লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:৩৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষা খাতে বাড়ছে বৈষম্য ও ব্যয়, কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীলতা উদ্বেগজনক

১৭ সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবস পালিত হচ্ছে, কিন্তু ১৯৬২ সালের শরিফ শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য—সবার জন্য গণমুখী ও বৈষম্যহীন শিক্ষা—৬৪ বছর পরও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে দেশে প্রথম শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছিল। এরপর নানা সরকারের সময় আটটি শিক্ষা কমিশন বা কমিটি গঠিত হয়েছে। এখন বিএনপি সরকার নতুন শিক্ষানীতি করবে নাকি অন্য কিছু করবে, তা স্পষ্ট নয়। যদিও এরই মধ্যে ২০২৮ সাল থেকে শিক্ষাক্রমে ব্যাপক মাত্রায় পরিমার্জনের ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়েও বেশ কিছু পরিমার্জনের পাশাপাশি চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে চারটি বই যুক্ত করা হবে। বরং প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে আয় ও সুযোগের ভিত্তিতে বৈষম্যের নতুন নতুন ধরন তৈরি হয়েছে।

সর্বশেষ জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার সুপারিশ থাকলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা মৌলিক শিক্ষা পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারছে না। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ থাকলেও শিক্ষার গুণগত মান ও শিক্ষকসংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের কোচিং ও প্রাইভেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ইউনিটের গত জুনের পরিদর্শনে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের দুই হাজারের বেশি বিদ্যালয়ে শিশুদের বাংলা বর্ণ উচ্চারণ, ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা পাওয়া গেছে।

শিক্ষার এই বৈষম্য মাধ্যমিক স্তরে আরও স্পষ্ট হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের ১৫ হাজার ২৯৩টি পদের মধ্যে ৩ হাজারের বেশি এবং প্রধান শিক্ষকের ৩৮৩টি পদ খালি রয়েছে। সচ্ছল পরিবারের শিশুরা ইংরেজি মাধ্যম বা কিন্ডারগার্টেনে পড়ার সুযোগ পেলেও নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুরা সরকারি বিদ্যালয়ের সীমাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে। পুরান ঢাকার এক শিক্ষার্থীর পরিবারের মাসে দুটি গৃহশিক্ষকের পেছনেই খরচ হয় সাড়ে ছয় হাজার টাকা।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। দেশের ১৭৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে বছরে ব্যয় ২ লাখ ৫২ হাজার ২৪১ টাকা, অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে এই ব্যয় মাত্র ৭৮৯ টাকা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় টিউশন ফির ওপর নির্ভর করতে হয়, যা সাধারণ পরিবারের নাগালের বাইরে।

ঝরে পড়ার হার প্রাথমিকে ১৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা গত এক বছরে প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের ৩৬ হাজার ২৩৫টি পদ শূন্য। প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, পিএসসির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণি বাদে ওপরের সব শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে। লটারি পদ্ধতি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিক্ষাবিদদের আশঙ্কা, এতে শিশুদের ওপর চাপ বাড়বে এবং ভর্তি-কোচিংয়ের প্রবণতা নতুন করে বাড়তে পারে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় বৈষম্য মানে জাতির ভিত্তি দুর্বল করে দেওয়া। নতুন সরকার আগামী অর্থবছরে শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে, যা জিডিপির ২ শতাংশ। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। শিক্ষাবিদরা বলছেন, জন্মস্থান বা পরিবারের আয়ের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া বন্ধ না হলে বৈষম্যহীন শিক্ষার স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

দেশের বাজারে আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম, ভরিতে বাড়ল ৩২৬৬ টাকা

শিক্ষা খাতে বাড়ছে বৈষম্য ও ব্যয়, কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীলতা উদ্বেগজনক

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:৩২:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১৭ সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবস পালিত হচ্ছে, কিন্তু ১৯৬২ সালের শরিফ শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য—সবার জন্য গণমুখী ও বৈষম্যহীন শিক্ষা—৬৪ বছর পরও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে দেশে প্রথম শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছিল। এরপর নানা সরকারের সময় আটটি শিক্ষা কমিশন বা কমিটি গঠিত হয়েছে। এখন বিএনপি সরকার নতুন শিক্ষানীতি করবে নাকি অন্য কিছু করবে, তা স্পষ্ট নয়। যদিও এরই মধ্যে ২০২৮ সাল থেকে শিক্ষাক্রমে ব্যাপক মাত্রায় পরিমার্জনের ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়েও বেশ কিছু পরিমার্জনের পাশাপাশি চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে চারটি বই যুক্ত করা হবে। বরং প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে আয় ও সুযোগের ভিত্তিতে বৈষম্যের নতুন নতুন ধরন তৈরি হয়েছে।

সর্বশেষ জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার সুপারিশ থাকলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা মৌলিক শিক্ষা পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারছে না। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ থাকলেও শিক্ষার গুণগত মান ও শিক্ষকসংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের কোচিং ও প্রাইভেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ইউনিটের গত জুনের পরিদর্শনে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের দুই হাজারের বেশি বিদ্যালয়ে শিশুদের বাংলা বর্ণ উচ্চারণ, ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা পাওয়া গেছে।

শিক্ষার এই বৈষম্য মাধ্যমিক স্তরে আরও স্পষ্ট হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের ১৫ হাজার ২৯৩টি পদের মধ্যে ৩ হাজারের বেশি এবং প্রধান শিক্ষকের ৩৮৩টি পদ খালি রয়েছে। সচ্ছল পরিবারের শিশুরা ইংরেজি মাধ্যম বা কিন্ডারগার্টেনে পড়ার সুযোগ পেলেও নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুরা সরকারি বিদ্যালয়ের সীমাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে। পুরান ঢাকার এক শিক্ষার্থীর পরিবারের মাসে দুটি গৃহশিক্ষকের পেছনেই খরচ হয় সাড়ে ছয় হাজার টাকা।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। দেশের ১৭৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে বছরে ব্যয় ২ লাখ ৫২ হাজার ২৪১ টাকা, অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে এই ব্যয় মাত্র ৭৮৯ টাকা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় টিউশন ফির ওপর নির্ভর করতে হয়, যা সাধারণ পরিবারের নাগালের বাইরে।

ঝরে পড়ার হার প্রাথমিকে ১৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা গত এক বছরে প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের ৩৬ হাজার ২৩৫টি পদ শূন্য। প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, পিএসসির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণি বাদে ওপরের সব শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে। লটারি পদ্ধতি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিক্ষাবিদদের আশঙ্কা, এতে শিশুদের ওপর চাপ বাড়বে এবং ভর্তি-কোচিংয়ের প্রবণতা নতুন করে বাড়তে পারে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় বৈষম্য মানে জাতির ভিত্তি দুর্বল করে দেওয়া। নতুন সরকার আগামী অর্থবছরে শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে, যা জিডিপির ২ শতাংশ। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। শিক্ষাবিদরা বলছেন, জন্মস্থান বা পরিবারের আয়ের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া বন্ধ না হলে বৈষম্যহীন শিক্ষার স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে।