লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১০:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চীনের নেতৃত্বে ২৯ দেশের এআই জোট, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ

চীনের সাংহাইতে গত শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী ‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলন’ (ডব্লিউএআইসি)। এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রযুক্তি ও ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে বেইজিং একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো একক দেশের হাতে এই প্রযুক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য থাকা উচিত নয়। বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর এই মন্তব্য মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিতপূর্ণ। বর্তমানে এআই খাতে দুই দেশের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে এবং একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

সম্মেলনের ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থা’ (ডব্লিউএআইসিও) গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় চীন। এই আন্তঃসরকারি সংস্থাটি ২০২৫ সালের মধ্যে এআই-সংক্রান্ত বৈশ্বিক নীতিমালা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২৯টি প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদেশের প্রতিনিধিরা সাংহাইতে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই সম্মেলনের এবারের নবম আসরের প্রতিপাদ্য ছিল ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে এআই অংশীদারত্ব’।

উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বলেন, এআই প্রযুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশের একক প্রদর্শনী হতে পারে না, বরং এটি হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি সিম্ফনি। তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর এআই সক্ষমতা তৈরিতে চীনের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলেন, নতুন কোনো ‘ঐতিহাসিক বৈষম্য’ যাতে তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতে বেইজিং বদ্ধপরিকর। এছাড়া আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন তিনি। সি চিন পিং জাতীয় নিরাপত্তার ধারণা অতিরঞ্জিত করার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে এআই নিয়ন্ত্রণে ‘মানুষকেন্দ্রিক’ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, উপযুক্ত বিধিবিধান, প্রযুক্তিগত নজরদারি, আগাম সতর্কতা ও জরুরি পদক্ষেপের মতো সুরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে, ‘এআই সব সময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।’

ডব্লিউএআইসিওর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সেনেগাল, রাশিয়া ও পাকিস্তানের মতো ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো রয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, জাতিসংঘে এআই-সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের জন্য বেইজিং এই জোটকে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।

চীনের শিল্পনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চিপ উৎপাদন থেকে শুরু করে ডেটা সেন্টার পরিচালনা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশটি বিপুল বিনিয়োগ করেছে। যদিও আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে পিছিয়ে, তবে বিশাল ডেটা সেন্টার পরিচালনা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে তাদের আধিপত্য রয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যাপক সম্প্রসারণ চীনকে এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে চীনের ওপর বিভিন্ন প্রযুক্তি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। জবাবে বেইজিংও আমেরিকান কোম্পানিগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ডব্লিউএআইসিও জোট গঠন করে চীন বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি পরিচালনায় রাষ্ট্রকেন্দ্রিক যে দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে, তাকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চাইছে বলে মনে করছেন সুশাসন বিশেষজ্ঞ অরিন্দ্রজিৎ বসু। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন যখন বৈশ্বিক সাইবার ও এআই নীতিনির্ধারণ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে, তখন বেইজিং সেই শূন্যস্থান পূরণের মাধ্যমে বৈশ্বিক নেতৃত্ব দিতে তৎপর।

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাইয়ের ২৭ দিনে আড়াই বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাসী আয়

চীনের নেতৃত্বে ২৯ দেশের এআই জোট, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:১৫:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

চীনের সাংহাইতে গত শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী ‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলন’ (ডব্লিউএআইসি)। এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রযুক্তি ও ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে বেইজিং একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো একক দেশের হাতে এই প্রযুক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য থাকা উচিত নয়। বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর এই মন্তব্য মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিতপূর্ণ। বর্তমানে এআই খাতে দুই দেশের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে এবং একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

সম্মেলনের ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থা’ (ডব্লিউএআইসিও) গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় চীন। এই আন্তঃসরকারি সংস্থাটি ২০২৫ সালের মধ্যে এআই-সংক্রান্ত বৈশ্বিক নীতিমালা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২৯টি প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদেশের প্রতিনিধিরা সাংহাইতে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই সম্মেলনের এবারের নবম আসরের প্রতিপাদ্য ছিল ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে এআই অংশীদারত্ব’।

উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বলেন, এআই প্রযুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশের একক প্রদর্শনী হতে পারে না, বরং এটি হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি সিম্ফনি। তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর এআই সক্ষমতা তৈরিতে চীনের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলেন, নতুন কোনো ‘ঐতিহাসিক বৈষম্য’ যাতে তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতে বেইজিং বদ্ধপরিকর। এছাড়া আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন তিনি। সি চিন পিং জাতীয় নিরাপত্তার ধারণা অতিরঞ্জিত করার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে এআই নিয়ন্ত্রণে ‘মানুষকেন্দ্রিক’ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, উপযুক্ত বিধিবিধান, প্রযুক্তিগত নজরদারি, আগাম সতর্কতা ও জরুরি পদক্ষেপের মতো সুরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে, ‘এআই সব সময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।’

ডব্লিউএআইসিওর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সেনেগাল, রাশিয়া ও পাকিস্তানের মতো ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো রয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, জাতিসংঘে এআই-সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের জন্য বেইজিং এই জোটকে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।

চীনের শিল্পনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চিপ উৎপাদন থেকে শুরু করে ডেটা সেন্টার পরিচালনা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশটি বিপুল বিনিয়োগ করেছে। যদিও আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে পিছিয়ে, তবে বিশাল ডেটা সেন্টার পরিচালনা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে তাদের আধিপত্য রয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যাপক সম্প্রসারণ চীনকে এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে চীনের ওপর বিভিন্ন প্রযুক্তি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। জবাবে বেইজিংও আমেরিকান কোম্পানিগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ডব্লিউএআইসিও জোট গঠন করে চীন বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি পরিচালনায় রাষ্ট্রকেন্দ্রিক যে দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে, তাকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চাইছে বলে মনে করছেন সুশাসন বিশেষজ্ঞ অরিন্দ্রজিৎ বসু। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন যখন বৈশ্বিক সাইবার ও এআই নীতিনির্ধারণ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে, তখন বেইজিং সেই শূন্যস্থান পূরণের মাধ্যমে বৈশ্বিক নেতৃত্ব দিতে তৎপর।