লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১২:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণে বাংলাদেশের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কৌশল

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে পশ্চিম ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এই পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সৌদি আরবের আর্থিক সক্ষমতা, তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প এবং পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতার সমন্বয়ে তৈরি কৌশলগত সমীকরণটি ভারতের নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছে। বঙ্গোপসাগরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আন্তর্জাতিক শক্তির যেকোনো নতুন সমীকরণের প্রভাব এখানে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

এই পরিবর্তনের মুখে বাংলাদেশ কোনো দর্শকের ভূমিকায় থাকতে পারে না। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এখনই একটি সুস্পষ্ট ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কৌশল গ্রহণের সময় এসেছে। এই রাষ্ট্রনীতির মূল মানদণ্ড হবে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ। বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে না পড়ে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে স্বাধীন কৌশলগত অবস্থান অক্ষুণ্ণ রাখাই হবে এর লক্ষ্য।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বঙ্গোপসাগর আজ যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন ও জাপানের মতো শক্তির আগ্রহের কেন্দ্রে। এই প্রতিযোগিতাকে ভয়ের কারণ হিসেবে না দেখে বরং অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপান্তর করা প্রয়োজন। লজিস্টিকস, সমুদ্র অর্থনীতি ও আঞ্চলিক সংযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি নিরপেক্ষ বাণিজ্যিক ও যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন বা তুরস্ক ও চীনের মতো দেশ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের আত্মরক্ষামূলক অধিকার। তবে এই পদক্ষেপগুলো যেন কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য—এই বার্তাটি কূটনৈতিকভাবে পরিষ্কার রাখা জরুরি। এটি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং আঞ্চলিক জোটের রাজনীতিতে অযথা জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে।

একই সঙ্গে পূর্ব সীমান্তে মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা ও রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কৌশলের আওতায় সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়ানো প্রয়োজন। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসীদের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বজায় রাখতে সম্পর্ককে অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা বিচক্ষণতার পরিচয় হবে।

ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা আসবে দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে। তাই মানুষের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি নির্ভরতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়ক ডিজিটাল কর্মশক্তি গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আজকের বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে কোনো পক্ষ বেছে না নিয়ে নিজের পথ নিজেই নির্ধারণ করা বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিচক্ষণ কূটনীতি, শক্তিশালী সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও আত্মনির্ভর অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে, যে রাষ্ট্র কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, আবার কারও ওপর নির্ভরশীলও নয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

তীব্র গরমে রেকর্ড লোডশেডিং, বিদ্যুৎহীন জেলা-উপজেলায় চরম ভোগান্তি

ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণে বাংলাদেশের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কৌশল

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:৫৭:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে পশ্চিম ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এই পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সৌদি আরবের আর্থিক সক্ষমতা, তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প এবং পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতার সমন্বয়ে তৈরি কৌশলগত সমীকরণটি ভারতের নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছে। বঙ্গোপসাগরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আন্তর্জাতিক শক্তির যেকোনো নতুন সমীকরণের প্রভাব এখানে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

এই পরিবর্তনের মুখে বাংলাদেশ কোনো দর্শকের ভূমিকায় থাকতে পারে না। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এখনই একটি সুস্পষ্ট ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কৌশল গ্রহণের সময় এসেছে। এই রাষ্ট্রনীতির মূল মানদণ্ড হবে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ। বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে না পড়ে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে স্বাধীন কৌশলগত অবস্থান অক্ষুণ্ণ রাখাই হবে এর লক্ষ্য।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বঙ্গোপসাগর আজ যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন ও জাপানের মতো শক্তির আগ্রহের কেন্দ্রে। এই প্রতিযোগিতাকে ভয়ের কারণ হিসেবে না দেখে বরং অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপান্তর করা প্রয়োজন। লজিস্টিকস, সমুদ্র অর্থনীতি ও আঞ্চলিক সংযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি নিরপেক্ষ বাণিজ্যিক ও যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন বা তুরস্ক ও চীনের মতো দেশ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের আত্মরক্ষামূলক অধিকার। তবে এই পদক্ষেপগুলো যেন কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য—এই বার্তাটি কূটনৈতিকভাবে পরিষ্কার রাখা জরুরি। এটি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং আঞ্চলিক জোটের রাজনীতিতে অযথা জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে।

একই সঙ্গে পূর্ব সীমান্তে মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা ও রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কৌশলের আওতায় সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়ানো প্রয়োজন। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসীদের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বজায় রাখতে সম্পর্ককে অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা বিচক্ষণতার পরিচয় হবে।

ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা আসবে দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে। তাই মানুষের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি নির্ভরতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়ক ডিজিটাল কর্মশক্তি গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আজকের বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে কোনো পক্ষ বেছে না নিয়ে নিজের পথ নিজেই নির্ধারণ করা বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিচক্ষণ কূটনীতি, শক্তিশালী সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও আত্মনির্ভর অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে, যে রাষ্ট্র কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, আবার কারও ওপর নির্ভরশীলও নয়।