লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:৫৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাস্তা বাড়ালেই কি যানজট কমে? জেনে নিন গণিতের ব্যাখ্যা

ব্যস্ত শহরের যানজটে আটকে থেকে অনেকেই হয়তো ভাবেন, ফ্লাইওভার বা রাস্তা বাড়ালেই বুঝি এই ভোগান্তি কাটবে। কিন্তু গণিত বলছে ভিন্ন কথা। গণিতবিদ ও ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারদের মতে, রাস্তা বাড়ানো অনেক সময় যানজট কমানোর বদলে তা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। গুগল ম্যাপের পথ নির্দেশনা থেকে শুরু করে ট্রাফিকের গতিপ্রকৃতি—সবকিছুই আসলে নিয়ন্ত্রিত হয় জটিল গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমে।

শহরকে গণিতবিদেরা একটি বিশাল গ্রাফ বা বিন্দুর নেটওয়ার্ক হিসেবে বিবেচনা করেন। এই গ্রাফ থিওরি অনুযায়ী, শহরের বিভিন্ন স্থান হলো এক একটি বিন্দু এবং সংযোগকারী রাস্তাগুলো হলো রেখা। গুগল ম্যাপের মতো আধুনিক অ্যাপগুলো এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই আমাদের পথ দেখায়। বিশেষ করে 'ডাইকস্ট্রার অ্যালগরিদম' ব্যবহার করে কোনো গন্তব্যে পৌঁছানোর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও সর্বোত্তম পথটি খুঁজে বের করা হয়। এই অ্যালগরিদমটি ট্রাফিক ঘনত্ব, রাস্তার দূরত্ব, ভ্রমণের সময়কাল এবং রাস্তার অবস্থা—এই ৪টি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ৪টি রাস্তার ‘Path Weight’ বা পথের গুরুত্ব নির্ধারণ করে। যে রাস্তার পাথ ওয়েট সবচেয়ে কম, গুগল ম্যাপ চালকদের সেই পথটিই ব্যবহারের পরামর্শ দেয়।

ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে একটি অদ্ভুত অথচ বাস্তব ধারণা হলো 'ব্রায়াসের প্যারাডক্স'। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যানজটপূর্ণ এলাকায় নতুন রাস্তা তৈরি করলে জ্যাম না কমে উল্টো বাড়তে পারে। একইভাবে, কোনো একটি রাস্তা বন্ধ করে দিলে সামগ্রিক যানজট কমে যেতে পারে। ধরা যাক, এই ক্ষেত্রে আমাদের কাছে ৩টি রাস্তা আছে। এখন এই অবস্থানে যেতে গেলে সবচেয়ে কম দূরত্বের রাস্তা হয় ১ম রাস্তাটি, ফলে সব থেকে বেশি মানুষ এই রাস্তা দিয়ে যায় এবং সেখানে জ্যাম তৈরি হয়। এ কারণে অনেকেই আবার ২য় এবং ৩য় রাস্তাটি সুষমভাবে বেছে নেয়। এই অবস্থায় যদি একটি ফ্লাইওভার তৈরি করা হয়, তবে অবশ্যই চিন্তা করা হবে যেন ওই ফ্লাইওভার দিয়ে ওইখানে তাড়াতাড়ি যাওয়া যায়। কিন্তু যেহেতু নতুন রাস্তা নিয়ে কারোর কোনো অভিজ্ঞতা নেই, সবাই ঐ নতুন রাস্তা দিয়ে যেতে চাইবে, যার ফলে ওই রাস্তায় বিশাল ট্রাফিক জ্যাম দেখা দেবে। আচ্ছা, এবার সরকার যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন ফ্লাইওভার না করে ১ম রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয়, তবে চালকদের সামনে সুনির্দিষ্ট কিছু বিকল্প পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এটি ট্রাফিকের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং জ্যাম কমিয়ে দেয়।

এই প্যারাডক্সের বাস্তব প্রমাণও রয়েছে বিশ্বে। ১৯৯০ সালে ধরিত্রী দিবস (Earth Day) উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের অত্যন্ত ব্যস্ত ৪২তম সড়কটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে পুরো শহরে হয়তো স্থবিরতা নেমে আসবে, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল যানজট আগের চেয়ে কমে গেছে। একইভাবে, ২০০৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে শহরের কেন্দ্রস্থলের একটি ব্যস্ত ছয় লেনের হাইওয়ে ভেঙে সেখানে পার্ক ও নদী তৈরি করা হয়। এর ফলে আশপাশের ট্রাফিক ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক বেশি গতিশীল হয়ে উঠেছিল।

