লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৬:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারে স্বাধীন কমিশন ও পৃথক অধিদপ্তরের সুপারিশ

দেশের স্বাস্থ্য খাতের প্রধান সমস্যাগুলো মূলত সেবার মান ও পরিমাণের ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও গণজবাবদিহিতার দুর্বলতার সঙ্গে জড়িত। স্বাস্থ্য খাতের এই বহুমুখী ও পরস্পর সংযুক্ত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে একগুচ্ছ বৈপ্লবিক সুপারিশ করেছে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন। এই সংস্কার প্রস্তাবের মূল ভিত্তি হিসেবে 'বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন' নামে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা সরাসরি সরকারপ্রধানের কাছে জবাবদিহি করবে। মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত এই কমিশনের নিজস্ব থোক বরাদ্দ এবং নিরীক্ষিত বাজেট থাকবে। একজন অভিজ্ঞ জনস্বাস্থ্য বা ক্লিনিক্যাল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নেতৃত্বে গঠিতব্য এই কমিশনে জনস্বাস্থ্য, রোগতত্ত্ব, আইন, জেন্ডার, অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, পরিকল্পনা এবং নার্সিং ও প্যারামেডিকসহ বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা সদস্য হিসেবে থাকবেন। কমিশন প্রতি তিন মাসে অন্তত একবার ঢাকা বা ঢাকার বাইরে সভায় মিলিত হবে।

প্রস্তাবিত এই স্বাস্থ্য কমিশনের অধীনে মূলত তিনটি পৃথক তদারকি অধিদপ্তর থাকবে। এগুলো হলো—হাসপাতাল ও রোগ নির্ণায়ক সেবা অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং মেডিকেল ও সহযোগী শিক্ষা অধিদপ্তর। তদারককারী ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো সম্পূর্ণ আলাদা থাকবে যাতে কোনো ধরনের স্বার্থের সংঘাত ছাড়াই তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। এছাড়া, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ অবকাঠামোতে রূপ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, যার নীতি ও কৌশল নির্ধারণের নেতৃত্বে থাকবেন জনপ্রতিনিধিরা। প্রশাসনিক স্তরে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের একজন সচিবের অধীনে তিনজন মহাপরিচালক কাজ করবেন, যাদের পদমর্যাদা হবে সিনিয়র সচিবের সমান। অতিরিক্ত মহাপরিচালকরা পাবেন সচিবের পদমর্যাদা। স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা শিক্ষা বিভাগের বর্তমান পরিচালকদের পদ অতিরিক্ত সচিব, সিভিল সার্জনদের পদ যুগ্ম সচিব এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের পদ উপসচিবের সমমানের করার সুপারিশ করা হয়েছে।

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মস্পৃহা বাড়াতে এবং মেধা পাচার রোধে আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা ও পদোন্নতির নীতিমালার প্রস্তাব করেছে কমিশন। চিকিৎসকদের দীর্ঘ ছয় বছরের কঠোর পড়াশোনা এবং সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে যোগ্যতার পাশাপাশি কর্মস্থলের দুর্গমতার ওপর ভিত্তি করে ৩০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত বেতন-ভাতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। চিকিৎসকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে সততা, কর্মস্থল এবং দায়িত্ব পালনের ইতিহাস মূল্যায়ন করা হবে। চিকিৎসা শিক্ষার মান বাড়াতে মেডিকেল শিক্ষা অধিদপ্তরে নার্সিং ও প্যারামেডিক শিক্ষার জন্য একটি অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও দুটি পরিচালকের পদ সৃষ্টির সুপারিশ করা হয়েছে। শিক্ষকরা যাতে কেবল শিক্ষা ও গবেষণায় নিয়োজিত থাকতে পারেন, সেজন্য তাদের বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। অন্যদিকে, হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল চিকিৎসকরা কনসালট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং আধুনিক চিকিৎসার জ্ঞানচর্চায় তাদের অতিথি শিক্ষক হিসেবে ক্লাসে আমন্ত্রণ জানানো হবে।

বাংলাদেশে বর্তমানে রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য কোনো পৃথক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো নেই। অথচ প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও ভুটানসহ ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারেও পৃথক জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর রয়েছে, যার ইতিবাচক প্রভাব তাদের স্বাস্থ্যসূচকে দৃশ্যমান। এই বাস্তবতায় একটি স্বাধীন 'জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর' গঠনের প্রস্তাব করেছে সংস্কার কমিশন। এই প্রস্তাবটি দেশের তিনটি প্রধান রাজনৈতিক দল, তিনটি চিকিৎসক সমিতি, নার্স-প্যারামেডিক প্রতিনিধি এবং শিক্ষার্থীদের সমর্থন পেয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাধ্যমে পরিচালিত এক জরিপে ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পক্ষে মত দিয়েছেন। এই অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অধীনে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা, নগর স্বাস্থ্যসেবা, পারিবারিক স্বাস্থ্যসেবা এবং পুষ্টিসেবা পরিচালনার জন্য চারজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক থাকবেন।

জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে ২০১১ সাল থেকে স্থবির হয়ে থাকা পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে এই অধিদপ্তরের সঙ্গে একীভূত করার সুপারিশ করা হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ১,১২০ জন চিকিৎসক স্বাস্থ্য বিভাগে যুক্ত হতে চান এবং ৩০৩ জন নন-টেকনিক্যাল ক্যাডার কর্মকর্তা অন্য ক্যাডারে চলে যেতে চান অথবা তাদের অবসর গ্রহণের পর পদগুলো বিলুপ্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনাকে জনস্বাস্থ্যের অধীনে এনে একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবার পরিকল্পনা সহকারী ও কমিউনিটি হেলথকেয়ার প্রোভাইডারদের কাজের এলাকা তিন ভাগে ভাগ করে সমন্বিত সেবা চালুর কথা বলা হয়েছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন ও নগর ওয়ার্ড পর্যায় থেকে রেফারেল ব্যবস্থা চালু করা হবে। এজন্য কমিউনিটি ক্লিনিক সহায়তা ট্রাস্ট অবলুপ্ত করে সেই স্থানে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।

প্রস্তাবিত জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর মহামারি, অতিমারি বা দুর্যোগকালীন সময়ে যেকোনো সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কারখানা সাময়িকভাবে ব্যবহারের জরুরি ক্ষমতা পাবে। এই অধিদপ্তরের সঙ্গে সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, ইপিআই এবং মা ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ একীভূত থাকবে। অন্যদিকে, বর্তমান স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের নাম পরিবর্তন করে 'হাসপাতাল ও রোগ নির্ণায়ক সেবা অধিদপ্তর' করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থার অধীনে উপজেলা বা তার ওপরের স্তরের হাসপাতালগুলোতে কেবল ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায় থেকে রেফার করা রোগীদেরই চিকিৎসা দেওয়া হবে, যাতে চিকিৎসকরা রোগীদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন। চিকিৎসক ও নার্সদের সুসম্পর্ক বজায় রাখতে নার্সিং বিভাগকে পুনরায় এই অধিদপ্তরের অধীনে একীভূত করা হবে এবং নার্সদের জন্য একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও প্যারামেডিকদের জন্য একজন পরিচালকের পদ সৃষ্টি করা হবে।

হাসপাতাল সেবার মান বাড়াতে রোগ নির্ণয় গবেষণাগার, ফার্মেসি, রক্ত পরিসঞ্চালন ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা—এই চারটি সহায়ক কর্মসূচিকে জাতীয় পর্যায় থেকে কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যন্ত আলাদা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা সচল রাখা হবে। এজন্য একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (সহায়ক সেবা) এবং চারটি পরিচালকের পদ সৃষ্টি করা হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও চাইলে এই নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারবে। সর্বজনীন বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক মিডওয়াইফ, প্যারামেডিক, মাঠকর্মী ও চিকিৎসক নিয়োগ করতে হবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে দেশের জিডিপির ৫ শতাংশ অথবা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে, যা রাজনৈতিক দল ও চিকিৎসক সংগঠনগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। সাধারণ কর ছাড়াও সামাজিক দায়বদ্ধতা কর, সিন-ট্যাক্স (পাপ কর), দাতা সংস্থা ও রোগীদের অনুদান থেকে এই অর্থ সংস্থান করা যাবে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক খাতের চাকরিজীবীদের জন্য সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা চালু এবং দেশের ২০ শতাংশ অতিদরিদ্র মানুষকে সব হাসপাতালে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১০ শতাংশ সেবা বেসরকারি হাসপাতালগুলো থেকে নিশ্চিত করতে হবে।

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৭: ৪৯আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৭: ৪৯

জনপ্রিয় সংবাদ

মিঠামইনে বিয়ের বহরে অটোরিকশাচালকদের হামলা, পুলিশসহ আহত ১৫

স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারে স্বাধীন কমিশন ও পৃথক অধিদপ্তরের সুপারিশ

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:০২:৩৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

