লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১২:১৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লাউয়াছড়া ছেড়ে লোকালয়ে কেন অজগর, বাড়ছে জনমনে আতঙ্ক

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য। একসময় গভীর বনের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকা বিশালাকৃতির অজগরের বিচরণ এখন নিয়মিত লোকালয়ের বাড়ির আঙিনা, হাঁস-মুরগির খামার, বাঁশঝাড়, চা-বাগান, এমনকি হাইল হাওড়ের আশপাশেও দেখা যাচ্ছে। ১২ থেকে ১৮ ফুট দীর্ঘ এসব সাপের ঘন ঘন উপস্থিতিতে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বনসংলগ্ন গ্রামগুলোতে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আতঙ্কের পেছনে দায়ী মূলত বন ধ্বংস, খাদ্যসংকট ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার মতো মানবসৃষ্ট কারণ। বনের বাসিন্দারা বাধ্য হয়েই আশ্রয় ও খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ের দিকে চলে আসছে।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, বন বিভাগ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুন ও জুলাই—এই দুই মাসে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ১০টি অজগর উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া সাপগুলোর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ থেকে ১৮ ফুট এবং ওজন ২০ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত। জুন মাসে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকে চারটি অজগর উদ্ধার করা হয়। এরপর ৯ জুলাই ভূরভূড়িছড়া চা-বাগান থেকে একটি, ১৬ জুলাই ভাড়াউড়া চা-বাগান ও সিন্দুরখান এলাকা থেকে দুটি, ২১ জুলাই উত্তর ভাড়াউড়া এলাকা থেকে একটি এবং ২৮ জুলাই কমলগঞ্জের ফুলবাড়ী চা-বাগান ও শ্রীমঙ্গলের জাগছড়া চা-বাগান থেকে আরও দুটি অজগর উদ্ধার করা হয়। প্রতিটি ঘটনার পর বন বিভাগ ও বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের কর্মীরা সাপগুলো উদ্ধার করে পুনরায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবমুক্ত করেন।

ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য চঞ্চল গোয়ালা জানান, একসময় বনের হরিণ বা ছোট ছোট বন্যপ্রাণী লোকালয়ের আশপাশে দেখা যেত, কিন্তু এখন সেই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। তিনি বলেন, বনের খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ছে। অজগর এখন খামারের হাঁস-মুরগি কিংবা গৃহপালিত প্রাণী সহজ শিকার হিসেবে পাচ্ছে, ফলে গ্রামবাসী সবসময় আতঙ্কে থাকেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন উজাড়, ফলদ গাছ কমে যাওয়া এবং গাছের কোটর ও ছড়ার পাশের প্রাকৃতিক গর্ত নষ্ট হওয়ার কারণে অজগরের নিরাপদ আবাসস্থল দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।

সিলেট বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে এর পরিবেশগত ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দখল, অবৈধ জনবসতি, বাণিজ্যিক বাগান সম্প্রসারণ এবং মূল্যবান বৃক্ষ নিধনের কারণে বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এছাড়া বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের সংযোগ সড়ক এবং ঢাকা-সিলেট-চট্টগ্রাম রেললাইন বন্যপ্রাণীদের জন্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। প্রায়ই ট্রেন কিংবা যানবাহনের ধাক্কায় সাপ, গন্ধগোকুল ও বানরসহ নানা বন্যপ্রাণী মারা যাচ্ছে, যা জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের মৌলভীবাজার রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক জানান, সাম্প্রতিক প্রচুর বৃষ্টিপাত এবং বনের ছড়াগুলোতে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় অজগর লোকালয়ের দিকে চলে আসছে এবং চা-বাগানগুলো তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গা হিসেবে কাজ করছে। বন বিভাগ জনসচেতনতা বাড়ানোর কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং কোথাও অজগর দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে বন বিভাগকে খবর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মজিবুর রহমান চৌধুরী লাউয়াছড়া পরিদর্শন করে বনভূমি দখল ও অবৈধ বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু উদ্ধার অভিযান নয়, বরং বনভূমি দখল বন্ধ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল পুনরুদ্ধার না করলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত আরও বাড়বে।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রদর্শনীতে মুজিব থাকলেও নেই জিয়া: জামায়াত আমিরের ব্যাখ্যা ও রিজভীর প্রশ্ন

