লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১২:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নতুন বেতনকাঠামো ও জ্বালানিসহ বহুমুখী ব্যয়ের চাপে সরকারের বাজেট

নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন, দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ, জ্বালানি ও সারে ভর্তুকিসহ নানা খাতের ব্যয় মেটাতে গিয়ে বড় ধরনের অর্থ ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জে পড়েছে সরকার। নতুন নতুন কর্মসূচি ও বড় কেনাকাটার কারণে বাজেটের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে, যেখান থেকে সরাসরি কোনো আয় আসে না। বিপরীতে এই বিপুল খরচের চাপ সামলানোর মতো করে রাজস্ব আয় বাড়ছে না। ফলে সরকারের সামগ্রিক অর্থ ব্যবস্থাপনা এখন বড় সংকটের মুখে পড়েছে।

বাজেটের দলিল অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের প্রায় ৪২ শতাংশই বরাদ্দ রাখা হয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন, ঋণের সুদ এবং ভর্তুকি ও প্রণোদনার মতো খাতে। এই তিন খাতেই বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা, যা সরকারের মোট বার্ষিক ব্যয়ের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি। নতুন বেতনকাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে শুধু এ খাতেই সরকারের বাড়তি খরচ হবে বছরে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এই বিশাল খরচের চাপ সামাল দিতে সরকার বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা নিয়ে জ্বালানি পণ্য ও সার আমদানির ব্যয় মেটাচ্ছে।

অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে রাজস্ব আদায়ে ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা অতীতের যেকোনো অর্জনের চেয়ে অনেক বেশি। গত ৫ বছরে এনবিআরের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি ছিল ২০২১-২২ অর্থবছরে সাড়ে ১২ শতাংশ। অথচ গত অর্থবছরেও রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ছিল ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদেরা সরকারের খরচ কমাতে ব্যয় খাত পর্যালোচনার পরামর্শ দিয়েছেন।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, সরকারের সাধারণ খরচের সঙ্গে এখন জ্বালানি খাতের অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হয়েছে। নতুন বেতন-ভাতা ও ঋণের দায়দেনা শোধের খরচও বেড়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি এবং পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া পুঞ্জীভূত সমস্যার কারণে অর্থনীতি এখন দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, সতর্কতার সঙ্গে খরচের অগ্রাধিকার ঠিক না করলে ঋণের বোঝা আরও বাড়বে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

চলতি অর্থবছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন-ভাতার জন্য বাজেটে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের চেয়ে ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি। এ ছাড়া পেনশন ও গ্র্যাচুইটি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। নতুন বেতনকাঠামোয় বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হলেও চলতি অর্থবছরে খরচ কিছুটা কম হবে। কারণ এটি চার ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং চলতি অর্থবছরে দুই দফায় নতুন বর্ধিত মূল বেতনের ৭০-৭৫ শতাংশ পাবেন চাকরিজীবীরা।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতেও অস্থিরতা চলছে। লোডশেডিং এবং গ্যাসের সংকটে কারখানায় উৎপাদন সীমিত হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও এলএনজির দাম বাড়ছে। কয়েক দিন আগে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ২২ থেকে ২৪ ডলার থাকলেও তা এখন ২৮ ডলারে উঠেছে, যা ইরান যুদ্ধের আগে ছিল অর্ধেক। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরকারের বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এলএনজির আমদানিও কমেছে; গত জুলাই-আগস্টে ১৫ জাহাজ এলএনজি এসেছে, যেখানে গতবার একই সময়ে এসেছিল ২১ জাহাজ। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ১০ জাহাজ এলএনজি আনার পরিকল্পনার বিপরীতে এখন পর্যন্ত ৮টির নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেটের নীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি খাতের অস্থিরতার কারণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ইরান যুদ্ধের আগে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ৭০-৭৫ ডলার থাকলেও এখন তা বেড়ে ৯৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। কৃষকের স্বার্থে সারে বিপুল ভর্তুকি দেয় সরকার। দেশে বছরে ৬৭ লাখ টন সারের চাহিদার ৮০-৮৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে সারের দামও এক বছরের বেশি সময় ধরে চড়া। চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ ৮৯ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই খরচ আরও বাড়ছে।

খরচের এই চাপ সামলাতে গত জুন মাসে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে সার আমদানির জন্য ৩০ কোটি ডলার জরুরি বাজেট সহায়তা নিয়েছে সরকার, যা দিয়ে ২০২৭ সালের এপ্রিলের মধ্যে ৬ লাখ টন সার আমদানি করা হবে। এ ছাড়া তেল ও গ্যাস আমদানির জন্য ৭১ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা নেওয়া হয়েছে। গত ২ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের (জেসিএ) এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, তেল, গ্যাস ও কয়লার মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ২৮০ কোটি ডলার বা ৩৪ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করতে হবে। এ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সরকার, যার ঋণের ৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ সরকার বহন করবে।

বর্তমান বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী জনগণকে সুবিধা দিতে ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছে। চলতি অর্থবছরে ৪১ লাখ পরিবারকে এই কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে এবং চার বছরে ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবার এই সুবিধার আওতায় আসবে, যাতে খরচ হবে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন কার্ড চালু এবং ১২ থেকে ১৩ লাখ ক্ষুদ্র কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে, যার জন্য সরকারের খরচ হবে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।

যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কিনছে সরকার। গত এপ্রিলে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি হয়, যার ব্যয় ৩৭০ কোটি ডলার বা প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা, যা ২০৩৭ সালের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। সম্প্রতি আরও ১১টি উড়োজাহাজ বিক্রির ঘোষণা দিয়েছেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং ভারতে দেশটির রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর, যা সরকারের খরচের বোঝা আরও বাড়াবে।

দেশি-বিদেশি ঋণ শোধের চাপও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ এযাবৎকালের সর্বোচ্চ সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ শোধ করেছে। প্রতিবছর গড়ে ৫০ কোটি ডলার করে বিদেশি ঋণ শোধের পরিমাণ বাড়ছে এবং গত ১৪ বছরে এই ব্যয় চার গুণ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ বাবদ সরকার ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৫ হাজার কোটি টাকা বেশি।

রাজস্ব খাতের সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা থমকে আছে। এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা—এই দুটি বিভাগ করার অধ্যাদেশ বিএনপি সরকার পাস করেনি। গত ২৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে প্রধান করে একটি সংস্কার কমিটি গঠন করা হলেও তারা এখনো প্রতিবেদন দেয়নি। তবে গত ২৩ আগস্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে এনবিআর জানায়, উপজেলা পর্যন্ত করজাল বিস্তার ও অটোমেশনের মাধ্যমে ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা বর্তমানে মাত্র ৭ শতাংশের কাছাকাছি।

সার্বিক বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ দুই কারণেই ব্যয় বাড়ছে। কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলেও হরমুজ প্রণালির সংকটের কারণে স্পট মার্কেট থেকে বাড়তি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ খাতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ ও নতুন বেতনকাঠামোর কারণে খরচ বেড়েছে। তবে অর্থায়নের বিষয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, রাজস্ব বাড়াতে তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে এবং কর পরিহার ও জালিয়াতি রোধে নজর দেওয়া হচ্ছে। সঠিক ব্যয় ও ঋণ ব্যবস্থাপনার কারণে অর্থায়ন নিয়ে আপাতত চিন্তার কোনো কারণ নেই।

জনপ্রিয় সংবাদ

পর্তুগালের অনূর্ধ্ব-১৭ দলে ডাক পেলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো জুনিয়র

নতুন বেতনকাঠামো ও জ্বালানিসহ বহুমুখী ব্যয়ের চাপে সরকারের বাজেট

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:৫৮:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন, দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ, জ্বালানি ও সারে ভর্তুকিসহ নানা খাতের ব্যয় মেটাতে গিয়ে বড় ধরনের অর্থ ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জে পড়েছে সরকার। নতুন নতুন কর্মসূচি ও বড় কেনাকাটার কারণে বাজেটের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে, যেখান থেকে সরাসরি কোনো আয় আসে না। বিপরীতে এই বিপুল খরচের চাপ সামলানোর মতো করে রাজস্ব আয় বাড়ছে না। ফলে সরকারের সামগ্রিক অর্থ ব্যবস্থাপনা এখন বড় সংকটের মুখে পড়েছে।

বাজেটের দলিল অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের প্রায় ৪২ শতাংশই বরাদ্দ রাখা হয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন, ঋণের সুদ এবং ভর্তুকি ও প্রণোদনার মতো খাতে। এই তিন খাতেই বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা, যা সরকারের মোট বার্ষিক ব্যয়ের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি। নতুন বেতনকাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে শুধু এ খাতেই সরকারের বাড়তি খরচ হবে বছরে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এই বিশাল খরচের চাপ সামাল দিতে সরকার বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা নিয়ে জ্বালানি পণ্য ও সার আমদানির ব্যয় মেটাচ্ছে।

অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে রাজস্ব আদায়ে ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা অতীতের যেকোনো অর্জনের চেয়ে অনেক বেশি। গত ৫ বছরে এনবিআরের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি ছিল ২০২১-২২ অর্থবছরে সাড়ে ১২ শতাংশ। অথচ গত অর্থবছরেও রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ছিল ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদেরা সরকারের খরচ কমাতে ব্যয় খাত পর্যালোচনার পরামর্শ দিয়েছেন।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, সরকারের সাধারণ খরচের সঙ্গে এখন জ্বালানি খাতের অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হয়েছে। নতুন বেতন-ভাতা ও ঋণের দায়দেনা শোধের খরচও বেড়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি এবং পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া পুঞ্জীভূত সমস্যার কারণে অর্থনীতি এখন দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, সতর্কতার সঙ্গে খরচের অগ্রাধিকার ঠিক না করলে ঋণের বোঝা আরও বাড়বে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

চলতি অর্থবছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন-ভাতার জন্য বাজেটে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের চেয়ে ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি। এ ছাড়া পেনশন ও গ্র্যাচুইটি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। নতুন বেতনকাঠামোয় বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হলেও চলতি অর্থবছরে খরচ কিছুটা কম হবে। কারণ এটি চার ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং চলতি অর্থবছরে দুই দফায় নতুন বর্ধিত মূল বেতনের ৭০-৭৫ শতাংশ পাবেন চাকরিজীবীরা।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতেও অস্থিরতা চলছে। লোডশেডিং এবং গ্যাসের সংকটে কারখানায় উৎপাদন সীমিত হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও এলএনজির দাম বাড়ছে। কয়েক দিন আগে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ২২ থেকে ২৪ ডলার থাকলেও তা এখন ২৮ ডলারে উঠেছে, যা ইরান যুদ্ধের আগে ছিল অর্ধেক। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরকারের বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এলএনজির আমদানিও কমেছে; গত জুলাই-আগস্টে ১৫ জাহাজ এলএনজি এসেছে, যেখানে গতবার একই সময়ে এসেছিল ২১ জাহাজ। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ১০ জাহাজ এলএনজি আনার পরিকল্পনার বিপরীতে এখন পর্যন্ত ৮টির নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেটের নীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি খাতের অস্থিরতার কারণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ইরান যুদ্ধের আগে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ৭০-৭৫ ডলার থাকলেও এখন তা বেড়ে ৯৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। কৃষকের স্বার্থে সারে বিপুল ভর্তুকি দেয় সরকার। দেশে বছরে ৬৭ লাখ টন সারের চাহিদার ৮০-৮৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে সারের দামও এক বছরের বেশি সময় ধরে চড়া। চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ ৮৯ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই খরচ আরও বাড়ছে।

খরচের এই চাপ সামলাতে গত জুন মাসে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে সার আমদানির জন্য ৩০ কোটি ডলার জরুরি বাজেট সহায়তা নিয়েছে সরকার, যা দিয়ে ২০২৭ সালের এপ্রিলের মধ্যে ৬ লাখ টন সার আমদানি করা হবে। এ ছাড়া তেল ও গ্যাস আমদানির জন্য ৭১ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা নেওয়া হয়েছে। গত ২ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের (জেসিএ) এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, তেল, গ্যাস ও কয়লার মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ২৮০ কোটি ডলার বা ৩৪ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করতে হবে। এ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সরকার, যার ঋণের ৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ সরকার বহন করবে।

বর্তমান বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী জনগণকে সুবিধা দিতে ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছে। চলতি অর্থবছরে ৪১ লাখ পরিবারকে এই কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে এবং চার বছরে ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবার এই সুবিধার আওতায় আসবে, যাতে খরচ হবে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন কার্ড চালু এবং ১২ থেকে ১৩ লাখ ক্ষুদ্র কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে, যার জন্য সরকারের খরচ হবে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।

যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কিনছে সরকার। গত এপ্রিলে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি হয়, যার ব্যয় ৩৭০ কোটি ডলার বা প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা, যা ২০৩৭ সালের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। সম্প্রতি আরও ১১টি উড়োজাহাজ বিক্রির ঘোষণা দিয়েছেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং ভারতে দেশটির রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর, যা সরকারের খরচের বোঝা আরও বাড়াবে।

দেশি-বিদেশি ঋণ শোধের চাপও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ এযাবৎকালের সর্বোচ্চ সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ শোধ করেছে। প্রতিবছর গড়ে ৫০ কোটি ডলার করে বিদেশি ঋণ শোধের পরিমাণ বাড়ছে এবং গত ১৪ বছরে এই ব্যয় চার গুণ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ বাবদ সরকার ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৫ হাজার কোটি টাকা বেশি।

রাজস্ব খাতের সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা থমকে আছে। এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা—এই দুটি বিভাগ করার অধ্যাদেশ বিএনপি সরকার পাস করেনি। গত ২৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে প্রধান করে একটি সংস্কার কমিটি গঠন করা হলেও তারা এখনো প্রতিবেদন দেয়নি। তবে গত ২৩ আগস্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে এনবিআর জানায়, উপজেলা পর্যন্ত করজাল বিস্তার ও অটোমেশনের মাধ্যমে ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা বর্তমানে মাত্র ৭ শতাংশের কাছাকাছি।

সার্বিক বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ দুই কারণেই ব্যয় বাড়ছে। কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলেও হরমুজ প্রণালির সংকটের কারণে স্পট মার্কেট থেকে বাড়তি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ খাতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ ও নতুন বেতনকাঠামোর কারণে খরচ বেড়েছে। তবে অর্থায়নের বিষয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, রাজস্ব বাড়াতে তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে এবং কর পরিহার ও জালিয়াতি রোধে নজর দেওয়া হচ্ছে। সঠিক ব্যয় ও ঋণ ব্যবস্থাপনার কারণে অর্থায়ন নিয়ে আপাতত চিন্তার কোনো কারণ নেই।