লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৫:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার থেকেও বঞ্চিত দোহারের কঙ্কালসার হাফেজা, মেলেনি বয়স্ক ভাতাও!

প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার থেকেও বঞ্চিত দোহারের কঙ্কালসার হাফেজা, মেলেনি বয়স্ক ভাতাও!

শহীদুল ইসলাম শরীফ, স্টাফ রিপোর্টার

দোহার (ঢাকা): একসময় দুহাতে রিনিঝিনি চুড়ি নিয়ে গ্রামের পর গ্রাম, পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতেন তিনি। তার ডাক শুনে চঞ্চল হয়ে উঠত গ্রামের বধূ আর কিশোরীরা। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই সুর আজ স্তব্ধ। জীবনের নিষ্ঠুর পেষণে আজ নিজেই এক কঙ্কালসার দেহ নিয়ে বেঁচে আছেন ঢাকার দোহার উপজেলার করিমগঞ্জ এলাকার সত্তর বছর বয়সি প্রবীণ নারী হাফেজা।

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহার উৎসবের আবহে যেখানে চারদিকে আনন্দের বন্যা, সেখানে করিমগঞ্জের হাফেজার ছোট্ট জীর্ণ টিনের ঘরে চলছে নীরব হাহাকার। উৎসবের আলো পৌঁছায়নি এই অসহায় দম্পতির ঘরে।

চুড়িওয়ালি থেকে লাঠির ওপর ভরসা

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সত্তর ছুঁইছুঁই হাফেজার বর্তমান সম্বল বলতে কেবল হাতের একটি লাঠি, যার ওপর ভর দিয়ে কোনোমতে নিজের জীর্ণ শরীরটাকে টেনে নিয়ে চলেন তিনি। যৌবনকালে তার মূল পেশা ছিল পায়ে হেঁটে গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে চুড়ি ও নারীদের সাজগোজের সামগ্রী বিক্রি করা। সেই সামান্য আয়েই চলত তার সংসার। কিন্তু বয়স আর রোগবালাইয়ের থাবায় সেই চঞ্চলতা আজ অতীত। শরীর আর সায় দেয় না, দৃষ্টিও ঝাপসা। ফলে মাইলের পর মাইল হেঁটে চুড়ি বিক্রি করা এখন আর তার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।

অসুস্থ স্বামী নিয়ে চরম মানবেতর জীবন

হাফেজার একার কষ্টই শেষ নয়, ঘরের ভেতরে রয়েছে আরও বড়ো কষ্ট। তার স্বামী মোবারক মিয়ার বয়স এখন ৭৭ বছর। বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি এখন সম্পূর্ণ কর্মক্ষমতাহীন ও শয্যাশায়ী।

হাফেজা ৫ সন্তানের জননী হলেও সন্তানদের সংসারেও চলছে চরম টানাপোড়ন। দুই ছেলে বিয়ে করে আলাদা হয়েছেন, বড়ো ছেলেও থাকেন অন্য জায়গায়। আর ছোট ছেলে আনোয়ার হোসেন বিয়ে করে ৩ সন্তানসহ মায়ের সাথেই থাকেন। কিন্তু বর্তমান আকাশছোঁয়া বাজারের যুগে ছোট ছেলের একার সামান্য আয়ের টাকায় নিজের সন্তান এবং বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভরণপোষণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে অসুস্থ বাবা-মায়ের চিকিৎসা তো দূরের কথা, ঠিকমতো দু-মুঠো অন্ন জোগাড় করাই এখন পরিবারটির জন্য কঠিন যুদ্ধ।

জোটেনি প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার, ৪ বছরেও হয়নি বয়স্ক ভাতা

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে দোহার উপজেলা থেকে অসহায় ও দুস্থদের জন্য বরাদ্দকৃত প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ ঈদ অনুদান বা উপহারও হাফেজার ভাগ্যে জোটেনি। শুধু তাই নয়, বৃদ্ধা হাফেজা সরকারি বয়স্ক ভাতার জন্য আবেদন করলেও দীর্ঘ প্রায় ৪ বছর যাবৎ সেটার কোনো হদিশ বা খোঁজ মেলেনি। এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা উপজেলার সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিস ঈদের ছুটিতে বন্ধ থাকায় কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

জনপ্রতিনিধিদের অবহেলার অভিযোগ:

