লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১০:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে কোরবানির আনন্দ যেন ‘বিলাসিতা’, অনেক ঘরে জুটবে না এক কেজি মাংসও

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে কোরবানির আনন্দ যেন ‘বিলাসিতা’, অনেক ঘরে জুটবে না এক কেজি মাংসও

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি | 

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে ঈদের আনন্দ এখন কেবলই এক দূর আকাশের স্বপ্ন। নদীভাঙনে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব লাখো মানুষের পরিবারে কোরবানির পশু তো দূরের কথা, ঈদের দিন এক কেজি মাংস মিলবে কি না—তা নিয়েই চরম অনিশ্চয়তা। অভাব, ক্ষুধা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কায় এক বুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ঈদ পার করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন দুর্গম চরের বাসিন্দারা।

বছরের পর বছর নদীভাঙনের শিকার এই মানুষগুলোর কাছে ঈদ এখন এক অলীক বিলাসিতা। সরকারি সহায়তা বলতে ঈদের আগে জনপ্রতি ১০ কেজি ভিজিএফের চাল আর স্বল্পমূল্যের টিসিবির পণ্য—এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ তাদের উৎসবের পরিধি।

যোগাযোগহীন ‘মাঝের চর’: এক জনপদের কান্নার গল্প

সরেজমিনে দেখা গেছে, উথাল-পাথাল ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে জেগে ওঠা এক বিচ্ছিন্ন জনপদ ‘মাঝের চর’। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে নেই কোনো সড়ক যোগাযোগ। এই চর থেকে যাত্রাপুর নৌকা ঘাটে আসতেই সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। চার বছর আগে জেগে ওঠা এই চরে নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া অন্তত ৭০টি পরিবার নতুন করে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে নিয়েছে। কিন্তু আশ্রয় মিললেও থামেনি তাদের বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম।

এই চরে আড়াই বছর ধরে বসবাস করছেন আরমান আলী ও আউলিয়া বেগম দম্পতি। চার সন্তানের মুখ চেয়ে আরমান আলী দূরবর্তী সিরাজগঞ্জ জেলার একটি তাঁত কারখানায় কাজ করেন। তবে চলমান বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও অনিয়মিত কাজের কারণে এবার ঈদে তেমন কোনো আয় করতে পারেননি তিনি।

হতাশাগ্রস্ত আরমান আলী বলেন,

“আমি সিরাজগঞ্জে তাঁতের কাজ করি। তাঁত তো বিদ্যুৎ ছাড়া চলে না। এবার যাওয়ার পর থেকেই বিদ্যুতের প্রচণ্ড সমস্যা ছিল, ঠিকমতো কাজ-কামাই করতে পারি নাই। গতকাল বাড়ি ফিরছি, কিন্তু হাতে কোনো টাকা নাই। ছেলে-মেয়েদের নতুন জামাকাপড়ও দিতে পারি নাই, মাংস কেনার টাকাও নাই। যদি সন্তানদের রিজিকে থাকে, তবেই হয়তো ঈদের দিন একটু মাংস মুখে তুলতে পারবে।”

একই চরের জেসমিন আক্তার ক্ষোভ আর দুঃখ মিশিয়ে বলেন, “আমাদের চরে কোনো কোরবানি নাই। ঈদের দিন বাচ্চাদের যে একটু মাংস খাওয়াবো, সেই উপায়ও নাই। সন্তানদের পাতে একটু মাংস দিতে পারলে খুব ভালো লাগতো।”

আরেক বাসিন্দা রাজু মিয়া বলেন, “আমাদের এলাকায় সবাই গরিব, তাই এখানে কেউ কোরবানি দিতে পারে না। যাদের সামান্য সামর্থ্য আছে, তারা হয়তো বাজার থেকে একটু মাংস কিনে খাবে। কেউ যদি আমাদের চরে একটা গরু কোরবানি দিত, আমরা সবাই খুব খুশি হতাম।”

তিন বছরেও পড়েনি কোরবানি, ভরসা ব্রয়লার মুরগি

মাঝের চরের বেশিরভাগ মানুষের প্রধান পেশা কৃষিকাজ। বন্যার সময়টুকু বাদে বছরের অন্য সময়ে চরের জমিতে ধান, কাউন, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করেই কোনোমতে দিন কাটে তাদের। তবে সার-বীজের চড়া উৎপাদন খরচ বাদ দিলে লাভের খাতা প্রায় শূন্য।

