লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:৪৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দক্ষ যুবসমাজ গড়ার উদ্যোগে ঘাটতি, ঢাকা দক্ষিণে বাড়ছে অপরাধ

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে (ডিএসসিসি) দক্ষ যুবসমাজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগের অভাব দেখা দিয়েছে। এর ফলে বিপুল এই তরুণ জনগোষ্ঠীর বড় অংশই বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় হতাশ হয়ে পড়ছে। এই সুযোগে তাদের কেউ কেউ মাদক, জুয়া, চুরি-ছিনতাই, অনলাইন জালিয়াতি এবং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে চাঁদাবাজির মতো নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

রাজধানীর ২৩টি থানা নিয়ে গঠিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনকে মোট ১০টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। এখানে রয়েছে ৭৫টি প্রশাসনিক ওয়ার্ড এবং নারীদের জন্য ২৫টি সংরক্ষিত কাউন্সিলর আসন। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ডিএসসিসির জনসংখ্যা ছিল ৩৮ লাখ ৮৩ হাজার ৪২৩ জন, যা ২০২২ সালের জনশুমারিতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ লাখ ৯৯ হাজার ৩৪৫ জনে। প্রায় ১০৯ দশমিক ২৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই সিটিতে ২০২০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভোটার সংখ্যা ২৩ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৮ জন। বাসিন্দাদের অভিযোগ, এত বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য দক্ষ যুবসমাজ গঠনে এখনো যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

ডিএসসিসির ওয়ারী বিভাগের বাসিন্দা মো. মিজানুর রহমান, শিবলি সাদিক, আনোয়ার ও শাহিন জানান, সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করার পর্যাপ্ত সুযোগ তারা পাচ্ছেন না। ডিগ্রি অর্জন করেও অনেকে বেকার ঘুরছেন। চাকরির বাজারে অভিজ্ঞতা চাওয়া হলেও প্রশিক্ষণ ছাড়া সেই অভিজ্ঞতা অর্জনের কোনো উপায় তাদের সামনে নেই। এদিকে, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণদের প্রায় ২৮ শতাংশই কোনো ধরনের কর্মসংস্থান বা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত নেই (নিট)। ডিএসসিসির অঞ্চল-৬ এর আঞ্চলিক কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী পারভেজ রানা মনে করেন, কর্মহীন ও শিক্ষাবিমুখ এই পরিস্থিতি সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দেওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে।

এ প্রসঙ্গে লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট লায়ন মীর আব্দুল আলীম বলেন, যুবসমাজই একটি শহর ও দেশের অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একযোগে কাজ করতে হবে। শুধু তত্ত্বীয় শিক্ষা নয়, বরং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার পাশাপাশি হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তরুণরা শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজেদের গড়ে তুলতে পারে।

বাংলাদেশ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) তথা যুগ্মসচিব মো. মানিকহার রহমান জানান, ঢাকা দক্ষিণে যুবকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে প্রতিবছর শিক্ষাক্ষেত্র থেকে প্রায় ২২ লাখ বেকার তরুণ-যুবক বের হন, যার মধ্যে সরকারি ও বেসরকারিভাবে মাত্র ৫ লাখের কর্মসংস্থান সম্ভব হয়। বাকি ১৬-১৭ লাখের মধ্য থেকে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রায় ২২ থেকে ২৫ শতাংশকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তুলছে, যা সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছে। এছাড়া প্রশিক্ষিত যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে মাত্র ৫ শতাংশ সুদে ঋণের সুবিধাও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে দক্ষ যুবসমাজ গড়ে না ওঠার পেছনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নজরদারির অভাব রয়েছে। পর্যাপ্ত ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় অনেকে রাজনৈতিক আশ্রয়ে চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ছেন। প্রশিক্ষণের অভাবে দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে না পারায় বিপুল এই তরুণ শক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ বা 'জনতাত্ত্বিক মুনাফা' (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) এখন ডিএসসিসির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

