লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৮:৩৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসলামে সৎ ব্যবসায়ীদের গুণাবলি ও সততার পুরস্কার

নবীজি হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর সম্মানিত সাহাবিদের অনেকেই জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হিসেবে ব্যবসাকে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁদের অনুসৃত ব্যবসায়িক আদর্শ ছিল সম্পূর্ণ ন্যায়, নীতি ও সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামে সৎপন্থায় ব্যবসা করার জন্য ইহকাল ও পরকালে যেমন মহা পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে, তেমনি অসৎ উপায়ে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে উভয় জগতেই রয়েছে চরম ব্যর্থতা ও কঠিন শাস্তি। ইসলামের আলোতে একজন আদর্শ ব্যবসায়ীর চরিত্র ও গুণাবলি কেমন হওয়া উচিত, তা বিভিন্ন দিকনির্দেশনার মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে।

ব্যবসায়িক সততার প্রথম শর্ত হলো ক্রেতাকে কোনো ধরনের ধোঁকা না দেওয়া। বিক্রেতা সৎ হলে ক্রেতার মনে বিশ্বাস তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার উন্নতি ঘটায়। পক্ষান্তরে, মন্দ পণ্যকে ভালো বলে চালানো বা ভালো মন্দের মিশ্রণ ঘটিয়ে ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করা সম্পূর্ণ হারাম। একদিন আল্লাহর রাসুল (সা.) বাজারে গিয়ে এক খাদ্য বিক্রেতার শস্যস্তূপে হাত প্রবেশ করিয়ে ভেতরের অংশ ভেজা ও নিম্নমানের দেখতে পান। কারণ জানতে চাইলে বিক্রেতা জানান যে বৃষ্টিতে পণ্যটি ভিজে গিয়েছিল। তখন রাসুল (সা.) বলেন, তুমি কেন তা ওপরে রাখলে না যাতে মানুষ দেখতে পায়? মনে রেখো, যে ধোঁকা দেয়, সে আমার উম্মত নয় (সহিহ মুসলিম: ১০২)।

মিথ্যা কথা বলা একজন মুমিনের চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ব্যবসার খাতিরে মিথ্যা বলা কবিরা গুনাহ। রাসুল (সা.)-কে একদা জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মুমিন কি ভীরু বা কৃপণ হতে পারে? তিনি জবাবে বললেন, হ্যাঁ। কিন্তু যখন জিজ্ঞেস করা হলো, মুমিন কি মিথ্যুক হতে পারে? তিনি স্পষ্ট উত্তর দিলেন, না (সুনানে বাইহাকি: ৪৮১২)। মিথ্যা বলার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে নবীজি (সা.) বলেছেন, মিথ্যা পরিহার করো, কারণ মিথ্যা মানুষকে পাপাচারের দিকে এবং পাপাচার জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায় (সহিহ মুসলিম: ২৬০৭)।

সঠিক পরিমাপ ও ওজনে কম না দেওয়া সৎ ব্যবসায়ীদের অন্যতম প্রধান গুণ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ওজনে সঠিক পরিমাপের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, মেপে দেওয়ার সময় পূর্ণ মেপে দেবে এবং সঠিক পাল্লায় ওজন করবে; এটি উত্তম এবং এর পরিণাম শুভ (সুরা বনি ইসরাইল: ৩৫)। যারা ওজনে কারচুপি করে ক্রেতার অধিকার নষ্ট করে, তাদের জন্য ধ্বংসের বার্তা দিয়ে সুরা মুতাফফিফিনের ১-৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা পরিমাপে কম দেয়। রাসুল (সা.)-ও সতর্ক করেছেন যে, যে ব্যক্তি অন্য কারও ক্ষতিসাধন করে, আল্লাহ তায়ালা তার নিজেরই ক্ষতিসাধন করেন (তিরমিজি: ১৯৪০)।

ক্রেতাদের সঙ্গে নম্র ও কোমল আচরণ করা ব্যবসার শ্রী বৃদ্ধি করে। কোমল স্বভাবের ব্যবসায়ীদের জন্য রাসুল (সা.) দোয়া করে বলেছেন, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করুন, যে বিক্রির সময়, ক্রয়ের সময় এবং পাওনা দাবির সময় সদয় থাকে (সহিহ বোখারি: ২০৭৬)। অন্যদিকে, পণ্য বিক্রির জন্য মিথ্যা কসম বা শপথ খাওয়ার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা যে তিন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলবেন না এবং যাদের পবিত্র করবেন না, তাদের একজন হলো সেই ব্যক্তি যে মিথ্যা কসম খেয়ে পণ্য বিক্রি করে (সহিহ মুসলিম: ১০৬)।