স্থানীয়রা জানান, বসতি গড়ার গত তিন বছরেও এই চরে কেউ একটি গরু কোরবানি দিতে পারেননি। গত বছর একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এখানে এসে মাংস বিতরণ করায় চরের মানুষ মাংসের মুখ দেখেছিল। এবার যাদের সামান্য সামর্থ্য আছে, তারা একটি ব্রয়লার মুরগি কিনেই কোরবানির মাংসের স্বাদ খোঁজার চেষ্টা করছেন।

সাড়ে চারশত চরের চিত্র একই

শুধু মাঝের চরই নয়, সদর উপজেলার পোড়ার চর, আইড়মারী, অষ্টআশির চর, উলিপুরের মুসারচর, জাহাজের আলগা, দইখাওয়ার চরসহ ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা সাড়ে চার শতাধিক চরের অধিকাংশ পরিবারের চিত্র হুবহু এক।

কুড়িগ্রামের ৯টি উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকায় প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করেন। নদীভাঙন, দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করতে করতেই ফুরিয়ে যায় তাদের উৎসবের সব আলো।

ঈদ নয়, চরবাসীর চোখে এখন বন্যার আতঙ্ক

কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম বেবু জানান, জেলার ২৬৯টি চরে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগের ন্যূনতম সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত।

তিনি বলেন,

“সামনে যে ঈদ আসছে, চরের মানুষের মাঝে তার কোনো আনন্দ নেই। তারা এখন ব্যস্ত সামনে ধেয়ে আসা বন্যার আগাম চিন্তা নিয়ে। প্রতিবছরই অসংখ্য চরে কোনো কোরবানি হয় না। দেশের বিত্তবানরা যদি তাদের উৎসবের আনন্দের কিছুটা অংশ নিয়ে এই চরের অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতেন, তবে হয়তো অসংখ্য শিশুর মুখে হাসি ফুটতো।”

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ জানান, সরকারিভাবে হতদরিদ্র মানুষের জন্য ভিজিএফের চাল ও স্বল্পমূল্যের টিসিবি পণ্য বিতরণ করা হচ্ছে, যা চরের মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেবে। তবে চরাঞ্চলের জীবনযাত্রা আসলেই অত্যন্ত কষ্টের। ঈদ উপলক্ষে সমাজের সামর্থ্যবান ও বিত্তশালী ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে চরের মানুষের এই দুঃখ-কষ্ট অনেকটাই লাঘব করা সম্ভব হতো।

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বালিয়াডাঙ্গা ইউনিয়নকে পরিবেশবান্ধব গ্রাম ঘোষণা

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে কোরবানির আনন্দ যেন ‘বিলাসিতা’, অনেক ঘরে জুটবে না এক কেজি মাংসও

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮:৫৪:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে কোরবানির আনন্দ যেন ‘বিলাসিতা’, অনেক ঘরে জুটবে না এক কেজি মাংসও

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি | 

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে ঈদের আনন্দ এখন কেবলই এক দূর আকাশের স্বপ্ন। নদীভাঙনে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব লাখো মানুষের পরিবারে কোরবানির পশু তো দূরের কথা, ঈদের দিন এক কেজি মাংস মিলবে কি না—তা নিয়েই চরম অনিশ্চয়তা। অভাব, ক্ষুধা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কায় এক বুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ঈদ পার করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন দুর্গম চরের বাসিন্দারা।

বছরের পর বছর নদীভাঙনের শিকার এই মানুষগুলোর কাছে ঈদ এখন এক অলীক বিলাসিতা। সরকারি সহায়তা বলতে ঈদের আগে জনপ্রতি ১০ কেজি ভিজিএফের চাল আর স্বল্পমূল্যের টিসিবির পণ্য—এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ তাদের উৎসবের পরিধি।

যোগাযোগহীন ‘মাঝের চর’: এক জনপদের কান্নার গল্প

সরেজমিনে দেখা গেছে, উথাল-পাথাল ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে জেগে ওঠা এক বিচ্ছিন্ন জনপদ ‘মাঝের চর’। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে নেই কোনো সড়ক যোগাযোগ। এই চর থেকে যাত্রাপুর নৌকা ঘাটে আসতেই সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। চার বছর আগে জেগে ওঠা এই চরে নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া অন্তত ৭০টি পরিবার নতুন করে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে নিয়েছে। কিন্তু আশ্রয় মিললেও থামেনি তাদের বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম।

এই চরে আড়াই বছর ধরে বসবাস করছেন আরমান আলী ও আউলিয়া বেগম দম্পতি। চার সন্তানের মুখ চেয়ে আরমান আলী দূরবর্তী সিরাজগঞ্জ জেলার একটি তাঁত কারখানায় কাজ করেন। তবে চলমান বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও অনিয়মিত কাজের কারণে এবার ঈদে তেমন কোনো আয় করতে পারেননি তিনি।

