লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১২:৫০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত: জ্বালানি বাজারে বড় ঝড়ের পূর্বাভাস

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় বৈশ্বিক তেলের বাজার বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বা এটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এর আগে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার সময় বিশ্ববাজার বিভিন্ন বিকল্প সরবরাহপথ ব্যবহার করে ধাক্কা সামাল দিতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে ভোক্তাদের ওপর মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপ তুলনামূলক সীমিত ছিল। তখন তেলের দাম বাড়লেও তা ২০২২ সালের ১২৮ ডলার কিংবা ২০০৮ সালের রেকর্ড ১৪৬ ডলারের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে বর্তমান পরিস্থিতি অনেক বেশি বিপজ্জনক এবং সেই বিকল্প ব্যবস্থাগুলোও এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে।

আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বৈশ্বিক কৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফট বলেন, সংঘাত এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এতদিন বাজারে যে ধারণা ছিল যে যেকোনো সংকটেরই বিকল্প পথ খুঁজে পাওয়া যায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ধারণা বদলে যেতে পারে। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম মে মাসের পর প্রথমবারের মতো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করেছে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার এবং ডিজেলের দাম ৫ দশমিক ২০ ডলার ছাড়িয়েছে।

বাণিজ্যিক রুটের সংকটের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ইরান সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর অবরোধের ফলে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়েও জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়ায় সৌদি আরবের প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিকল্প হিসেবে সুয়েজ খাল ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও বড় আকারের তেলবাহী জাহাজ সেখানে চলতে পারে না, যার ফলে দীর্ঘ ভ্রমণের কারণে সময় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে ইরানের নতুন টোল আরোপের পরিকল্পনায়। প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য ১ থেকে ২ ডলার টোল আরোপের এই পরিকল্পনা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে জানিয়েছে লয়েডস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন। ফলে জাহাজগুলো বীমা বাতিল হওয়ার ঝুঁকি কিংবা ইরানের হামলার হুমকির মুখে পড়েছে।

সংকট শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার শোধনাগার এবং কৃষ্ণ সাগরের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। রাশিয়া ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করায় এবং কৃষ্ণ সাগরের পাইপলাইনে বিঘ্ন ঘটায় বৈশ্বিক বাজার থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সংকটের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো বৈশ্বিক মজুত কমে যাওয়া। গত পাঁচ মাসে বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ১৩০ কোটি ব্যারেল কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলভাণ্ডার ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে এবং বাণিজ্যিক মজুতও পরিচালনাগত সীমার কাছাকাছি। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে চীনকে বড় পরিসরে তেল আমদানি বাড়াতে হবে, যা বাজারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। গোল্ডম্যান স্যাকসের ড্যান স্ট্রুইভেনের মতে, পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে অক্টোবরের মধ্যে তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়াতে পারে, আর পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হলে ১৫০ ডলার অতিক্রমের সম্ভাবনা রয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

গৌরীপুরে শতবর্ষী আর কে স্কুল ভবন রক্ষায় মতবিনিময় সভা

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত: জ্বালানি বাজারে বড় ঝড়ের পূর্বাভাস

প্রকাশিত হয়েছে: ১২:৩১:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় বৈশ্বিক তেলের বাজার বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বা এটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এর আগে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার সময় বিশ্ববাজার বিভিন্ন বিকল্প সরবরাহপথ ব্যবহার করে ধাক্কা সামাল দিতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে ভোক্তাদের ওপর মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপ তুলনামূলক সীমিত ছিল। তখন তেলের দাম বাড়লেও তা ২০২২ সালের ১২৮ ডলার কিংবা ২০০৮ সালের রেকর্ড ১৪৬ ডলারের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে বর্তমান পরিস্থিতি অনেক বেশি বিপজ্জনক এবং সেই বিকল্প ব্যবস্থাগুলোও এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে।

আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বৈশ্বিক কৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফট বলেন, সংঘাত এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এতদিন বাজারে যে ধারণা ছিল যে যেকোনো সংকটেরই বিকল্প পথ খুঁজে পাওয়া যায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ধারণা বদলে যেতে পারে। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম মে মাসের পর প্রথমবারের মতো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করেছে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার এবং ডিজেলের দাম ৫ দশমিক ২০ ডলার ছাড়িয়েছে।

বাণিজ্যিক রুটের সংকটের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ইরান সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর অবরোধের ফলে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়েও জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়ায় সৌদি আরবের প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিকল্প হিসেবে সুয়েজ খাল ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও বড় আকারের তেলবাহী জাহাজ সেখানে চলতে পারে না, যার ফলে দীর্ঘ ভ্রমণের কারণে সময় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে ইরানের নতুন টোল আরোপের পরিকল্পনায়। প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য ১ থেকে ২ ডলার টোল আরোপের এই পরিকল্পনা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে জানিয়েছে লয়েডস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন। ফলে জাহাজগুলো বীমা বাতিল হওয়ার ঝুঁকি কিংবা ইরানের হামলার হুমকির মুখে পড়েছে।

সংকট শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার শোধনাগার এবং কৃষ্ণ সাগরের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। রাশিয়া ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করায় এবং কৃষ্ণ সাগরের পাইপলাইনে বিঘ্ন ঘটায় বৈশ্বিক বাজার থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সংকটের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো বৈশ্বিক মজুত কমে যাওয়া। গত পাঁচ মাসে বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ১৩০ কোটি ব্যারেল কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলভাণ্ডার ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে এবং বাণিজ্যিক মজুতও পরিচালনাগত সীমার কাছাকাছি। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে চীনকে বড় পরিসরে তেল আমদানি বাড়াতে হবে, যা বাজারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। গোল্ডম্যান স্যাকসের ড্যান স্ট্রুইভেনের মতে, পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে অক্টোবরের মধ্যে তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়াতে পারে, আর পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হলে ১৫০ ডলার অতিক্রমের সম্ভাবনা রয়েছে।