১৬ সরকারি মেডিকেল কলেজে চরম শিক্ষক ও অবকাঠামোর সংকট

দক্ষ যুবসমাজ গড়ার উদ্যোগে ঘাটতি, ঢাকা দক্ষিণে বাড়ছে অপরাধ

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:০৭:৩৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে (ডিএসসিসি) দক্ষ যুবসমাজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগের অভাব দেখা দিয়েছে। এর ফলে বিপুল এই তরুণ জনগোষ্ঠীর বড় অংশই বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় হতাশ হয়ে পড়ছে। এই সুযোগে তাদের কেউ কেউ মাদক, জুয়া, চুরি-ছিনতাই, অনলাইন জালিয়াতি এবং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে চাঁদাবাজির মতো নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

রাজধানীর ২৩টি থানা নিয়ে গঠিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনকে মোট ১০টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। এখানে রয়েছে ৭৫টি প্রশাসনিক ওয়ার্ড এবং নারীদের জন্য ২৫টি সংরক্ষিত কাউন্সিলর আসন। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ডিএসসিসির জনসংখ্যা ছিল ৩৮ লাখ ৮৩ হাজার ৪২৩ জন, যা ২০২২ সালের জনশুমারিতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ লাখ ৯৯ হাজার ৩৪৫ জনে। প্রায় ১০৯ দশমিক ২৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই সিটিতে ২০২০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভোটার সংখ্যা ২৩ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৮ জন। বাসিন্দাদের অভিযোগ, এত বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য দক্ষ যুবসমাজ গঠনে এখনো যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

ডিএসসিসির ওয়ারী বিভাগের বাসিন্দা মো. মিজানুর রহমান, শিবলি সাদিক, আনোয়ার ও শাহিন জানান, সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করার পর্যাপ্ত সুযোগ তারা পাচ্ছেন না। ডিগ্রি অর্জন করেও অনেকে বেকার ঘুরছেন। চাকরির বাজারে অভিজ্ঞতা চাওয়া হলেও প্রশিক্ষণ ছাড়া সেই অভিজ্ঞতা অর্জনের কোনো উপায় তাদের সামনে নেই। এদিকে, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণদের প্রায় ২৮ শতাংশই কোনো ধরনের কর্মসংস্থান বা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত নেই (নিট)। ডিএসসিসির অঞ্চল-৬ এর আঞ্চলিক কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী পারভেজ রানা মনে করেন, কর্মহীন ও শিক্ষাবিমুখ এই পরিস্থিতি সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দেওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে।

এ প্রসঙ্গে লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট লায়ন মীর আব্দুল আলীম বলেন, যুবসমাজই একটি শহর ও দেশের অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একযোগে কাজ করতে হবে। শুধু তত্ত্বীয় শিক্ষা নয়, বরং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার পাশাপাশি হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তরুণরা শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজেদের গড়ে তুলতে পারে।

বাংলাদেশ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) তথা যুগ্মসচিব মো. মানিকহার রহমান জানান, ঢাকা দক্ষিণে যুবকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে প্রতিবছর শিক্ষাক্ষেত্র থেকে প্রায় ২২ লাখ বেকার তরুণ-যুবক বের হন, যার মধ্যে সরকারি ও বেসরকারিভাবে মাত্র ৫ লাখের কর্মসংস্থান সম্ভব হয়। বাকি ১৬-১৭ লাখের মধ্য থেকে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রায় ২২ থেকে ২৫ শতাংশকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তুলছে, যা সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছে। এছাড়া প্রশিক্ষিত যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে মাত্র ৫ শতাংশ সুদে ঋণের সুবিধাও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে দক্ষ যুবসমাজ গড়ে না ওঠার পেছনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নজরদারির অভাব রয়েছে। পর্যাপ্ত ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় অনেকে রাজনৈতিক আশ্রয়ে চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ছেন। প্রশিক্ষণের অভাবে দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে না পারায় বিপুল এই তরুণ শক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ বা 'জনতাত্ত্বিক মুনাফা' (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) এখন ডিএসসিসির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।