সচেতন মহলের মতে, সাধারণত এই ধরনের অসহায় ও দুস্থদের তালিকা তৈরির দায়িত্ব স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি বা গ্রামের মাতব্বরদের ওপর বর্তায়, যা পরবর্তীতে উপজেলা প্রশাসনের নজরে আনা হয়। প্রতিবেশীদের অভিযোগ, জনপ্রতিনিধিদের চরম অবহেলা ও উদাসীনতার কারণেই হাফেজার মতো এমন প্রকৃত দুস্থরা সরকারি তালিকা থেকে বারবার বাদ পড়ে যান।

“কারো করুণা চাই না বাবা, শুধু একটু খেয়ে বাঁচতে চাই”

লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়ানো জীর্ণ-শীর্ণ হাফেজা চোখের জল মুছে করুণ কণ্ঠে এই প্রতিবেদককে বলেন:

“যৌবনকালে কত মানুষের দুহাত রঙিন করছি বাবা, আজ আমার নিজের জীবনই অন্ধকার। ঈদ আইতাছে শুনতাছি, কিন্তু আমাগো কপালে প্রধানমন্ত্রীর সাহায্যও জুটলো না। বুড়ো স্বামীটা ঘরে না খেয়ে পইড়া থাকে, ওষুধ কিনতে পারি না। আমরা কারো করুণা চাই না বাবা, শুধু একটু খেয়ে বাঁচতে চাই।”

পাশে দাঁড়ানোর আকুতি

করিমগঞ্জ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই বয়সে এই অসহায় দম্পতির পাশে দাঁড়ানো অত্যন্ত জরুরি। কোনো ধরনের স্থায়ী সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা না পেলে তাদের জীবন বাঁচানোই কঠিন হয়ে পড়বে।

আসন্ন কোরবানি ঈদের এই খুশির আমেজে করিমগঞ্জের এই জীর্ণ ঘরে অন্ধকার দূর করতে দোহার উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের প্রতি জরুরি ভিত্তিতে এই অসহায় প্রবীণ দম্পতির পাশে দাঁড়ানোর তীব্র আকুতি জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা।

ট্যাগ
জনপ্রিয় সংবাদ

আগস্ট মাসে দেশজুড়ে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, বন্যার শঙ্কা

প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার থেকেও বঞ্চিত দোহারের কঙ্কালসার হাফেজা, মেলেনি বয়স্ক ভাতাও!

প্রকাশিত হয়েছে: ০৯:০৩:০৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার থেকেও বঞ্চিত দোহারের কঙ্কালসার হাফেজা, মেলেনি বয়স্ক ভাতাও!

শহীদুল ইসলাম শরীফ, স্টাফ রিপোর্টার

দোহার (ঢাকা): একসময় দুহাতে রিনিঝিনি চুড়ি নিয়ে গ্রামের পর গ্রাম, পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতেন তিনি। তার ডাক শুনে চঞ্চল হয়ে উঠত গ্রামের বধূ আর কিশোরীরা। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই সুর আজ স্তব্ধ। জীবনের নিষ্ঠুর পেষণে আজ নিজেই এক কঙ্কালসার দেহ নিয়ে বেঁচে আছেন ঢাকার দোহার উপজেলার করিমগঞ্জ এলাকার সত্তর বছর বয়সি প্রবীণ নারী হাফেজা।

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহার উৎসবের আবহে যেখানে চারদিকে আনন্দের বন্যা, সেখানে করিমগঞ্জের হাফেজার ছোট্ট জীর্ণ টিনের ঘরে চলছে নীরব হাহাকার। উৎসবের আলো পৌঁছায়নি এই অসহায় দম্পতির ঘরে।

চুড়িওয়ালি থেকে লাঠির ওপর ভরসা

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সত্তর ছুঁইছুঁই হাফেজার বর্তমান সম্বল বলতে কেবল হাতের একটি লাঠি, যার ওপর ভর দিয়ে কোনোমতে নিজের জীর্ণ শরীরটাকে টেনে নিয়ে চলেন তিনি। যৌবনকালে তার মূল পেশা ছিল পায়ে হেঁটে গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে চুড়ি ও নারীদের সাজগোজের সামগ্রী বিক্রি করা। সেই সামান্য আয়েই চলত তার সংসার। কিন্তু বয়স আর রোগবালাইয়ের থাবায় সেই চঞ্চলতা আজ অতীত। শরীর আর সায় দেয় না, দৃষ্টিও ঝাপসা। ফলে মাইলের পর মাইল হেঁটে চুড়ি বিক্রি করা এখন আর তার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।

