লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১২:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিম্নআয়ের দেশে চড়া সুদের চাপ, সহজ শর্তে ঋণের তাগিদ আইএমএফের

বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ও চড়া সুদের চাপে নিম্নআয়ের ও দরিদ্র দেশগুলোতে ঋণ পরিশোধের মাশুল আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সংকট উত্তরণে দ্রুত ও কার্যকর উপায়ে ঋণ পুনর্গঠন নিশ্চিত করার পাশাপাশি এসব দেশের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও আর্থিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা।

গত শনিবার সকালে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএসএনসিসি) অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলনের ষষ্ঠ দিনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বৈশ্বিক এই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। প্রকাশিত উপাত্ত অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে নিম্নআয়ের দেশগুলোর নিজস্ব রাজস্ব আয়ের যে অংশ ঋণ পরিশোধে চলে যেত, তা ৮ শতাংশ থেকে একলাফে বেড়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

সংবাদ ব্রিফিংয়ে আইএমএফ প্রধান মন্তব্য করেন যে দরিদ্র দেশের সাধারণ মানুষের কাছে মূল্যস্ফীতি কার্যত এক ধরনের করের মতো। সাধারণ জনগণ কোনোভাবেই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি পছন্দ করেন না। তারা সরকারের কাছ থেকে স্পষ্ট ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করেন, যাতে একটি স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং উদ্যোক্তারা স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসায় বিস্তার করতে পারেন।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেকোনো অর্থনৈতিক সংকট বা নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটলে তার ধাক্কা সবার আগে ও সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্নআয়ের দেশগুলোর ওপর। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাহায্য-সহযোগিতার ক্ষেত্রে এসব দেশকে সবার ওপরে রাখার তাগিদ দিয়ে জর্জিয়েভা জানান, দরিদ্র দেশগুলোর জন্য অর্থায়নের নতুন পথ উন্মোচনে কাজ করছে সংস্থাটি। এরই অংশ হিসেবে 'দারিদ্র্য হ্রাস ও প্রবৃদ্ধি সহায়তা তহবিল' (পিআরজিটি)-এর সক্ষমতা বাড়াতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে বাড়তি অনুদান আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন নীতিগত সংস্কারের ফলে যোগ্য দেশগুলো এখন আগের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি পরিমাণ ঋণ সহজ শর্তে পেতে পারে। একই সঙ্গে এসব দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে 'ক্ষমতা উন্নয়ন' (ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট) কার্যক্রমে অতিরিক্ত তহবিল নিশ্চিত করা হয়েছে।

বর্তমান আর্থিক সক্ষমতার বিশ্লেষণে আইএমএফ এমডি স্পষ্ট করেন যে সব নিম্নআয়ের দেশকে কঠোর অর্থনৈতিক ব্যয় সংকোচন বা কঠিন সমন্বয়ের পথ বেছে নিতে হবে—বিষয়টি তেমন নয়। বিগত কয়েক বছরে অনেক দেশই নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি জোরদার করতে এবং ঋণের স্বাভাবিক প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে প্রশংসনীয় উন্নতি দেখিয়েছে। ডেটা বিশ্লেষণ করে তিনি জানান, উন্নত বা উচ্চআয়ের দেশগুলোতে জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত ক্রমশ বাড়লেও নিম্নআয়ের দেশে এই অনুপাত খানিকটা নিম্নমুখী। কিন্তু সার্বিক মূল্যস্ফীতি ও চড়া সুদের হার অপরিবর্তিত থাকায় ঋণের আসল বোঝা কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে মূল ঋণের অঙ্ক কিছুটা কমলেও কেবল চড়া সুদের কারণেই অর্জিত রাজস্বের বড় অংশ বের হয়ে যাচ্ছে।

এই সংকট কাটাতে জিসিরো-২০-এর 'কমন ফ্রেমওয়ার্ক'-কে কাজে লাগিয়ে দ্রুত ঋণ পুনর্গঠনে সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের তাগিদ দেন জর্জিয়েভা। এ ক্ষেত্রে সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদানের নেতৃত্বাধীন প্রচেষ্টার বিশেষ প্রশংসা করেন তিনি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যেসব দেশের ঋণ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে সাময়িক তরল্য বা অর্থসংকট রয়েছে, তাদের নিজস্ব রাজস্ব আদায় বাড়াতে সহায়তা প্রদান জরুরি। একই সঙ্গে একটি নিরাপদ আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পরিবেশ গড়তে হবে। দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য ন্যায়সংগত রাজস্ব নীতি গ্রহণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি খরচের সঠিক প্রাধান্য নির্ধারণের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো উদীয়মান প্রযুক্তি গ্রহণ এবং প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা বলয় জোরদার করা আবশ্যক।