ব্যবসায়িক পুঁজি বাড়াতে সুদের কারবার করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আপাতদৃষ্টিতে সুদে অর্থ বৃদ্ধি পাচ্ছে মনে হলেও এর শেষ পরিণতি অত্যন্ত সংকীর্ণ ও ধ্বংসাত্মক (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৭৯)। অনেকে না বুঝে বাকিতে বা কিস্তিতে বিক্রির সময় অতিরিক্ত অর্থ ধার্য করেন, যা সুদের অন্তর্ভুক্ত। সুরা বাকারার ২৭৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। এছাড়া ক্রেতাকে কোনো মারপ্যাঁচে ফেলে পণ্য কিনতে বাধ্য করাও অনৈতিক। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, পারস্পরিক সম্মতি ছাড়া একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না (সুরা নিসা: ২৯)।

বাজারে কৃত্রিম উপায়ে পণ্যের দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে দালালি বা প্রতারণামূলক আচরণ করা নিষিদ্ধ। পণ্য কেনার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও কেবল দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে দরদাম করাকে নবীজি (সা.) নিষেধ করেছেন (মিশকাতুল মাসাবিহ: ৫০২৮)। একই সঙ্গে, অধিক মুনাফার আশায় খাদ্য মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা সম্পূর্ণ হারাম। রাসুল (সা.) বলেছেন, কেবল পাপী ব্যক্তিই মজুতদারি করে (সহিহ মুসলিম: ১৬০৫)। তিনি আরও সতর্ক করেছেন যে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীকে আল্লাহ তায়ালা দুরারোগ্য ব্যাধি ও দারিদ্র্য দ্বারা শাস্তি দেন (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৩৮)।

বর্তমান বাজারে অন্যতম বড় সমস্যা হলো ভেজাল মিশ্রণ। অধিক লাভের লোভে মানুষের ক্ষতি করা এবং প্রতারণামূলকভাবে ভেজাল পণ্য বিক্রি করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রকৃত মুমিন হতে হলে অন্যের জন্য সেটাই পছন্দ করতে হবে যা নিজের জন্য পছন্দনীয়। রাসুল (সা.) শপথ করে বলেছেন, তোমাদের কেউ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে (সুনানে নাসায়ি: ৫০১৭)।

তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল ঘোষণা

ইসলামে সৎ ব্যবসায়ীদের গুণাবলি ও সততার পুরস্কার

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:০২:৫৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নবীজি হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর সম্মানিত সাহাবিদের অনেকেই জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হিসেবে ব্যবসাকে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁদের অনুসৃত ব্যবসায়িক আদর্শ ছিল সম্পূর্ণ ন্যায়, নীতি ও সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামে সৎপন্থায় ব্যবসা করার জন্য ইহকাল ও পরকালে যেমন মহা পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে, তেমনি অসৎ উপায়ে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে উভয় জগতেই রয়েছে চরম ব্যর্থতা ও কঠিন শাস্তি। ইসলামের আলোতে একজন আদর্শ ব্যবসায়ীর চরিত্র ও গুণাবলি কেমন হওয়া উচিত, তা বিভিন্ন দিকনির্দেশনার মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে।

ব্যবসায়িক সততার প্রথম শর্ত হলো ক্রেতাকে কোনো ধরনের ধোঁকা না দেওয়া। বিক্রেতা সৎ হলে ক্রেতার মনে বিশ্বাস তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার উন্নতি ঘটায়। পক্ষান্তরে, মন্দ পণ্যকে ভালো বলে চালানো বা ভালো মন্দের মিশ্রণ ঘটিয়ে ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করা সম্পূর্ণ হারাম। একদিন আল্লাহর রাসুল (সা.) বাজারে গিয়ে এক খাদ্য বিক্রেতার শস্যস্তূপে হাত প্রবেশ করিয়ে ভেতরের অংশ ভেজা ও নিম্নমানের দেখতে পান। কারণ জানতে চাইলে বিক্রেতা জানান যে বৃষ্টিতে পণ্যটি ভিজে গিয়েছিল। তখন রাসুল (সা.) বলেন, তুমি কেন তা ওপরে রাখলে না যাতে মানুষ দেখতে পায়? মনে রেখো, যে ধোঁকা দেয়, সে আমার উম্মত নয় (সহিহ মুসলিম: ১০২)।