অসুস্থ স্বামী নিয়ে চরম মানবেতর জীবন

হাফেজার একার কষ্টই শেষ নয়, ঘরের ভেতরে রয়েছে আরও বড়ো কষ্ট। তার স্বামী মোবারক মিয়ার বয়স এখন ৭৭ বছর। বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি এখন সম্পূর্ণ কর্মক্ষমতাহীন ও শয্যাশায়ী।

হাফেজা ৫ সন্তানের জননী হলেও সন্তানদের সংসারেও চলছে চরম টানাপোড়ন। দুই ছেলে বিয়ে করে আলাদা হয়েছেন, বড়ো ছেলেও থাকেন অন্য জায়গায়। আর ছোট ছেলে আনোয়ার হোসেন বিয়ে করে ৩ সন্তানসহ মায়ের সাথেই থাকেন। কিন্তু বর্তমান আকাশছোঁয়া বাজারের যুগে ছোট ছেলের একার সামান্য আয়ের টাকায় নিজের সন্তান এবং বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভরণপোষণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে অসুস্থ বাবা-মায়ের চিকিৎসা তো দূরের কথা, ঠিকমতো দু-মুঠো অন্ন জোগাড় করাই এখন পরিবারটির জন্য কঠিন যুদ্ধ।

জোটেনি প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার, ৪ বছরেও হয়নি বয়স্ক ভাতা

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে দোহার উপজেলা থেকে অসহায় ও দুস্থদের জন্য বরাদ্দকৃত প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ ঈদ অনুদান বা উপহারও হাফেজার ভাগ্যে জোটেনি। শুধু তাই নয়, বৃদ্ধা হাফেজা সরকারি বয়স্ক ভাতার জন্য আবেদন করলেও দীর্ঘ প্রায় ৪ বছর যাবৎ সেটার কোনো হদিশ বা খোঁজ মেলেনি। এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা উপজেলার সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিস ঈদের ছুটিতে বন্ধ থাকায় কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

জনপ্রতিনিধিদের অবহেলার অভিযোগ:

সচেতন মহলের মতে, সাধারণত এই ধরনের অসহায় ও দুস্থদের তালিকা তৈরির দায়িত্ব স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি বা গ্রামের মাতব্বরদের ওপর বর্তায়, যা পরবর্তীতে উপজেলা প্রশাসনের নজরে আনা হয়। প্রতিবেশীদের অভিযোগ, জনপ্রতিনিধিদের চরম অবহেলা ও উদাসীনতার কারণেই হাফেজার মতো এমন প্রকৃত দুস্থরা সরকারি তালিকা থেকে বারবার বাদ পড়ে যান।

“কারো করুণা চাই না বাবা, শুধু একটু খেয়ে বাঁচতে চাই”

লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়ানো জীর্ণ-শীর্ণ হাফেজা চোখের জল মুছে করুণ কণ্ঠে এই প্রতিবেদককে বলেন:

“যৌবনকালে কত মানুষের দুহাত রঙিন করছি বাবা, আজ আমার নিজের জীবনই অন্ধকার। ঈদ আইতাছে শুনতাছি, কিন্তু আমাগো কপালে প্রধানমন্ত্রীর সাহায্যও জুটলো না। বুড়ো স্বামীটা ঘরে না খেয়ে পইড়া থাকে, ওষুধ কিনতে পারি না। আমরা কারো করুণা চাই না বাবা, শুধু একটু খেয়ে বাঁচতে চাই।”

পাশে দাঁড়ানোর আকুতি

করিমগঞ্জ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই বয়সে এই অসহায় দম্পতির পাশে দাঁড়ানো অত্যন্ত জরুরি। কোনো ধরনের স্থায়ী সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা না পেলে তাদের জীবন বাঁচানোই কঠিন হয়ে পড়বে।

আসন্ন কোরবানি ঈদের এই খুশির আমেজে করিমগঞ্জের এই জীর্ণ ঘরে অন্ধকার দূর করতে দোহার উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের প্রতি জরুরি ভিত্তিতে এই অসহায় প্রবীণ দম্পতির পাশে দাঁড়ানোর তীব্র আকুতি জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা।