লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৩:৪১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার অতিরিক্ত খরচে দিশেহারা মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষ

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যয়ের ক্রমাগত উর্ধ্বগতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সঙ্গতি রাখতে না পেরে বহু পরিবার এখন প্রয়োজনীয় চাহিদা কাটছাঁট করে টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, এক বছর আগে যে পরিবার মাসে ৩০ হাজার টাকায় চলত, বর্তমান বাজারে সেই একই খরচে মাত্র ২৭.৭ দিন পার করা সম্ভব হচ্ছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় জমানো সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে কিংবা ঋণগ্রস্ত হয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে অনেক পরিবার খাদ্যের মান ও পুষ্টি কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবার তাদের অর্থনৈতিক কষ্টের কথা কাউকে বলতেও পারছে না। বাড়িতে মেহমানদারি ও সামাজিক অনুষ্ঠান কমিয়ে আনার পাশাপাশি খরচ সামলাতে অনেকেই পরিবার গ্রামে পাঠিয়ে দিচ্ছেন কিংবা নিজে শহর ছেড়ে গ্রামে ফেরার কঠিন পথ বেছে নিচ্ছেন। দিনমজুর ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা আরও করুণ অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে। বাসাবাড়ির খরচের পাশাপাশি উৎসবকেন্দ্রিক ও বিনোদনমূলক কেনাকাটাও এখন মারাত্মকভাবে সংকুচিত।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হালনাগাদ খুচরা বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বছরের ব্যবধানে আটা ও ময়দার দাম বেড়েছে ১২.৫০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। প্রতি লিটার খোলা ও বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৬.৫৩ থেকে ১০.৫১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া আলুর দাম ২২.২২ শতাংশ, গরুর মাংস ৭.৮৪ শতাংশ, খাসির মাংস ১৫.৯১ শতাংশ, ব্রয়লার মুরগি ২.৭৮ শতাংশ এবং দেশি মুরগির দাম ১২.৫০ শতাংশ বেড়েছে। একইভাবে চিনির দাম ৪.৬৬ শতাংশ, লবণের দাম ১৬.৮৮ শতাংশ এবং হালিপ্রতি ডিমের দাম ২.১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। ৬০০ ইউনিটের বেশি গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১৪.৬১ টাকা থেকে বেড়ে ১৭.৩৫ টাকা করা হয়েছে এবং লিটারপ্রতি জ্বালানি তেলের দাম বছরের ব্যবধানে ৩৩ থেকে ৪৩ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিবিএস প্রকাশিত ভোক্তা মূল্যসূচকের (সিপিআই) প্রতিবেদনে জানা যায়, গত সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৮.৩৪ শতাংশে, যার বিপরীতে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৭.৯০ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ৮.৩৪ শতাংশের অর্থ হলো—২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যে পণ্য কিনতে ১০০ টাকা লাগত, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সেই একই পণ্য কেনায় খরচ হয়েছে ১০৮ টাকা ৩৪ পয়সা। অর্থাৎ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বাড়ছে, সেই অনুপাতে আয় বৃদ্ধির গতি কমে গেছে।

রাজধানীর কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকরিজীবী আমিনুল ইসলাম জানান, তাঁর পরিবারের সদস্যসংখ্যা চারজন। মাসে ৪৫ হাজার টাকা আয় করলেও প্রতি মাসে তাঁর খরচ দাঁড়াচ্ছে ৪৬ হাজার ২৫ টাকা। খরচের হিসাবে মাসে ৫০ কেজি চালের বস্তা ৩,২০০ টাকা, ৫ লিটার তেল ১,০০০ টাকা, বাসাভাড়া ১৪,০০০ টাকা, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল ৩,০০০ টাকা, তরকারি ও প্রোটিনজাতীয় খাবার ৭,০০০ টাকা, প্রসাধন ও পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী ৭০০ টাকা, মুদি বাজার ২,০০০ টাকা, মোবাইল ও ইন্টারনেট ১,২০০ টাকা, সন্তানের শিক্ষাব্যয় ৭,০০০ টাকা, যাতায়াত ৫,০০০ টাকা এবং গড়ে চিকিৎসা বাবদ ২,০০০ টাকা ব্যয় হয়। ফলে প্রতি মাসে অন্তত ১,০২৫ টাকার ঘাটতিতে পড়ে তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন এবং পরিবারের কেনাকাটা ও খাবার কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

একইভাবে মালিবাগের বাসিন্দা বেসরকারি কর্মকর্তা হামিদুর রহমান জানান, দুই ছেলে, স্ত্রী ও মায়ের সংসার চালাতে ৭১ হাজার ৫০০ টাকা বেতন পেয়েও দুই বছর আগের তুলনায় এখন তিনি চরম হিমশিম খাচ্ছেন। অন্যদিকে কাওরান বাজারের দিনমজুর জহিরুল জানান, গত ছয় বছর ধরে কাজ পেলে দিনে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা মজুরি পান, যা দিয়ে মাসে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা আয় হয়। ঢাকায় মেসে ৬ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে এবং খাবার ও ব্যক্তিগত খরচে ৩ হাজার টাকা রেখে বাকি টাকা গ্রামে পাঠাতে হয়। আয়ের কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় এবং ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় কীভাবে সামনে সংসার চালাবেন তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন তিনি।

এ বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন জানান, মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু আয় না বাড়ায় ক্রয়ক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। টিকতে না পেরে মানুষ সঞ্চয় ভেঙে অথবা ঋণ করে চলছে। তবে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষদের কোনো সঞ্চয় না থাকায় এবং ঋণ না পাওয়ায় তারা আরও কঠিন সংকটে পড়ছেন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, প্রতিনিয়ত পণ্য ও সেবার দাম বাড়লেও মানুষের আয় বাড়ছে না। বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে অনেকে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন। এ সংকট নিরসনে পণ্য ও সেবার মূল্য নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

রাজধানীর কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। মাসে পান ৪৫ হাজার টাকা। মা, স্ত্রী ও এক ছেলে নিয়ে তার সংসার। পরিবারের খাবার জোগাড় করতে মাসে ৫০ কেজির এক বস্তা চাল ৩ হাজার ২০০, পাঁচ লিটার তেল ১০০০, বাসাভাড়া ১৪ হাজার, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল ৩ হাজার, সবজি, মাছ, ব্রয়লার মুরগিসহ তরকারি ও রান্নার উপকরণ কিনতে ৭ হাজার, সাবান-ডিটারজেন্ট ও শ্যাম্পু ৭০০, মুদি বাজার আরও ২ হাজার এবং মোবাইল টকটাইমে খরচ ও ইন্টারনেট বিল ১২০০ টাকা ব্যয় হয়।

কাওরান বাজারে কথা হয় দিনমজুর জহিরুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, যেদিন কাজ পাই সেদিন ৬০০-৮০০ টাকা মজুরি পাই-যা ছয় বছর ধরে একই। মজুরি বাড়েনি। সব মিলে মাসে ১৫-১৬ হাজার টাকা আয় হয়। আমি ঢাকায় একটি মেসে থাকি। সেখানে ৬ হাজার টাকা দিতে হয়। খাবার ও অন্যান্য খরচ ৩ হাজার টাকা রেখে বাকি টাকা গ্রামে পাঠাই। সব মিলে সামনে কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না। তাই কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছি। কারণ বাজারদরের দিকে হিসাব করলে আমার ক্রয়ক্ষতা অনেক কমেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

পাবনার ফরিদপুরে মাদক ও দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার ৫

দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার অতিরিক্ত খরচে দিশেহারা মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষ

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:০৬:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যয়ের ক্রমাগত উর্ধ্বগতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সঙ্গতি রাখতে না পেরে বহু পরিবার এখন প্রয়োজনীয় চাহিদা কাটছাঁট করে টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, এক বছর আগে যে পরিবার মাসে ৩০ হাজার টাকায় চলত, বর্তমান বাজারে সেই একই খরচে মাত্র ২৭.৭ দিন পার করা সম্ভব হচ্ছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় জমানো সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে কিংবা ঋণগ্রস্ত হয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে অনেক পরিবার খাদ্যের মান ও পুষ্টি কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবার তাদের অর্থনৈতিক কষ্টের কথা কাউকে বলতেও পারছে না। বাড়িতে মেহমানদারি ও সামাজিক অনুষ্ঠান কমিয়ে আনার পাশাপাশি খরচ সামলাতে অনেকেই পরিবার গ্রামে পাঠিয়ে দিচ্ছেন কিংবা নিজে শহর ছেড়ে গ্রামে ফেরার কঠিন পথ বেছে নিচ্ছেন। দিনমজুর ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা আরও করুণ অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে। বাসাবাড়ির খরচের পাশাপাশি উৎসবকেন্দ্রিক ও বিনোদনমূলক কেনাকাটাও এখন মারাত্মকভাবে সংকুচিত।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হালনাগাদ খুচরা বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বছরের ব্যবধানে আটা ও ময়দার দাম বেড়েছে ১২.৫০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। প্রতি লিটার খোলা ও বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৬.৫৩ থেকে ১০.৫১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া আলুর দাম ২২.২২ শতাংশ, গরুর মাংস ৭.৮৪ শতাংশ, খাসির মাংস ১৫.৯১ শতাংশ, ব্রয়লার মুরগি ২.৭৮ শতাংশ এবং দেশি মুরগির দাম ১২.৫০ শতাংশ বেড়েছে। একইভাবে চিনির দাম ৪.৬৬ শতাংশ, লবণের দাম ১৬.৮৮ শতাংশ এবং হালিপ্রতি ডিমের দাম ২.১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। ৬০০ ইউনিটের বেশি গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১৪.৬১ টাকা থেকে বেড়ে ১৭.৩৫ টাকা করা হয়েছে এবং লিটারপ্রতি জ্বালানি তেলের দাম বছরের ব্যবধানে ৩৩ থেকে ৪৩ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিবিএস প্রকাশিত ভোক্তা মূল্যসূচকের (সিপিআই) প্রতিবেদনে জানা যায়, গত সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৮.৩৪ শতাংশে, যার বিপরীতে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৭.৯০ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ৮.৩৪ শতাংশের অর্থ হলো—২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যে পণ্য কিনতে ১০০ টাকা লাগত, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সেই একই পণ্য কেনায় খরচ হয়েছে ১০৮ টাকা ৩৪ পয়সা। অর্থাৎ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বাড়ছে, সেই অনুপাতে আয় বৃদ্ধির গতি কমে গেছে।

রাজধানীর কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকরিজীবী আমিনুল ইসলাম জানান, তাঁর পরিবারের সদস্যসংখ্যা চারজন। মাসে ৪৫ হাজার টাকা আয় করলেও প্রতি মাসে তাঁর খরচ দাঁড়াচ্ছে ৪৬ হাজার ২৫ টাকা। খরচের হিসাবে মাসে ৫০ কেজি চালের বস্তা ৩,২০০ টাকা, ৫ লিটার তেল ১,০০০ টাকা, বাসাভাড়া ১৪,০০০ টাকা, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল ৩,০০০ টাকা, তরকারি ও প্রোটিনজাতীয় খাবার ৭,০০০ টাকা, প্রসাধন ও পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী ৭০০ টাকা, মুদি বাজার ২,০০০ টাকা, মোবাইল ও ইন্টারনেট ১,২০০ টাকা, সন্তানের শিক্ষাব্যয় ৭,০০০ টাকা, যাতায়াত ৫,০০০ টাকা এবং গড়ে চিকিৎসা বাবদ ২,০০০ টাকা ব্যয় হয়। ফলে প্রতি মাসে অন্তত ১,০২৫ টাকার ঘাটতিতে পড়ে তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন এবং পরিবারের কেনাকাটা ও খাবার কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

একইভাবে মালিবাগের বাসিন্দা বেসরকারি কর্মকর্তা হামিদুর রহমান জানান, দুই ছেলে, স্ত্রী ও মায়ের সংসার চালাতে ৭১ হাজার ৫০০ টাকা বেতন পেয়েও দুই বছর আগের তুলনায় এখন তিনি চরম হিমশিম খাচ্ছেন। অন্যদিকে কাওরান বাজারের দিনমজুর জহিরুল জানান, গত ছয় বছর ধরে কাজ পেলে দিনে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা মজুরি পান, যা দিয়ে মাসে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা আয় হয়। ঢাকায় মেসে ৬ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে এবং খাবার ও ব্যক্তিগত খরচে ৩ হাজার টাকা রেখে বাকি টাকা গ্রামে পাঠাতে হয়। আয়ের কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় এবং ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় কীভাবে সামনে সংসার চালাবেন তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন তিনি।

এ বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন জানান, মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু আয় না বাড়ায় ক্রয়ক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। টিকতে না পেরে মানুষ সঞ্চয় ভেঙে অথবা ঋণ করে চলছে। তবে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষদের কোনো সঞ্চয় না থাকায় এবং ঋণ না পাওয়ায় তারা আরও কঠিন সংকটে পড়ছেন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, প্রতিনিয়ত পণ্য ও সেবার দাম বাড়লেও মানুষের আয় বাড়ছে না। বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে অনেকে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন। এ সংকট নিরসনে পণ্য ও সেবার মূল্য নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

রাজধানীর কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। মাসে পান ৪৫ হাজার টাকা। মা, স্ত্রী ও এক ছেলে নিয়ে তার সংসার। পরিবারের খাবার জোগাড় করতে মাসে ৫০ কেজির এক বস্তা চাল ৩ হাজার ২০০, পাঁচ লিটার তেল ১০০০, বাসাভাড়া ১৪ হাজার, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল ৩ হাজার, সবজি, মাছ, ব্রয়লার মুরগিসহ তরকারি ও রান্নার উপকরণ কিনতে ৭ হাজার, সাবান-ডিটারজেন্ট ও শ্যাম্পু ৭০০, মুদি বাজার আরও ২ হাজার এবং মোবাইল টকটাইমে খরচ ও ইন্টারনেট বিল ১২০০ টাকা ব্যয় হয়।

কাওরান বাজারে কথা হয় দিনমজুর জহিরুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, যেদিন কাজ পাই সেদিন ৬০০-৮০০ টাকা মজুরি পাই-যা ছয় বছর ধরে একই। মজুরি বাড়েনি। সব মিলে মাসে ১৫-১৬ হাজার টাকা আয় হয়। আমি ঢাকায় একটি মেসে থাকি। সেখানে ৬ হাজার টাকা দিতে হয়। খাবার ও অন্যান্য খরচ ৩ হাজার টাকা রেখে বাকি টাকা গ্রামে পাঠাই। সব মিলে সামনে কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না। তাই কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছি। কারণ বাজারদরের দিকে হিসাব করলে আমার ক্রয়ক্ষতা অনেক কমেছে।