হতাশাগ্রস্ত আরমান আলী বলেন,

“আমি সিরাজগঞ্জে তাঁতের কাজ করি। তাঁত তো বিদ্যুৎ ছাড়া চলে না। এবার যাওয়ার পর থেকেই বিদ্যুতের প্রচণ্ড সমস্যা ছিল, ঠিকমতো কাজ-কামাই করতে পারি নাই। গতকাল বাড়ি ফিরছি, কিন্তু হাতে কোনো টাকা নাই। ছেলে-মেয়েদের নতুন জামাকাপড়ও দিতে পারি নাই, মাংস কেনার টাকাও নাই। যদি সন্তানদের রিজিকে থাকে, তবেই হয়তো ঈদের দিন একটু মাংস মুখে তুলতে পারবে।”

একই চরের জেসমিন আক্তার ক্ষোভ আর দুঃখ মিশিয়ে বলেন, “আমাদের চরে কোনো কোরবানি নাই। ঈদের দিন বাচ্চাদের যে একটু মাংস খাওয়াবো, সেই উপায়ও নাই। সন্তানদের পাতে একটু মাংস দিতে পারলে খুব ভালো লাগতো।”

আরেক বাসিন্দা রাজু মিয়া বলেন, “আমাদের এলাকায় সবাই গরিব, তাই এখানে কেউ কোরবানি দিতে পারে না। যাদের সামান্য সামর্থ্য আছে, তারা হয়তো বাজার থেকে একটু মাংস কিনে খাবে। কেউ যদি আমাদের চরে একটা গরু কোরবানি দিত, আমরা সবাই খুব খুশি হতাম।”

তিন বছরেও পড়েনি কোরবানি, ভরসা ব্রয়লার মুরগি

মাঝের চরের বেশিরভাগ মানুষের প্রধান পেশা কৃষিকাজ। বন্যার সময়টুকু বাদে বছরের অন্য সময়ে চরের জমিতে ধান, কাউন, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করেই কোনোমতে দিন কাটে তাদের। তবে সার-বীজের চড়া উৎপাদন খরচ বাদ দিলে লাভের খাতা প্রায় শূন্য।

স্থানীয়রা জানান, বসতি গড়ার গত তিন বছরেও এই চরে কেউ একটি গরু কোরবানি দিতে পারেননি। গত বছর একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এখানে এসে মাংস বিতরণ করায় চরের মানুষ মাংসের মুখ দেখেছিল। এবার যাদের সামান্য সামর্থ্য আছে, তারা একটি ব্রয়লার মুরগি কিনেই কোরবানির মাংসের স্বাদ খোঁজার চেষ্টা করছেন।

সাড়ে চারশত চরের চিত্র একই

শুধু মাঝের চরই নয়, সদর উপজেলার পোড়ার চর, আইড়মারী, অষ্টআশির চর, উলিপুরের মুসারচর, জাহাজের আলগা, দইখাওয়ার চরসহ ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা সাড়ে চার শতাধিক চরের অধিকাংশ পরিবারের চিত্র হুবহু এক।

কুড়িগ্রামের ৯টি উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকায় প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করেন। নদীভাঙন, দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করতে করতেই ফুরিয়ে যায় তাদের উৎসবের সব আলো।

ঈদ নয়, চরবাসীর চোখে এখন বন্যার আতঙ্ক

কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম বেবু জানান, জেলার ২৬৯টি চরে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগের ন্যূনতম সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত।

তিনি বলেন,

“সামনে যে ঈদ আসছে, চরের মানুষের মাঝে তার কোনো আনন্দ নেই। তারা এখন ব্যস্ত সামনে ধেয়ে আসা বন্যার আগাম চিন্তা নিয়ে। প্রতিবছরই অসংখ্য চরে কোনো কোরবানি হয় না। দেশের বিত্তবানরা যদি তাদের উৎসবের আনন্দের কিছুটা অংশ নিয়ে এই চরের অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতেন, তবে হয়তো অসংখ্য শিশুর মুখে হাসি ফুটতো।”

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ জানান, সরকারিভাবে হতদরিদ্র মানুষের জন্য ভিজিএফের চাল ও স্বল্পমূল্যের টিসিবি পণ্য বিতরণ করা হচ্ছে, যা চরের মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেবে। তবে চরাঞ্চলের জীবনযাত্রা আসলেই অত্যন্ত কষ্টের। ঈদ উপলক্ষে সমাজের সামর্থ্যবান ও বিত্তশালী ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে চরের মানুষের এই দুঃখ-কষ্ট অনেকটাই লাঘব করা সম্ভব হতো।