লাউয়াছড়া ছেড়ে লোকালয়ে কেন অজগর, বাড়ছে জনমনে আতঙ্ক

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:৩২:২৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য। একসময় গভীর বনের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকা বিশালাকৃতির অজগরের বিচরণ এখন নিয়মিত লোকালয়ের বাড়ির আঙিনা, হাঁস-মুরগির খামার, বাঁশঝাড়, চা-বাগান, এমনকি হাইল হাওড়ের আশপাশেও দেখা যাচ্ছে। ১২ থেকে ১৮ ফুট দীর্ঘ এসব সাপের ঘন ঘন উপস্থিতিতে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বনসংলগ্ন গ্রামগুলোতে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আতঙ্কের পেছনে দায়ী মূলত বন ধ্বংস, খাদ্যসংকট ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার মতো মানবসৃষ্ট কারণ। বনের বাসিন্দারা বাধ্য হয়েই আশ্রয় ও খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ের দিকে চলে আসছে।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, বন বিভাগ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুন ও জুলাই—এই দুই মাসে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ১০টি অজগর উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া সাপগুলোর দৈর্ঘ্য ছিল ১২ থেকে ১৮ ফুট এবং ওজন ২০ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত। জুন মাসে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকে চারটি অজগর উদ্ধার করা হয়। এরপর ৯ জুলাই ভূরভূড়িছড়া চা-বাগান থেকে একটি, ১৬ জুলাই ভাড়াউড়া চা-বাগান ও সিন্দুরখান এলাকা থেকে দুটি, ২১ জুলাই উত্তর ভাড়াউড়া এলাকা থেকে একটি এবং ২৮ জুলাই কমলগঞ্জের ফুলবাড়ী চা-বাগান ও শ্রীমঙ্গলের জাগছড়া চা-বাগান থেকে আরও দুটি অজগর উদ্ধার করা হয়। প্রতিটি ঘটনার পর বন বিভাগ ও বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের কর্মীরা সাপগুলো উদ্ধার করে পুনরায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবমুক্ত করেন।

ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য চঞ্চল গোয়ালা জানান, একসময় বনের হরিণ বা ছোট ছোট বন্যপ্রাণী লোকালয়ের আশপাশে দেখা যেত, কিন্তু এখন সেই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। তিনি বলেন, বনের খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ছে। অজগর এখন খামারের হাঁস-মুরগি কিংবা গৃহপালিত প্রাণী সহজ শিকার হিসেবে পাচ্ছে, ফলে গ্রামবাসী সবসময় আতঙ্কে থাকেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন উজাড়, ফলদ গাছ কমে যাওয়া এবং গাছের কোটর ও ছড়ার পাশের প্রাকৃতিক গর্ত নষ্ট হওয়ার কারণে অজগরের নিরাপদ আবাসস্থল দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।

সিলেট বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে এর পরিবেশগত ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দখল, অবৈধ জনবসতি, বাণিজ্যিক বাগান সম্প্রসারণ এবং মূল্যবান বৃক্ষ নিধনের কারণে বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এছাড়া বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের সংযোগ সড়ক এবং ঢাকা-সিলেট-চট্টগ্রাম রেললাইন বন্যপ্রাণীদের জন্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। প্রায়ই ট্রেন কিংবা যানবাহনের ধাক্কায় সাপ, গন্ধগোকুল ও বানরসহ নানা বন্যপ্রাণী মারা যাচ্ছে, যা জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের মৌলভীবাজার রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক জানান, সাম্প্রতিক প্রচুর বৃষ্টিপাত এবং বনের ছড়াগুলোতে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় অজগর লোকালয়ের দিকে চলে আসছে এবং চা-বাগানগুলো তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গা হিসেবে কাজ করছে। বন বিভাগ জনসচেতনতা বাড়ানোর কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং কোথাও অজগর দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে বন বিভাগকে খবর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মজিবুর রহমান চৌধুরী লাউয়াছড়া পরিদর্শন করে বনভূমি দখল ও অবৈধ বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু উদ্ধার অভিযান নয়, বরং বনভূমি দখল বন্ধ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল পুনরুদ্ধার না করলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত আরও বাড়বে।