লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০২:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজা শাসনে হামাসের দাপট কি আর অবশিষ্ট আছে?

ইসরাইলে হামাসের হামলার তিন বছর পর গাজার বাস্তবতা আমূল বদলেছে। সামরিক কাঠামো ধ্বংস ও প্রশাসন বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে হামাস এখন একটি সুসংগঠিত বাহিনীর পরিবর্তে গেরিলা গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।

ইসরাইলে গাজার সাবেক শাসকগোষ্ঠী হামাসের সেই ভয়াবহ হামলার আজ তিন বছর পূর্ণ হলো। এই দীর্ঘ সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে এবং অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা এখন চরম অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছে। হামলার বর্ষপূর্তিতে অবশিষ্ট জঙ্গিদের সম্ভাব্য হামলার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ গতকাল মঙ্গলবার গাজার সীমানাজুড়ে ইসরাইলি বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

নিরাপত্তা সংক্রান্ত এই কঠোর অবস্থানের আড়ালে রয়েছে এক পরিবর্তিত বাস্তবতা; প্রায় দুই দশক ধরে গাজা শাসন করা হামাসের আগের দাপট এখন আর নেই। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সামরিক শাখা আল কাসেম ব্রিগেড একটি সুসংগঠিত ও সুবিন্যস্ত সেনাবাহিনী হিসেবে কার্যক্রম চালিয়েছিল। তখন তাদের ৩০ থেকে ৪০ হাজার সক্রিয় যোদ্ধা ছিল, যারা পাঁচটি আঞ্চলিক ব্রিগেড, ২৪টি ব্যাটালিয়ন এবং প্রায় ১৪০টি কোম্পানিতে বিভক্ত ছিল। যুদ্ধের তিন বছরে গোষ্ঠীটির সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তাদের শীর্ষ রাজনীতিক ও যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়া প্রায় সবাই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন এবং রাষ্ট্রসদৃশ আনুষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। গত জুলাই মাসে হামাস আনুষ্ঠানিকভাবে গাজায় তাদের বেসামরিক প্রশাসন বিলুপ্ত করার ঘোষণা দেয়, যা নাগরিক সেবা বা কর আদায়ের মতো কার্যক্রমে তাদের অক্ষমতারই স্বীকারোক্তি।

এক সময় আল কাসেম ব্রিগেড প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার সুসংগঠিত যোদ্ধা নিয়ে পাঁচটি আঞ্চলিক ব্রিগেড, ২৪টি ব্যাটালিয়ন এবং ১৪০টি কোম্পানিতে বিভক্ত ছিল। তাদের ছিল উন্নত সামরিক-শিল্প সক্ষমতা এবং গাজা মেট্রো নামে পরিচিত শক্তিশালী সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক। তবে বর্তমানে ইসরাইলি গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, সেই আনুষ্ঠানিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে। ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও প্রকাশ্য কমান্ড পোস্টের বেশিরভাগই ধ্বংস বা দখল হয়ে গেছে। বর্তমানে গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ, বাফার জোন অথবা ইয়েলো লাইন বিভাজন রেখার অধীন।

শীর্ষ নেতাদের একের পর এক নির্মূল হওয়ার কারণে হামাসের সামরিক সক্ষমতা ধসে পড়েছে। এদের মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তেহরানে ইসমাইল হানিয়া, অক্টোবরে রাফায় ইয়াহিয়া সিনওয়ার, ২০২৫ সালের মে মাসে মোহাম্মদ সিনওয়ার এবং ২০২৬ সালের মে মাসে ইজ আল-দিন আল-হাদ্দাদ নিহত হন। নেতৃত্বের এই শূন্যতায় হামাসের সশস্ত্র শাখা এখন বিকেন্দ্রীভূত ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। তারা এখন সুড়ঙ্গ বা ধ্বংসস্তূপ থেকে আইইডি, স্নাইপার হামলা এবং হিট-অ্যান্ড-রান কৌশলের ওপর নির্ভরশীল।

জুলাই মাসে দোহায় নির্বাসিত খলিল আল-হাইয়া হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর পঞ্চম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি বর্তমানে সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং কূটনৈতিক তৎপরতা পরিচালনার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। যদিও প্রশাসনিক দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে, তবুও যেসব এলাকায় ইসরাইলি উপস্থিতি সীমিত, সেখানে হামাসের গোপন এনফোর্সমেন্ট ইউনিটগুলো স্থানীয় অপরাধী চক্র বা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সঙ্গে মানবিক সহায়তা বিতরণের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাতে লিপ্ত রয়েছে। ২০০৭ সালের জুন মাসে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯ বছর ধরে হামাস গাজায় কেবল একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে নয়, বরং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রীয় সত্তা হিসেবে কার্যক্রম চালিয়েছে। তারা সরকারি মন্ত্রণালয় পরিচালনা, কর আদায়, পুলিশ বাহিনী নিয়ন্ত্রণ, দেওয়ানি আদালত পরিচালনা এবং সরকারি স্কুল ব্যবস্থা ব্যবস্থাপনার মতো কাজগুলো করেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সিটি ব্যাংকে ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার পদে নিয়োগ, আবেদন ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত

গাজা শাসনে হামাসের দাপট কি আর অবশিষ্ট আছে?