এছাড়া সিগন্যালে গাড়ির দীর্ঘ লাইন কেন তৈরি হয় এবং জ্যাম কেন পেছনের দিকে ছড়াতে থাকে, তার ব্যাখ্যা দেয় 'কিউয়িং থিওরি'। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, একটি রাস্তায় প্রতি মিনিটে প্রবেশ করা গাড়ির সংখ্যা (X) যদি বের হওয়া গাড়ির সংখ্যার (Y) চেয়ে বেশি হয়, তবে জ্যাম পেছনের দিকে বাড়তে থাকে। যেমন, একটি রাস্তায় প্রতি মিনিটে ৫০টি গাড়ি ঢুকছে, কিন্তু সিগন্যাল বা সরু পথের কারণে বের হতে পারছে মাত্র ৪০টি। এমন পরিস্থিতিতে কোনো মোড়ে যদি একটি গাড়ি হঠাৎ লেন পরিবর্তন করে মাত্র ২ সেকেন্ডের জন্য ব্রেক চাপে, তবে তার পেছনে থাকা অন্তত ১০০টি গাড়িকে ব্রেক চাপতে হয়। এভাবেই ছোট একটি ঘটনা বিশাল যানজটের রূপ নেয়। এই সমস্যা এড়াতে চালকদের হুট করে ব্রেক না চেপে একটু ফাঁকা জায়গায় গিয়ে গতি কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। এই কারণেই আজকাল রাস্তার মাঝখানে যত্রতত্র পারাপার বন্ধ করে নির্দিষ্ট কিছু স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত জ্যাম এড়ানো যায়।

ঠিক এই গ্রাফ থিওরির ওপর নির্ভর করে গুগল ম্যাপে (Google Map) এর মতো অ্যাপগুলো আমাদের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়ার রাস্তা দেখিয়ে থাকে।

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় দেশ গড়ার আহ্বান মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রীর

রাস্তা বাড়ালেই কি যানজট কমে? জেনে নিন গণিতের ব্যাখ্যা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:৩৯:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

ব্যস্ত শহরের যানজটে আটকে থেকে অনেকেই হয়তো ভাবেন, ফ্লাইওভার বা রাস্তা বাড়ালেই বুঝি এই ভোগান্তি কাটবে। কিন্তু গণিত বলছে ভিন্ন কথা। গণিতবিদ ও ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারদের মতে, রাস্তা বাড়ানো অনেক সময় যানজট কমানোর বদলে তা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। গুগল ম্যাপের পথ নির্দেশনা থেকে শুরু করে ট্রাফিকের গতিপ্রকৃতি—সবকিছুই আসলে নিয়ন্ত্রিত হয় জটিল গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমে।

শহরকে গণিতবিদেরা একটি বিশাল গ্রাফ বা বিন্দুর নেটওয়ার্ক হিসেবে বিবেচনা করেন। এই গ্রাফ থিওরি অনুযায়ী, শহরের বিভিন্ন স্থান হলো এক একটি বিন্দু এবং সংযোগকারী রাস্তাগুলো হলো রেখা। গুগল ম্যাপের মতো আধুনিক অ্যাপগুলো এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই আমাদের পথ দেখায়। বিশেষ করে 'ডাইকস্ট্রার অ্যালগরিদম' ব্যবহার করে কোনো গন্তব্যে পৌঁছানোর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও সর্বোত্তম পথটি খুঁজে বের করা হয়। এই অ্যালগরিদমটি ট্রাফিক ঘনত্ব, রাস্তার দূরত্ব, ভ্রমণের সময়কাল এবং রাস্তার অবস্থা—এই ৪টি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ৪টি রাস্তার ‘Path Weight’ বা পথের গুরুত্ব নির্ধারণ করে। যে রাস্তার পাথ ওয়েট সবচেয়ে কম, গুগল ম্যাপ চালকদের সেই পথটিই ব্যবহারের পরামর্শ দেয়।

ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে একটি অদ্ভুত অথচ বাস্তব ধারণা হলো 'ব্রায়াসের প্যারাডক্স'। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যানজটপূর্ণ এলাকায় নতুন রাস্তা তৈরি করলে জ্যাম না কমে উল্টো বাড়তে পারে। একইভাবে, কোনো একটি রাস্তা বন্ধ করে দিলে সামগ্রিক যানজট কমে যেতে পারে। ধরা যাক, এই ক্ষেত্রে আমাদের কাছে ৩টি রাস্তা আছে। এখন এই অবস্থানে যেতে গেলে সবচেয়ে কম দূরত্বের রাস্তা হয় ১ম রাস্তাটি, ফলে সব থেকে বেশি মানুষ এই রাস্তা দিয়ে যায় এবং সেখানে জ্যাম তৈরি হয়। এ কারণে অনেকেই আবার ২য় এবং ৩য় রাস্তাটি সুষমভাবে বেছে নেয়। এই অবস্থায় যদি একটি ফ্লাইওভার তৈরি করা হয়, তবে অবশ্যই চিন্তা করা হবে যেন ওই ফ্লাইওভার দিয়ে ওইখানে তাড়াতাড়ি যাওয়া যায়। কিন্তু যেহেতু নতুন রাস্তা নিয়ে কারোর কোনো অভিজ্ঞতা নেই, সবাই ঐ নতুন রাস্তা দিয়ে যেতে চাইবে, যার ফলে ওই রাস্তায় বিশাল ট্রাফিক জ্যাম দেখা দেবে। আচ্ছা, এবার সরকার যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন ফ্লাইওভার না করে ১ম রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয়, তবে চালকদের সামনে সুনির্দিষ্ট কিছু বিকল্প পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এটি ট্রাফিকের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং জ্যাম কমিয়ে দেয়।

এই প্যারাডক্সের বাস্তব প্রমাণও রয়েছে বিশ্বে। ১৯৯০ সালে ধরিত্রী দিবস (Earth Day) উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের অত্যন্ত ব্যস্ত ৪২তম সড়কটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে পুরো শহরে হয়তো স্থবিরতা নেমে আসবে, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল যানজট আগের চেয়ে কমে গেছে। একইভাবে, ২০০৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে শহরের কেন্দ্রস্থলের একটি ব্যস্ত ছয় লেনের হাইওয়ে ভেঙে সেখানে পার্ক ও নদী তৈরি করা হয়। এর ফলে আশপাশের ট্রাফিক ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক বেশি গতিশীল হয়ে উঠেছিল।

এছাড়া সিগন্যালে গাড়ির দীর্ঘ লাইন কেন তৈরি হয় এবং জ্যাম কেন পেছনের দিকে ছড়াতে থাকে, তার ব্যাখ্যা দেয় 'কিউয়িং থিওরি'। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, একটি রাস্তায় প্রতি মিনিটে প্রবেশ করা গাড়ির সংখ্যা (X) যদি বের হওয়া গাড়ির সংখ্যার (Y) চেয়ে বেশি হয়, তবে জ্যাম পেছনের দিকে বাড়তে থাকে। যেমন, একটি রাস্তায় প্রতি মিনিটে ৫০টি গাড়ি ঢুকছে, কিন্তু সিগন্যাল বা সরু পথের কারণে বের হতে পারছে মাত্র ৪০টি। এমন পরিস্থিতিতে কোনো মোড়ে যদি একটি গাড়ি হঠাৎ লেন পরিবর্তন করে মাত্র ২ সেকেন্ডের জন্য ব্রেক চাপে, তবে তার পেছনে থাকা অন্তত ১০০টি গাড়িকে ব্রেক চাপতে হয়। এভাবেই ছোট একটি ঘটনা বিশাল যানজটের রূপ নেয়। এই সমস্যা এড়াতে চালকদের হুট করে ব্রেক না চেপে একটু ফাঁকা জায়গায় গিয়ে গতি কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। এই কারণেই আজকাল রাস্তার মাঝখানে যত্রতত্র পারাপার বন্ধ করে নির্দিষ্ট কিছু স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত জ্যাম এড়ানো যায়।

ঠিক এই গ্রাফ থিওরির ওপর নির্ভর করে গুগল ম্যাপে (Google Map) এর মতো অ্যাপগুলো আমাদের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়ার রাস্তা দেখিয়ে থাকে।