জনপ্রিয় সংবাদ

ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবায় রোগীর তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা

নিম্নআয়ের দেশে চড়া সুদের চাপ, সহজ শর্তে ঋণের তাগিদ আইএমএফের

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:১৮:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ও চড়া সুদের চাপে নিম্নআয়ের ও দরিদ্র দেশগুলোতে ঋণ পরিশোধের মাশুল আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সংকট উত্তরণে দ্রুত ও কার্যকর উপায়ে ঋণ পুনর্গঠন নিশ্চিত করার পাশাপাশি এসব দেশের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও আর্থিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা।

গত শনিবার সকালে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএসএনসিসি) অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলনের ষষ্ঠ দিনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বৈশ্বিক এই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। প্রকাশিত উপাত্ত অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে নিম্নআয়ের দেশগুলোর নিজস্ব রাজস্ব আয়ের যে অংশ ঋণ পরিশোধে চলে যেত, তা ৮ শতাংশ থেকে একলাফে বেড়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

সংবাদ ব্রিফিংয়ে আইএমএফ প্রধান মন্তব্য করেন যে দরিদ্র দেশের সাধারণ মানুষের কাছে মূল্যস্ফীতি কার্যত এক ধরনের করের মতো। সাধারণ জনগণ কোনোভাবেই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি পছন্দ করেন না। তারা সরকারের কাছ থেকে স্পষ্ট ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করেন, যাতে একটি স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং উদ্যোক্তারা স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসায় বিস্তার করতে পারেন।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেকোনো অর্থনৈতিক সংকট বা নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটলে তার ধাক্কা সবার আগে ও সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্নআয়ের দেশগুলোর ওপর। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাহায্য-সহযোগিতার ক্ষেত্রে এসব দেশকে সবার ওপরে রাখার তাগিদ দিয়ে জর্জিয়েভা জানান, দরিদ্র দেশগুলোর জন্য অর্থায়নের নতুন পথ উন্মোচনে কাজ করছে সংস্থাটি। এরই অংশ হিসেবে 'দারিদ্র্য হ্রাস ও প্রবৃদ্ধি সহায়তা তহবিল' (পিআরজিটি)-এর সক্ষমতা বাড়াতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে বাড়তি অনুদান আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন নীতিগত সংস্কারের ফলে যোগ্য দেশগুলো এখন আগের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি পরিমাণ ঋণ সহজ শর্তে পেতে পারে। একই সঙ্গে এসব দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে 'ক্ষমতা উন্নয়ন' (ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট) কার্যক্রমে অতিরিক্ত তহবিল নিশ্চিত করা হয়েছে।

বর্তমান আর্থিক সক্ষমতার বিশ্লেষণে আইএমএফ এমডি স্পষ্ট করেন যে সব নিম্নআয়ের দেশকে কঠোর অর্থনৈতিক ব্যয় সংকোচন বা কঠিন সমন্বয়ের পথ বেছে নিতে হবে—বিষয়টি তেমন নয়। বিগত কয়েক বছরে অনেক দেশই নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি জোরদার করতে এবং ঋণের স্বাভাবিক প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে প্রশংসনীয় উন্নতি দেখিয়েছে। ডেটা বিশ্লেষণ করে তিনি জানান, উন্নত বা উচ্চআয়ের দেশগুলোতে জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত ক্রমশ বাড়লেও নিম্নআয়ের দেশে এই অনুপাত খানিকটা নিম্নমুখী। কিন্তু সার্বিক মূল্যস্ফীতি ও চড়া সুদের হার অপরিবর্তিত থাকায় ঋণের আসল বোঝা কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে মূল ঋণের অঙ্ক কিছুটা কমলেও কেবল চড়া সুদের কারণেই অর্জিত রাজস্বের বড় অংশ বের হয়ে যাচ্ছে।

এই সংকট কাটাতে জিসিরো-২০-এর 'কমন ফ্রেমওয়ার্ক'-কে কাজে লাগিয়ে দ্রুত ঋণ পুনর্গঠনে সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের তাগিদ দেন জর্জিয়েভা। এ ক্ষেত্রে সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদানের নেতৃত্বাধীন প্রচেষ্টার বিশেষ প্রশংসা করেন তিনি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যেসব দেশের ঋণ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে সাময়িক তরল্য বা অর্থসংকট রয়েছে, তাদের নিজস্ব রাজস্ব আদায় বাড়াতে সহায়তা প্রদান জরুরি। একই সঙ্গে একটি নিরাপদ আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পরিবেশ গড়তে হবে। দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য ন্যায়সংগত রাজস্ব নীতি গ্রহণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি খরচের সঠিক প্রাধান্য নির্ধারণের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো উদীয়মান প্রযুক্তি গ্রহণ এবং প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা বলয় জোরদার করা আবশ্যক।