লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:৫৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সে মূল্যবৃদ্ধি বিরোধী বিক্ষোভে সহিংসতা, কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ম্যাক্রনের

জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সে দেশজুড়ে আয়োজিত আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্যারিসসহ বেশ কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ, দোকানপাটে ভাঙচুর, লুটপাট এবং সরকারি ভবনে হামলার ঘটনা ঘটেছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) কয়েকটি এলাকায় শান্তিপূর্ণ মিছিলের পাশাপাশি এই সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করে কঠোর শাস্তি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ফরাসি প্রজাতন্ত্রে কোনো ধরনের সহিংসতার স্থান নেই। তিনি বলেন, প্রিফেকচার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ভাঙচুর চালানো ব্যক্তি এবং এমনকি পৌরসভা ভবন লুটপাটে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি আরও বলেন, নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করার অধিকার রক্ষায় যারা দায়িত্ব পালন করছেন, পুরো জাতি তাদের পাশে রয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের চেষ্টা নস্যাৎ করা এবং সাধারণ মানুষের অধিকার সুরক্ষায় সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

রয়টার্স, এএফপি এবং ফরাসি দৈনিক লে মঁদের প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, শনিবার প্যারিসের রিপাবলিক চত্বরসহ একাধিক স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। উত্তেজিত দলগুলো পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তুকণা ছুড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে কয়েকটি সড়কে যানবাহন ও আবর্জনার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং দোকানপাট ভাঙচুর করা হয়। অন্যান্য শহরের মধ্যে মার্সেইতে বিক্ষোভকারীদের একটি দল পৌরসভা ভবনে ঢুকে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে, লিলে শহরে মেয়রের কার্যালয়ের কয়েকটি কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং লিয়োঁ শহরের একটি পর্যটন কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এসব ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তবে ফরাসি সংবাদমাধ্যমের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্যারিসের অনুমোদিত রুটের একটি বিশাল মিছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়, ফলে সহিংস চক্রের সঙ্গে সাধারণ প্রতিবাদকারীদের আলাদাভাবে দেখার কথা বলা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের দপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে রয়টার্স জানায়, শনিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে দেশজুড়ে অন্তত ২৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে দিনের বিভিন্ন সময়ে এই সংখ্যা পরিবর্তনশীল হওয়ায় চূড়ান্ত তথ্যের জন্য সরকারি বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষা রয়েছে। অন্যদিকে, কর্মসূচিতে উপস্থিতি নিয়ে সরকারি হিসাবের সঙ্গে আয়োজকদের দাবির বড় ফারাক দেখা গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দুপুর পর্যন্ত প্যারিসের বাইরে ১৪০টি কর্মসূচিতে প্রায় ৩২ হাজার ৮০০ জন অংশ নেন। তবে শ্রমিক সংগঠন সিজিটি দাবি করেছে, দেশব্যাপী এই আন্দোলনে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন।

ফ্রান্সের এই বর্তমান সামাজিক উত্তেজনার মূলে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানির দাম, সামাজিক বৈষম্য এবং সরকারি পরিষেবা নিয়ে তৈরি হওয়া ক্ষোভ। এর পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি নিয়ে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন। শনিবারের কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী, শ্রমিক, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এবং সাবেক 'ইয়েলো ভেস্ট' আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত দলগুলো অংশ নেয়। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কমানো ও শিক্ষ খাতের সংকট দূর করাই এতে মূল দাবি হিসেবে উঠে আসে। ২০১৮-১৯ সালের ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের আদল থাকলেও এবার শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও দলগত অংশগ্রহণের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রেসিডেন্টের কঠোর বার্তা থেকে এটি স্পষ্ট যে, সরকার আইনশৃঙ্খলা বজায় রেখে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ দিতে চায়, তবে সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি বরদাস্ত করবে না। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বলপ্রয়োগ করে সহিংসতা দমন নয়, জনগণের মূল অর্থনৈতিক সংকট ও ক্ষোভের নিরসন না হলে ফ্রান্সে এই সামাজিক অস্থিরতা প্রশমিত হওয়া কঠিন হবে। ফলে একাধারে নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অন্যদিকে মানুষের ন্যায্য দাবি সমাধানের মধ্যবর্তী বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে ম্যাক্রন সরকার।

জনপ্রিয় সংবাদ

ফ্যাসিস্ট আমলেও জনগণের পাশে ছিল জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন: রিজভী

