লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:৩১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় ইসলামের শাশ্বত নির্দেশনা

জীববৈচিত্র্য বলতে সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে বিভিন্ন প্রকার জীবের একত্র সমাবেশকে বোঝানো হয়। এটি কোনো অঞ্চলের নির্দিষ্ট প্রজাতির মধ্যে জীনগত, প্রজাতিগত ও বাস্তুতান্ত্রিক তারতম্য বা বিভিন্নতাকে নির্দেশ করে। জীববিজ্ঞানী ম্যাকেঞ্জি-এর মতে, বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন স্তরের জীবদের ক্ষেত্রে একই প্রজাতির জীবের জীনগত প্রকরণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রজাতির বৈচিত্র্যসমূহকে জীববৈচিত্র্য বলা হয়। এই বৈচিত্র্যময়তা আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত ও নির্ধারিত। পবিত্র কোরআনে সুরা শুরা-এর ২৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'তাঁর নিদর্শনাবলির একটি হলো, আসমান ও জমিন এবং এর মাঝে বিস্তৃত জীবজন্তুর সৃষ্টি। নিশ্চয়ই তিনি চাইলেই সবকিছু একত্রিত করতে সক্ষম।'

প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার্থে প্রাণিজ ও উদ্ভিদজাত সব উপাদানকে কোরআন ও সুন্নাহ নির্দেশিত পদ্ধতিতে ব্যবহার করা আবশ্যক। প্রকৃতি ও পরিবেশকে মানবসৃষ্ট কৃত্রিম নিয়মনীতি ও অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারলে জীববৈচিত্র্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। গ্রিনহাউস এফেক্ট বা পরিবেশ বিপর্যয়ের মতো ভয়াবহ সংকট থেকে বাঁচতে হলে প্রকৃতিকে তার নিজস্ব অবস্থায় অক্ষত রাখা জরুরি। মানুষ যদি আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতকে যথানির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ব্যবহার না করে, তবে পরিবেশ বিরূপ আচরণ করবে। সুরা রুম-এর ৪১ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, 'জলে-স্থলের সব বিপদ মানুষের হাতের কামাই। যাতে তারা তাদের কৃতকর্মের কুফল ভোগ করে এবং তা থেকে ফিরে আসে।'

প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গাছপালা, তরুলতা, জলবায়ু ও পশুপাখির যথাযথ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাসুল (সা.) বনাঞ্চল ও বৃক্ষভূমি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যাপক উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, 'যদি কারও হাতে রোপণ করার কোনো চারা থাকে, এমতাবস্থায় কেয়ামত এসেও যায় এবং রোপণ করার সময় পাওয়া যায়, তাহলে তা রোপণ করা ছাড়া সে যেন দাঁড়িয়ে না থাকে' (উমদাতুল কারি: ১২/১৫৪)। এছাড়া তিনি বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়া বা ধারাবাহিক পুণ্যের আমল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, 'যে ব্যক্তি অন্যায়-জুলুম না করে কিছু নির্মাণ করল অথবা কোনো চারা রোপণ করল, যতদিন পর্যন্ত আল্লাহর সৃষ্টি তা থেকে উপকৃত হবে, ততদিন রোপণকারী সওয়াব পেতে থাকবে' (উমদাতুল কারি: ১২/১৫৫)।

উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের মতে, প্রতিটি দেশে মোট ভূখণ্ডের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা জরুরি। রাসুল (সা.) বনভূমি বৃদ্ধির তাগিদ দেওয়ার পাশাপাশি গাছপালা কাটা ও বন উজাড় করার ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রেও খেজুরগাছ বা অন্যান্য উদ্ভিদ কাটতে নিষেধ করেছেন (এরশাদুল ফকিহ: ২/৩২০)।

