লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৪:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্যবসায় হারামের মিশ্রণ: অবৈধ উপার্জনের ভয়াবহ পরিণতি ও ইসলাম

মহান আল্লাহ মানবজাতির জন্য যখন কোনো কিছু হালাল করেছেন, তখন তা ব্যাপকার্থে ব্যবহার করেছেন। আর যখন কোনো কিছু হারাম করেছেন, তখন তা নির্দিষ্ট করে নাম ধরে হারাম করেছেন। আল্লাহতায়ালা সুদ হারাম করেছেন এবং এর বিকল্প হিসেবে ব্যবসাকে হালাল করেছেন। আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা হারাম করার ক্ষমতা কারও নেই, আবার যা হারাম করেছেন তা হালাল করারও সাধ্য কারও নেই। মানুষ ব্যবসা করতে গিয়ে যদি তাতে হারামের মিশ্রণ ঘটায়, তবে ব্যবসা হালাল হলেও তা হারামে রূপ নেয়। যারা এমনটি করে, তাদের জন্য আল্লাহ জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। সুরা বাকারার ২৭৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'যারা সুদ খায়, তারা তার ন্যায় (কবর থেকে) উঠবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়। এটা এ জন্য যে, তারা বলে, ব্যবসা সুদের মতো। অথচ আল্লাহ ব্যবসা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। অতএব, যার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ আসার পর সে বিরত হলো, যা গত হয়েছে তা তার জন্য ইচ্ছাধীন। আর তার ব্যাপারটি আল্লাহর ওপর ন্যাস্ত। আর যারা ফিরে গেল, তারা আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে।'

বর্তমান ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ভেজাল মেশানো, প্রতারণা ও মিথ্যা শপথের ব্যবহার ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। ব্যবসায়ীরা সারাদিন অর্থের তাগিদে পরিশ্রম করেন, কিন্তু সেই পরিশ্রমের টাকা যদি হারাম উপায়ে অর্জিত হয়, তবে তা কোনো হালাল কাজের পরিচয় বহন করে না। পরকালে যখন উপস্থিত হবেন, তখন দেখবেন সব উপার্জনই ছিল হারাম। পরিশ্রমের কষ্টিপাথরে গড়া সেই উপার্জন আমলনামায় সওয়াবের পরিবর্তে হারাম লেখা থাকবে, যা অত্যন্ত বিষাদময় হবে। নবীজি (সা.) বলেন, 'এমন এক যুগ আসবে, যখন মানুষ পরোয়া করবে না যে, সে কোথা হতে সম্পদ উপার্জন করল, হালাল হতে না হারাম হতে।' (বোখারি : ২০৫৯)।

অসৎ ব্যবসায়ীদের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো ওজনে কম দেওয়া। সুরা মুতাফফিফিনের ১-৩ আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'মন্দ পরিণাম তাদের, যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পুরো মাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাদের জন্য মাপে অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।' এটি চরম প্রতারণা ও অন্যের হক নষ্ট করা। একটি চালের দানা পরিমাণ কম দিলেও তা যতক্ষণ না পরিশোধ করা হয় বা ক্রেতা ক্ষমা করেন, ততক্ষণ তা ব্যবসায়ীর ওপর হক হিসেবে থেকে যাবে। কেয়ামতের দিন পণ্যের অস্তিত্ব থাকবে না, তাই এই হক আমলের বিনিময়ে পরিশোধ করতে হবে। আল্লাহ সুরা নিসায় (২৯) ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেতে নিষেধ করেছেন এবং সুরা নাহলে (৯০) ন্যায়পন্থা ও অনুগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন।

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো জুলুম করা। কোনো পণ্য ১০০ টাকায় কিনে বহুগুণ দাম বাড়িয়ে বিক্রি করা ক্রেতার ওপর বড় জুলুম। আল্লাহ বলেন, 'জালেমরা কখনও সফলকাম হয় না।' (সুরা আনআম : ৫৭)। তিনি আরও বলেন, 'অচিরেই জালেমরা জানতে পারবে, তাদের প্রত্যাবর্তনস্থল কোথায় হবে।' (সুরা শুআরা : ২২৭)। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, 'হে আমার বান্দারা! আমি আমার জন্য জুলুম হারাম করেছি। আর জুলুম তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও হারাম করেছি। অতএব, তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম করো না।' (মুসলিম : ৬৭৩৭)।

তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হলো পণ্যের ত্রুটি গোপন করা। বিশেষ করে ১০টি ভালো পণ্যের মধ্যে ১-২টি ত্রুটিযুক্ত পণ্য মিশিয়ে বিক্রি করা জঘন্য প্রতারণা। নবীজি (সা.) বলেন, 'যে ব্যক্তি পণ্যের ত্রুটি বর্ণনা না করে (বরং গোপন করে) বিক্রয় করে, সে সর্বদা আল্লাহর গজবের মধ্যে থাকে। ফেরেশতারা সব সময় তাকে অভিশাপ করতে থাকে।' (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৪৭)। এছাড়া ক্রয়-বিক্রয়ে সত্য বললে বরকত হয়, কিন্তু মিথ্যা বললে বরকত মুছে যায়। (বোখারি : ২০৭৯)।

চতুর্থ বৈশিষ্ট্য হলো মিথ্যা শপথ গ্রহণ। বাংলাদেশে রমজান ও ঈদের সময় কাপড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। তারা মিথ্যা কসম খেয়ে বলে যে, এটি কেনা দরে দেওয়া হচ্ছে বা লোকসান হচ্ছে। মিথ্যা মানবতাবোধ লোপ করে ও নৈতিক চরিত্রের অবক্ষয় ঘটায়। নবীজি (সা.) বলেছেন, 'কেয়ামত দিবসে আল্লাহ তিন ব্যক্তির সঙ্গে কোনো ধরনের কথা বলবেন না, তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করবেন না, তাদের পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। তাদের একজন হলো, যে তার ব্যবসায়িক পণ্য মিথ্যা কসম খেয়ে বিক্রি করে।' (মুসলিম : ১০৬)।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাংবাদিক বাবলুর নিরাপত্তা ও বিচার দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবে মানববন্ধন

ব্যবসায় হারামের মিশ্রণ: অবৈধ উপার্জনের ভয়াবহ পরিণতি ও ইসলাম

প্রকাশিত হয়েছে: ০৯:৩০:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

মহান আল্লাহ মানবজাতির জন্য যখন কোনো কিছু হালাল করেছেন, তখন তা ব্যাপকার্থে ব্যবহার করেছেন। আর যখন কোনো কিছু হারাম করেছেন, তখন তা নির্দিষ্ট করে নাম ধরে হারাম করেছেন। আল্লাহতায়ালা সুদ হারাম করেছেন এবং এর বিকল্প হিসেবে ব্যবসাকে হালাল করেছেন। আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা হারাম করার ক্ষমতা কারও নেই, আবার যা হারাম করেছেন তা হালাল করারও সাধ্য কারও নেই। মানুষ ব্যবসা করতে গিয়ে যদি তাতে হারামের মিশ্রণ ঘটায়, তবে ব্যবসা হালাল হলেও তা হারামে রূপ নেয়। যারা এমনটি করে, তাদের জন্য আল্লাহ জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। সুরা বাকারার ২৭৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'যারা সুদ খায়, তারা তার ন্যায় (কবর থেকে) উঠবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়। এটা এ জন্য যে, তারা বলে, ব্যবসা সুদের মতো। অথচ আল্লাহ ব্যবসা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। অতএব, যার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ আসার পর সে বিরত হলো, যা গত হয়েছে তা তার জন্য ইচ্ছাধীন। আর তার ব্যাপারটি আল্লাহর ওপর ন্যাস্ত। আর যারা ফিরে গেল, তারা আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে।'

বর্তমান ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ভেজাল মেশানো, প্রতারণা ও মিথ্যা শপথের ব্যবহার ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। ব্যবসায়ীরা সারাদিন অর্থের তাগিদে পরিশ্রম করেন, কিন্তু সেই পরিশ্রমের টাকা যদি হারাম উপায়ে অর্জিত হয়, তবে তা কোনো হালাল কাজের পরিচয় বহন করে না। পরকালে যখন উপস্থিত হবেন, তখন দেখবেন সব উপার্জনই ছিল হারাম। পরিশ্রমের কষ্টিপাথরে গড়া সেই উপার্জন আমলনামায় সওয়াবের পরিবর্তে হারাম লেখা থাকবে, যা অত্যন্ত বিষাদময় হবে। নবীজি (সা.) বলেন, 'এমন এক যুগ আসবে, যখন মানুষ পরোয়া করবে না যে, সে কোথা হতে সম্পদ উপার্জন করল, হালাল হতে না হারাম হতে।' (বোখারি : ২০৫৯)।

অসৎ ব্যবসায়ীদের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো ওজনে কম দেওয়া। সুরা মুতাফফিফিনের ১-৩ আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'মন্দ পরিণাম তাদের, যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পুরো মাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাদের জন্য মাপে অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।' এটি চরম প্রতারণা ও অন্যের হক নষ্ট করা। একটি চালের দানা পরিমাণ কম দিলেও তা যতক্ষণ না পরিশোধ করা হয় বা ক্রেতা ক্ষমা করেন, ততক্ষণ তা ব্যবসায়ীর ওপর হক হিসেবে থেকে যাবে। কেয়ামতের দিন পণ্যের অস্তিত্ব থাকবে না, তাই এই হক আমলের বিনিময়ে পরিশোধ করতে হবে। আল্লাহ সুরা নিসায় (২৯) ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেতে নিষেধ করেছেন এবং সুরা নাহলে (৯০) ন্যায়পন্থা ও অনুগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন।

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো জুলুম করা। কোনো পণ্য ১০০ টাকায় কিনে বহুগুণ দাম বাড়িয়ে বিক্রি করা ক্রেতার ওপর বড় জুলুম। আল্লাহ বলেন, 'জালেমরা কখনও সফলকাম হয় না।' (সুরা আনআম : ৫৭)। তিনি আরও বলেন, 'অচিরেই জালেমরা জানতে পারবে, তাদের প্রত্যাবর্তনস্থল কোথায় হবে।' (সুরা শুআরা : ২২৭)। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, 'হে আমার বান্দারা! আমি আমার জন্য জুলুম হারাম করেছি। আর জুলুম তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও হারাম করেছি। অতএব, তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম করো না।' (মুসলিম : ৬৭৩৭)।

তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হলো পণ্যের ত্রুটি গোপন করা। বিশেষ করে ১০টি ভালো পণ্যের মধ্যে ১-২টি ত্রুটিযুক্ত পণ্য মিশিয়ে বিক্রি করা জঘন্য প্রতারণা। নবীজি (সা.) বলেন, 'যে ব্যক্তি পণ্যের ত্রুটি বর্ণনা না করে (বরং গোপন করে) বিক্রয় করে, সে সর্বদা আল্লাহর গজবের মধ্যে থাকে। ফেরেশতারা সব সময় তাকে অভিশাপ করতে থাকে।' (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৪৭)। এছাড়া ক্রয়-বিক্রয়ে সত্য বললে বরকত হয়, কিন্তু মিথ্যা বললে বরকত মুছে যায়। (বোখারি : ২০৭৯)।

চতুর্থ বৈশিষ্ট্য হলো মিথ্যা শপথ গ্রহণ। বাংলাদেশে রমজান ও ঈদের সময় কাপড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। তারা মিথ্যা কসম খেয়ে বলে যে, এটি কেনা দরে দেওয়া হচ্ছে বা লোকসান হচ্ছে। মিথ্যা মানবতাবোধ লোপ করে ও নৈতিক চরিত্রের অবক্ষয় ঘটায়। নবীজি (সা.) বলেছেন, 'কেয়ামত দিবসে আল্লাহ তিন ব্যক্তির সঙ্গে কোনো ধরনের কথা বলবেন না, তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করবেন না, তাদের পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। তাদের একজন হলো, যে তার ব্যবসায়িক পণ্য মিথ্যা কসম খেয়ে বিক্রি করে।' (মুসলিম : ১০৬)।