লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৩:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিন বছরের ইসরাইলি আগ্রাসনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজা: বিপর্যস্ত জনজীবন

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজা উপত্যকায় শুরু হওয়া ইসরাইলি সামরিক আগ্রাসন তিন বছর পেরিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে গাজা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইসরাইলি বিমান ও স্থল হামলায় ঘরবাড়ি, সড়ক, বিদ্যুৎ, পানি, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৭৪ হাজার ২৪৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি; যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরেও এক হাজার ৪৬২ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।

তীব্র মানবিক সংকটের মুখে গাজার ৯৪ শতাংশ মানুষের জরুরি আশ্রয় ও গৃহস্থালি সহায়তার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৬৫ শতাংশ পরিবার বর্তমানে তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির তীব্র সংকট দৈনন্দিন জীবনকে অচল করে দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থার কারণে জরুরি সেবা পৌঁছানো, এমনকি মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া বা কাপড় ধোয়ার মতো সাধারণ কাজগুলোও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গাজার অর্থনীতি প্রায় ধসে পড়েছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে উপত্যকার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বেকারত্বের হার ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালে মাথাপিছু জিডিপি কমে দাঁড়িয়েছে ২১২ ডলারে, যা ২০২২ সালের তুলনায় মাত্র ১৭ শতাংশ। কৃষি, শিল্প ও নির্মাণ খাতের উৎপাদন নগণ্য পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফলে অধিকাংশ পরিবার এখন মানবিক সহায়তা ও ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং নগদ অর্থের অভাবে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার বেড়েছে।

শিশুদের শিক্ষাজীবনও চরম বিপর্যয়ের মুখে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সি প্রায় সাত লাখ শিশু তিন বছর ধরে নিয়মিত শিক্ষার বাইরে রয়েছে, যাদের মধ্যে দুই লাখ শিশু কোনো ধরনের শিক্ষার সুযোগই পাচ্ছে না। অনেক শিশু তাঁবুতে অস্থায়ীভাবে পাঠ গ্রহণ করছে, যা একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

স্বাস্থ্যসেবা খাতও ভেঙে পড়েছে। ৩৬টি হাসপাতালের সবগুলোই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বর্তমানে মাত্র ১৯টি হাসপাতাল আংশিক চালু রয়েছে এবং কোনোটিই পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে ক্যানসার ও কিডনি রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় ১২ হাজার ৪০০ রোগীকে চিকিৎসার জন্য বাইরে নেওয়া হলেও আরও হাজার হাজার মানুষের বিশেষায়িত সেবা প্রয়োজন। এছাড়া স্যানিটেশন ও পানির অভাবে রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়ছে।

ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায়ও এসেছে আমূল পরিবর্তন। সেপ্টেম্বর নাগাদ গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ বা প্রবেশাধিকার নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল। রাফাহ শহরের বাসিন্দারাও এর ব্যতিক্রম নয়; ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরাইলি অভিযানের পর আট লাখের বেশি মানুষ সেখান থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। প্রশাসনিকভাবেও হামাসের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে, যদিও একটি ফিলিস্তিনি কারিগরি কমিটির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। সব মিলিয়ে, দীর্ঘ তিন বছরের যুদ্ধে গাজার সামাজিক ও অবকাঠামোগত ভিত্তি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।

যুদ্ধের আগে ২০০৭ সাল থেকে গাজা শাসন করত হামাস। যুদ্ধের ফলে বেসামরিক প্রশাসন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। হামাস প্রশাসনিক ক্ষমতা একটি ফিলিস্তিনি কারিগরি কমিটির কাছে হস্তান্তরের ঘোষণা দিলেও সেই প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

জনপ্রিয় সংবাদ

সরকারকে বিপাকে ফেলতে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে পতিত দোসররা: রিজভী

তিন বছরের ইসরাইলি আগ্রাসনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজা: বিপর্যস্ত জনজীবন

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮:০২:৩৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজা উপত্যকায় শুরু হওয়া ইসরাইলি সামরিক আগ্রাসন তিন বছর পেরিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে গাজা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইসরাইলি বিমান ও স্থল হামলায় ঘরবাড়ি, সড়ক, বিদ্যুৎ, পানি, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৭৪ হাজার ২৪৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি; যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরেও এক হাজার ৪৬২ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।

তীব্র মানবিক সংকটের মুখে গাজার ৯৪ শতাংশ মানুষের জরুরি আশ্রয় ও গৃহস্থালি সহায়তার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৬৫ শতাংশ পরিবার বর্তমানে তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির তীব্র সংকট দৈনন্দিন জীবনকে অচল করে দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থার কারণে জরুরি সেবা পৌঁছানো, এমনকি মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া বা কাপড় ধোয়ার মতো সাধারণ কাজগুলোও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গাজার অর্থনীতি প্রায় ধসে পড়েছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে উপত্যকার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বেকারত্বের হার ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালে মাথাপিছু জিডিপি কমে দাঁড়িয়েছে ২১২ ডলারে, যা ২০২২ সালের তুলনায় মাত্র ১৭ শতাংশ। কৃষি, শিল্প ও নির্মাণ খাতের উৎপাদন নগণ্য পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফলে অধিকাংশ পরিবার এখন মানবিক সহায়তা ও ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং নগদ অর্থের অভাবে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার বেড়েছে।

শিশুদের শিক্ষাজীবনও চরম বিপর্যয়ের মুখে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সি প্রায় সাত লাখ শিশু তিন বছর ধরে নিয়মিত শিক্ষার বাইরে রয়েছে, যাদের মধ্যে দুই লাখ শিশু কোনো ধরনের শিক্ষার সুযোগই পাচ্ছে না। অনেক শিশু তাঁবুতে অস্থায়ীভাবে পাঠ গ্রহণ করছে, যা একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

স্বাস্থ্যসেবা খাতও ভেঙে পড়েছে। ৩৬টি হাসপাতালের সবগুলোই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বর্তমানে মাত্র ১৯টি হাসপাতাল আংশিক চালু রয়েছে এবং কোনোটিই পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে ক্যানসার ও কিডনি রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় ১২ হাজার ৪০০ রোগীকে চিকিৎসার জন্য বাইরে নেওয়া হলেও আরও হাজার হাজার মানুষের বিশেষায়িত সেবা প্রয়োজন। এছাড়া স্যানিটেশন ও পানির অভাবে রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়ছে।

ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায়ও এসেছে আমূল পরিবর্তন। সেপ্টেম্বর নাগাদ গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ বা প্রবেশাধিকার নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল। রাফাহ শহরের বাসিন্দারাও এর ব্যতিক্রম নয়; ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরাইলি অভিযানের পর আট লাখের বেশি মানুষ সেখান থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। প্রশাসনিকভাবেও হামাসের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে, যদিও একটি ফিলিস্তিনি কারিগরি কমিটির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। সব মিলিয়ে, দীর্ঘ তিন বছরের যুদ্ধে গাজার সামাজিক ও অবকাঠামোগত ভিত্তি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।

যুদ্ধের আগে ২০০৭ সাল থেকে গাজা শাসন করত হামাস। যুদ্ধের ফলে বেসামরিক প্রশাসন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। হামাস প্রশাসনিক ক্ষমতা একটি ফিলিস্তিনি কারিগরি কমিটির কাছে হস্তান্তরের ঘোষণা দিলেও সেই প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।