ফ্রান্সে মূল্যবৃদ্ধি বিরোধী বিক্ষোভে সহিংসতা, কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ম্যাক্রনের

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:০৯:৩০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সে দেশজুড়ে আয়োজিত আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্যারিসসহ বেশ কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ, দোকানপাটে ভাঙচুর, লুটপাট এবং সরকারি ভবনে হামলার ঘটনা ঘটেছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) কয়েকটি এলাকায় শান্তিপূর্ণ মিছিলের পাশাপাশি এই সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করে কঠোর শাস্তি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ফরাসি প্রজাতন্ত্রে কোনো ধরনের সহিংসতার স্থান নেই। তিনি বলেন, প্রিফেকচার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ভাঙচুর চালানো ব্যক্তি এবং এমনকি পৌরসভা ভবন লুটপাটে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি আরও বলেন, নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করার অধিকার রক্ষায় যারা দায়িত্ব পালন করছেন, পুরো জাতি তাদের পাশে রয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের চেষ্টা নস্যাৎ করা এবং সাধারণ মানুষের অধিকার সুরক্ষায় সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

রয়টার্স, এএফপি এবং ফরাসি দৈনিক লে মঁদের প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, শনিবার প্যারিসের রিপাবলিক চত্বরসহ একাধিক স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। উত্তেজিত দলগুলো পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তুকণা ছুড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে কয়েকটি সড়কে যানবাহন ও আবর্জনার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং দোকানপাট ভাঙচুর করা হয়। অন্যান্য শহরের মধ্যে মার্সেইতে বিক্ষোভকারীদের একটি দল পৌরসভা ভবনে ঢুকে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে, লিলে শহরে মেয়রের কার্যালয়ের কয়েকটি কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং লিয়োঁ শহরের একটি পর্যটন কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এসব ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তবে ফরাসি সংবাদমাধ্যমের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্যারিসের অনুমোদিত রুটের একটি বিশাল মিছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়, ফলে সহিংস চক্রের সঙ্গে সাধারণ প্রতিবাদকারীদের আলাদাভাবে দেখার কথা বলা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের দপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে রয়টার্স জানায়, শনিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে দেশজুড়ে অন্তত ২৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে দিনের বিভিন্ন সময়ে এই সংখ্যা পরিবর্তনশীল হওয়ায় চূড়ান্ত তথ্যের জন্য সরকারি বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষা রয়েছে। অন্যদিকে, কর্মসূচিতে উপস্থিতি নিয়ে সরকারি হিসাবের সঙ্গে আয়োজকদের দাবির বড় ফারাক দেখা গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দুপুর পর্যন্ত প্যারিসের বাইরে ১৪০টি কর্মসূচিতে প্রায় ৩২ হাজার ৮০০ জন অংশ নেন। তবে শ্রমিক সংগঠন সিজিটি দাবি করেছে, দেশব্যাপী এই আন্দোলনে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন।

ফ্রান্সের এই বর্তমান সামাজিক উত্তেজনার মূলে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানির দাম, সামাজিক বৈষম্য এবং সরকারি পরিষেবা নিয়ে তৈরি হওয়া ক্ষোভ। এর পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি নিয়ে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন। শনিবারের কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী, শ্রমিক, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এবং সাবেক 'ইয়েলো ভেস্ট' আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত দলগুলো অংশ নেয়। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কমানো ও শিক্ষ খাতের সংকট দূর করাই এতে মূল দাবি হিসেবে উঠে আসে। ২০১৮-১৯ সালের ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের আদল থাকলেও এবার শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও দলগত অংশগ্রহণের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রেসিডেন্টের কঠোর বার্তা থেকে এটি স্পষ্ট যে, সরকার আইনশৃঙ্খলা বজায় রেখে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ দিতে চায়, তবে সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি বরদাস্ত করবে না। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বলপ্রয়োগ করে সহিংসতা দমন নয়, জনগণের মূল অর্থনৈতিক সংকট ও ক্ষোভের নিরসন না হলে ফ্রান্সে এই সামাজিক অস্থিরতা প্রশমিত হওয়া কঠিন হবে। ফলে একাধারে নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অন্যদিকে মানুষের ন্যায্য দাবি সমাধানের মধ্যবর্তী বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে ম্যাক্রন সরকার।