারো মানুষের জীবিকা আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।

জনপ্রিয় সংবাদ

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন, জানালেন সালাহউদ্দিন আহমদ

পূজার ছুটিতেও যাত্রীশূন্য সদরঘাট, সংকটে লঞ্চ মালিক ও শ্রমিকরা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:১৪:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

দুর্গাপূজার ছুটিতে একসময় ঘরমুখী মানুষের ভিড়ে মুখর থাকত রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল। বুড়িগঙ্গার তীরে টিকিট সংগ্রহের ব্যস্ততা, কুলিদের হাঁকডাক আর যাত্রীদের পদচারণায় সবসময় প্রাণবন্ত থাকত এই এলাকা। তবে এবার ছুটির মৌসুমেও চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও যাত্রীসংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ৪৩টি নৌপথে সক্রিয় লঞ্চের সংখ্যা ২১০টি থেকে কমে বর্তমানে ১৭০টিতে নেমে এসেছে। একসময় সদরঘাট থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৪০টি লঞ্চ ছেড়ে যেত, কিন্তু এখন সেই সংখ্যা মাত্র ৪০ থেকে ৪৫টিতে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বরিশাল রুটে আগে প্রতিদিন আটটি লঞ্চ চলাচল করলেও এখন চলছে মাত্র দুটি। যাত্রী সংকটের কারণে অনেক নৌপথে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

পদ্মা সেতু চালুর ফলে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সহজ ও দ্রুততর হয়েছে। অনেক যাত্রী এখন সময়ের প্রয়োজনে লঞ্চের পরিবর্তে বাসে যাতায়াত করছেন। গুলিস্তান থেকে বরিশালগামী একজন যাত্রী জানান, আগে বাড়ি যাওয়ার প্রধান মাধ্যম ছিল লঞ্চ। কিন্তু এখন বাসে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো যায়, বিশেষ করে যখন ছুটির সময় কম থাকে, তখন বাসই তাদের প্রথম পছন্দ। তবে তিনি লঞ্চ ভ্রমণের আলাদা আনন্দের কথা স্বীকার করেছেন।

যাত্রী কমলেও লঞ্চ পরিচালনার খরচ কমেনি। জ্বালানি, শ্রমিকদের বেতন ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ মালিকদের নিয়মিত ব্যয় করতে হচ্ছে। টিকিট ও কেবিন বিক্রি কমে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। লোকসান এড়াতে বিভিন্ন রুটে লঞ্চের ট্রিপ কমানো হচ্ছে, আবার কোনো কোনো লঞ্চ অলস পড়ে থাকছে। চাঁদপুরগামী ঈগল-৩ লঞ্চের টিকিট বিক্রেতা মো. আনসারী জানান, ভাড়া আগের মতোই রয়েছে, কিন্তু যাত্রী বাড়েনি। পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে অধিকাংশ ট্রিপেই লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।

লঞ্চ ব্যবসার এই মন্দার প্রভাব পড়েছে সদরঘাটকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের ওপরও। যাত্রীদের মালামাল বহন করে জীবিকা নির্বাহ করা কুলিরা আগের মতো কাজ পাচ্ছেন না। একইভাবে হকার ও ছোট দোকানিদের বিক্রিও কমেছে। সদরঘাটে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে কুলির কাজ করা ৫৫ বছর বয়সী মাজহারুল হক বলেন, আগে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় হলেও এখন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবে দেশের নদীবেষ্টিত ও চরাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগে এখনো নৌপথের গুরুত্ব অপরিসীম। যেসব এলাকায় সড়ক যোগাযোগ সীমিত, সেখানে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে নৌযানই প্রধান ভরসা। সংশ্লিষ্টদের মতে, নৌপরিবহন খাতকে টিকিয়ে রাখতে রুটভিত্তিক পরিকল্পনার পাশাপাশি যাত্রীসেবার মান বাড়াতে হবে। নাব্যতা রক্ষা, ঘাটে যাতায়াত সহজ করা এবং নিরাপদ ও সাশ্রয়ী ভ্রমণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পদ্মা সেতু নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও নৌপরিবহন খাতকে আধুনিক ও কার্যকর করতে না পারলে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল হাজারো মানুষের জীবিকা আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।