জলবায়ু পরিবর্তন ও জলদূষণ দূরীকরণে পানির অপচয় রোধ ও পানিতে বর্জ্যত্যাগ পরিহার করা অত্যন্ত কার্যকর। রাসুল (সা.) পানির অপচয় রোধে অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। একবার হজরত সাদ (রা.) অজুতে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করলে রাসুল (সা.) তাকে সতর্ক করে বলেন, 'এমনকি তুমি যদি বহমান নদী বা সাগরে বসেও অজু করো, তাহলেও অতিরিক্ত পানি ব্যবহার অপচয় হিসেবে গণ্য হবে' (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১৯)।

যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ জলবায়ু দূষণের অন্যতম কারণ। তাই রাসুল (সা.) ছায়াদার গাছের নিচে, মানুষের চলাচলের রাস্তায় ও স্থির পানিতে মলমূত্র ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, 'তোমরা দুই অভিশপ্ত লোক থেকে বেঁচে থাকো—যে ব্যক্তি লোকদের হাঁটাচলার রাস্তায় মলমূত্র ত্যাগ করে এবং যে মানুষের ছায়া গ্রহণস্থলে পায়খানা-প্রস্রাব করে' (মুসলিম: ১/১৮৮)। এছাড়া স্থির পানিতে প্রস্রাব করতেও তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন (মুসলিম: ১/৭৩)।

পরিবেশ বিপর্যয়মুক্ত রাখতে ঘরবাড়ি, আঙিনা ও রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরি। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'তোমরা তোমাদের আঙিনা পরিষ্কার রাখো' (তাবারানি: ২/১১)। এছাড়া পশুপাখি ও জীবজন্তু পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অহেতুক প্রাণীহত্যার সংস্কৃতি পরিবেশ বিপর্যয়ের বড় কারণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'কেউ যদি চড়ুই পাখি বা তার চেয়ে ছোট কোনো প্রাণীকেও অকারণে হত্যা করে, কেয়ামতের দিন তাকে জবাবদিহিতা করতে হবে' (মিরকাত: ২৬৫৮)।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইউরোপের স্বপ্ন দেখিয়ে দালালের ফাঁদ, নিঃস্ব হচ্ছেন বহু বাংলাদেশি

জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় ইসলামের শাশ্বত নির্দেশনা

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:০৯:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

জীববৈচিত্র্য বলতে সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে বিভিন্ন প্রকার জীবের একত্র সমাবেশকে বোঝানো হয়। এটি কোনো অঞ্চলের নির্দিষ্ট প্রজাতির মধ্যে জীনগত, প্রজাতিগত ও বাস্তুতান্ত্রিক তারতম্য বা বিভিন্নতাকে নির্দেশ করে। জীববিজ্ঞানী ম্যাকেঞ্জি-এর মতে, বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন স্তরের জীবদের ক্ষেত্রে একই প্রজাতির জীবের জীনগত প্রকরণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রজাতির বৈচিত্র্যসমূহকে জীববৈচিত্র্য বলা হয়। এই বৈচিত্র্যময়তা আল্লাহতায়ালা প্রদত্ত ও নির্ধারিত। পবিত্র কোরআনে সুরা শুরা-এর ২৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'তাঁর নিদর্শনাবলির একটি হলো, আসমান ও জমিন এবং এর মাঝে বিস্তৃত জীবজন্তুর সৃষ্টি। নিশ্চয়ই তিনি চাইলেই সবকিছু একত্রিত করতে সক্ষম।'

প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার্থে প্রাণিজ ও উদ্ভিদজাত সব উপাদানকে কোরআন ও সুন্নাহ নির্দেশিত পদ্ধতিতে ব্যবহার করা আবশ্যক। প্রকৃতি ও পরিবেশকে মানবসৃষ্ট কৃত্রিম নিয়মনীতি ও অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারলে জীববৈচিত্র্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। গ্রিনহাউস এফেক্ট বা পরিবেশ বিপর্যয়ের মতো ভয়াবহ সংকট থেকে বাঁচতে হলে প্রকৃতিকে তার নিজস্ব অবস্থায় অক্ষত রাখা জরুরি। মানুষ যদি আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতকে যথানির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ব্যবহার না করে, তবে পরিবেশ বিরূপ আচরণ করবে। সুরা রুম-এর ৪১ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, 'জলে-স্থলের সব বিপদ মানুষের হাতের কামাই। যাতে তারা তাদের কৃতকর্মের কুফল ভোগ করে এবং তা থেকে ফিরে আসে।'

প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গাছপালা, তরুলতা, জলবায়ু ও পশুপাখির যথাযথ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাসুল (সা.) বনাঞ্চল ও বৃক্ষভূমি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যাপক উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, 'যদি কারও হাতে রোপণ করার কোনো চারা থাকে, এমতাবস্থায় কেয়ামত এসেও যায় এবং রোপণ করার সময় পাওয়া যায়, তাহলে তা রোপণ করা ছাড়া সে যেন দাঁড়িয়ে না থাকে' (উমদাতুল কারি: ১২/১৫৪)। এছাড়া তিনি বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়া বা ধারাবাহিক পুণ্যের আমল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, 'যে ব্যক্তি অন্যায়-জুলুম না করে কিছু নির্মাণ করল অথবা কোনো চারা রোপণ করল, যতদিন পর্যন্ত আল্লাহর সৃষ্টি তা থেকে উপকৃত হবে, ততদিন রোপণকারী সওয়াব পেতে থাকবে' (উমদাতুল কারি: ১২/১৫৫)।

উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের মতে, প্রতিটি দেশে মোট ভূখণ্ডের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা জরুরি। রাসুল (সা.) বনভূমি বৃদ্ধির তাগিদ দেওয়ার পাশাপাশি গাছপালা কাটা ও বন উজাড় করার ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রেও খেজুরগাছ বা অন্যান্য উদ্ভিদ কাটতে নিষেধ করেছেন (এরশাদুল ফকিহ: ২/৩২০)।

জলবায়ু পরিবর্তন ও জলদূষণ দূরীকরণে পানির অপচয় রোধ ও পানিতে বর্জ্যত্যাগ পরিহার করা অত্যন্ত কার্যকর। রাসুল (সা.) পানির অপচয় রোধে অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। একবার হজরত সাদ (রা.) অজুতে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করলে রাসুল (সা.) তাকে সতর্ক করে বলেন, 'এমনকি তুমি যদি বহমান নদী বা সাগরে বসেও অজু করো, তাহলেও অতিরিক্ত পানি ব্যবহার অপচয় হিসেবে গণ্য হবে' (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১৯)।

যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ জলবায়ু দূষণের অন্যতম কারণ। তাই রাসুল (সা.) ছায়াদার গাছের নিচে, মানুষের চলাচলের রাস্তায় ও স্থির পানিতে মলমূত্র ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, 'তোমরা দুই অভিশপ্ত লোক থেকে বেঁচে থাকো—যে ব্যক্তি লোকদের হাঁটাচলার রাস্তায় মলমূত্র ত্যাগ করে এবং যে মানুষের ছায়া গ্রহণস্থলে পায়খানা-প্রস্রাব করে' (মুসলিম: ১/১৮৮)। এছাড়া স্থির পানিতে প্রস্রাব করতেও তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন (মুসলিম: ১/৭৩)।

পরিবেশ বিপর্যয়মুক্ত রাখতে ঘরবাড়ি, আঙিনা ও রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরি। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'তোমরা তোমাদের আঙিনা পরিষ্কার রাখো' (তাবারানি: ২/১১)। এছাড়া পশুপাখি ও জীবজন্তু পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অহেতুক প্রাণীহত্যার সংস্কৃতি পরিবেশ বিপর্যয়ের বড় কারণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'কেউ যদি চড়ুই পাখি বা তার চেয়ে ছোট কোনো প্রাণীকেও অকারণে হত্যা করে, কেয়ামতের দিন তাকে জবাবদিহিতা করতে হবে' (মিরকাত: ২৬৫৮)।