মিথ্যা কথা বলা একজন মুমিনের চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ব্যবসার খাতিরে মিথ্যা বলা কবিরা গুনাহ। রাসুল (সা.)-কে একদা জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মুমিন কি ভীরু বা কৃপণ হতে পারে? তিনি জবাবে বললেন, হ্যাঁ। কিন্তু যখন জিজ্ঞেস করা হলো, মুমিন কি মিথ্যুক হতে পারে? তিনি স্পষ্ট উত্তর দিলেন, না (সুনানে বাইহাকি: ৪৮১২)। মিথ্যা বলার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে নবীজি (সা.) বলেছেন, মিথ্যা পরিহার করো, কারণ মিথ্যা মানুষকে পাপাচারের দিকে এবং পাপাচার জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায় (সহিহ মুসলিম: ২৬০৭)।

সঠিক পরিমাপ ও ওজনে কম না দেওয়া সৎ ব্যবসায়ীদের অন্যতম প্রধান গুণ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ওজনে সঠিক পরিমাপের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, মেপে দেওয়ার সময় পূর্ণ মেপে দেবে এবং সঠিক পাল্লায় ওজন করবে; এটি উত্তম এবং এর পরিণাম শুভ (সুরা বনি ইসরাইল: ৩৫)। যারা ওজনে কারচুপি করে ক্রেতার অধিকার নষ্ট করে, তাদের জন্য ধ্বংসের বার্তা দিয়ে সুরা মুতাফফিফিনের ১-৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা পরিমাপে কম দেয়। রাসুল (সা.)-ও সতর্ক করেছেন যে, যে ব্যক্তি অন্য কারও ক্ষতিসাধন করে, আল্লাহ তায়ালা তার নিজেরই ক্ষতিসাধন করেন (তিরমিজি: ১৯৪০)।

ক্রেতাদের সঙ্গে নম্র ও কোমল আচরণ করা ব্যবসার শ্রী বৃদ্ধি করে। কোমল স্বভাবের ব্যবসায়ীদের জন্য রাসুল (সা.) দোয়া করে বলেছেন, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করুন, যে বিক্রির সময়, ক্রয়ের সময় এবং পাওনা দাবির সময় সদয় থাকে (সহিহ বোখারি: ২০৭৬)। অন্যদিকে, পণ্য বিক্রির জন্য মিথ্যা কসম বা শপথ খাওয়ার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা যে তিন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলবেন না এবং যাদের পবিত্র করবেন না, তাদের একজন হলো সেই ব্যক্তি যে মিথ্যা কসম খেয়ে পণ্য বিক্রি করে (সহিহ মুসলিম: ১০৬)।

ব্যবসায়িক পুঁজি বাড়াতে সুদের কারবার করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আপাতদৃষ্টিতে সুদে অর্থ বৃদ্ধি পাচ্ছে মনে হলেও এর শেষ পরিণতি অত্যন্ত সংকীর্ণ ও ধ্বংসাত্মক (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৭৯)। অনেকে না বুঝে বাকিতে বা কিস্তিতে বিক্রির সময় অতিরিক্ত অর্থ ধার্য করেন, যা সুদের অন্তর্ভুক্ত। সুরা বাকারার ২৭৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। এছাড়া ক্রেতাকে কোনো মারপ্যাঁচে ফেলে পণ্য কিনতে বাধ্য করাও অনৈতিক। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, পারস্পরিক সম্মতি ছাড়া একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না (সুরা নিসা: ২৯)।

বাজারে কৃত্রিম উপায়ে পণ্যের দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে দালালি বা প্রতারণামূলক আচরণ করা নিষিদ্ধ। পণ্য কেনার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও কেবল দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে দরদাম করাকে নবীজি (সা.) নিষেধ করেছেন (মিশকাতুল মাসাবিহ: ৫০২৮)। একই সঙ্গে, অধিক মুনাফার আশায় খাদ্য মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা সম্পূর্ণ হারাম। রাসুল (সা.) বলেছেন, কেবল পাপী ব্যক্তিই মজুতদারি করে (সহিহ মুসলিম: ১৬০৫)। তিনি আরও সতর্ক করেছেন যে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীকে আল্লাহ তায়ালা দুরারোগ্য ব্যাধি ও দারিদ্র্য দ্বারা শাস্তি দেন (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৩৮)।

বর্তমান বাজারে অন্যতম বড় সমস্যা হলো ভেজাল মিশ্রণ। অধিক লাভের লোভে মানুষের ক্ষতি করা এবং প্রতারণামূলকভাবে ভেজাল পণ্য বিক্রি করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রকৃত মুমিন হতে হলে অন্যের জন্য সেটাই পছন্দ করতে হবে যা নিজের জন্য পছন্দনীয়। রাসুল (সা.) শপথ করে বলেছেন, তোমাদের কেউ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে (সুনানে নাসায়ি: ৫০১৭)।