প্রকাশিত হয়েছে: ০৭:২৯:১৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

ইসরাইলে গাজার সাবেক শাসকগোষ্ঠী হামাসের সেই ভয়াবহ হামলার আজ তিন বছর পূর্ণ হলো। এই দীর্ঘ সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে এবং অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা এখন চরম অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছে। হামলার বর্ষপূর্তিতে অবশিষ্ট জঙ্গিদের সম্ভাব্য হামলার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ গতকাল মঙ্গলবার গাজার সীমানাজুড়ে ইসরাইলি বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

নিরাপত্তা সংক্রান্ত এই কঠোর অবস্থানের আড়ালে রয়েছে এক পরিবর্তিত বাস্তবতা; প্রায় দুই দশক ধরে গাজা শাসন করা হামাসের আগের দাপট এখন আর নেই। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সামরিক শাখা আল কাসেম ব্রিগেড একটি সুসংগঠিত ও সুবিন্যস্ত সেনাবাহিনী হিসেবে কার্যক্রম চালিয়েছিল। তখন তাদের ৩০ থেকে ৪০ হাজার সক্রিয় যোদ্ধা ছিল, যারা পাঁচটি আঞ্চলিক ব্রিগেড, ২৪টি ব্যাটালিয়ন এবং প্রায় ১৪০টি কোম্পানিতে বিভক্ত ছিল। যুদ্ধের তিন বছরে গোষ্ঠীটির সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তাদের শীর্ষ রাজনীতিক ও যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়া প্রায় সবাই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন এবং রাষ্ট্রসদৃশ আনুষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। গত জুলাই মাসে হামাস আনুষ্ঠানিকভাবে গাজায় তাদের বেসামরিক প্রশাসন বিলুপ্ত করার ঘোষণা দেয়, যা নাগরিক সেবা বা কর আদায়ের মতো কার্যক্রমে তাদের অক্ষমতারই স্বীকারোক্তি।

এক সময় আল কাসেম ব্রিগেড প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার সুসংগঠিত যোদ্ধা নিয়ে পাঁচটি আঞ্চলিক ব্রিগেড, ২৪টি ব্যাটালিয়ন এবং ১৪০টি কোম্পানিতে বিভক্ত ছিল। তাদের ছিল উন্নত সামরিক-শিল্প সক্ষমতা এবং গাজা মেট্রো নামে পরিচিত শক্তিশালী সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক। তবে বর্তমানে ইসরাইলি গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, সেই আনুষ্ঠানিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে। ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও প্রকাশ্য কমান্ড পোস্টের বেশিরভাগই ধ্বংস বা দখল হয়ে গেছে। বর্তমানে গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ, বাফার জোন অথবা ইয়েলো লাইন বিভাজন রেখার অধীন।

শীর্ষ নেতাদের একের পর এক নির্মূল হওয়ার কারণে হামাসের সামরিক সক্ষমতা ধসে পড়েছে। এদের মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তেহরানে ইসমাইল হানিয়া, অক্টোবরে রাফায় ইয়াহিয়া সিনওয়ার, ২০২৫ সালের মে মাসে মোহাম্মদ সিনওয়ার এবং ২০২৬ সালের মে মাসে ইজ আল-দিন আল-হাদ্দাদ নিহত হন। নেতৃত্বের এই শূন্যতায় হামাসের সশস্ত্র শাখা এখন বিকেন্দ্রীভূত ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। তারা এখন সুড়ঙ্গ বা ধ্বংসস্তূপ থেকে আইইডি, স্নাইপার হামলা এবং হিট-অ্যান্ড-রান কৌশলের ওপর নির্ভরশীল।

জুলাই মাসে দোহায় নির্বাসিত খলিল আল-হাইয়া হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর পঞ্চম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি বর্তমানে সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং কূটনৈতিক তৎপরতা পরিচালনার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। যদিও প্রশাসনিক দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে, তবুও যেসব এলাকায় ইসরাইলি উপস্থিতি সীমিত, সেখানে হামাসের গোপন এনফোর্সমেন্ট ইউনিটগুলো স্থানীয় অপরাধী চক্র বা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সঙ্গে মানবিক সহায়তা বিতরণের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাতে লিপ্ত রয়েছে। ২০০৭ সালের জুন মাসে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯ বছর ধরে হামাস গাজায় কেবল একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে নয়, বরং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রীয় সত্তা হিসেবে কার্যক্রম চালিয়েছে। তারা সরকারি মন্ত্রণালয় পরিচালনা, কর আদায়, পুলিশ বাহিনী নিয়ন্ত্রণ, দেওয়ানি আদালত পরিচালনা এবং সরকারি স্কুল ব্যবস্থা ব্যবস্থাপনার মতো কাজগুলো করেছে।