দেশের স্বাস্থ্য খাতের প্রধান সমস্যাগুলো মূলত সেবার মান ও পরিমাণের ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও গণজবাবদিহিতার দুর্বলতার সঙ্গে জড়িত। স্বাস্থ্য খাতের এই বহুমুখী ও পরস্পর সংযুক্ত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে একগুচ্ছ বৈপ্লবিক সুপারিশ করেছে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন। এই সংস্কার প্রস্তাবের মূল ভিত্তি হিসেবে 'বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন' নামে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা সরাসরি সরকারপ্রধানের কাছে জবাবদিহি করবে। মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত এই কমিশনের নিজস্ব থোক বরাদ্দ এবং নিরীক্ষিত বাজেট থাকবে। একজন অভিজ্ঞ জনস্বাস্থ্য বা ক্লিনিক্যাল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নেতৃত্বে গঠিতব্য এই কমিশনে জনস্বাস্থ্য, রোগতত্ত্ব, আইন, জেন্ডার, অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, পরিকল্পনা এবং নার্সিং ও প্যারামেডিকসহ বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা সদস্য হিসেবে থাকবেন। কমিশন প্রতি তিন মাসে অন্তত একবার ঢাকা বা ঢাকার বাইরে সভায় মিলিত হবে।

প্রস্তাবিত এই স্বাস্থ্য কমিশনের অধীনে মূলত তিনটি পৃথক তদারকি অধিদপ্তর থাকবে। এগুলো হলো—হাসপাতাল ও রোগ নির্ণায়ক সেবা অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং মেডিকেল ও সহযোগী শিক্ষা অধিদপ্তর। তদারককারী ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো সম্পূর্ণ আলাদা থাকবে যাতে কোনো ধরনের স্বার্থের সংঘাত ছাড়াই তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। এছাড়া, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ অবকাঠামোতে রূপ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, যার নীতি ও কৌশল নির্ধারণের নেতৃত্বে থাকবেন জনপ্রতিনিধিরা। প্রশাসনিক স্তরে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের একজন সচিবের অধীনে তিনজন মহাপরিচালক কাজ করবেন, যাদের পদমর্যাদা হবে সিনিয়র সচিবের সমান। অতিরিক্ত মহাপরিচালকরা পাবেন সচিবের পদমর্যাদা। স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা শিক্ষা বিভাগের বর্তমান পরিচালকদের পদ অতিরিক্ত সচিব, সিভিল সার্জনদের পদ যুগ্ম সচিব এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের পদ উপসচিবের সমমানের করার সুপারিশ করা হয়েছে।

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মস্পৃহা বাড়াতে এবং মেধা পাচার রোধে আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা ও পদোন্নতির নীতিমালার প্রস্তাব করেছে কমিশন। চিকিৎসকদের দীর্ঘ ছয় বছরের কঠোর পড়াশোনা এবং সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে যোগ্যতার পাশাপাশি কর্মস্থলের দুর্গমতার ওপর ভিত্তি করে ৩০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত বেতন-ভাতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। চিকিৎসকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে সততা, কর্মস্থল এবং দায়িত্ব পালনের ইতিহাস মূল্যায়ন করা হবে। চিকিৎসা শিক্ষার মান বাড়াতে মেডিকেল শিক্ষা অধিদপ্তরে নার্সিং ও প্যারামেডিক শিক্ষার জন্য একটি অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও দুটি পরিচালকের পদ সৃষ্টির সুপারিশ করা হয়েছে। শিক্ষকরা যাতে কেবল শিক্ষা ও গবেষণায় নিয়োজিত থাকতে পারেন, সেজন্য তাদের বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। অন্যদিকে, হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল চিকিৎসকরা কনসালট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং আধুনিক চিকিৎসার জ্ঞানচর্চায় তাদের অতিথি শিক্ষক হিসেবে ক্লাসে আমন্ত্রণ জানানো হবে।

বাংলাদেশে বর্তমানে রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য কোনো পৃথক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো নেই। অথচ প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও ভুটানসহ ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারেও পৃথক জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর রয়েছে, যার ইতিবাচক প্রভাব তাদের স্বাস্থ্যসূচকে দৃশ্যমান। এই বাস্তবতায় একটি স্বাধীন 'জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর' গঠনের প্রস্তাব করেছে সংস্কার কমিশন। এই প্রস্তাবটি দেশের তিনটি প্রধান রাজনৈতিক দল, তিনটি চিকিৎসক সমিতি, নার্স-প্যারামেডিক প্রতিনিধি এবং শিক্ষার্থীদের সমর্থন পেয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাধ্যমে পরিচালিত এক জরিপে ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পক্ষে মত দিয়েছেন। এই অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অধীনে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা, নগর স্বাস্থ্যসেবা, পারিবারিক স্বাস্থ্যসেবা এবং পুষ্টিসেবা পরিচালনার জন্য চারজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক থাকবেন।

জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে ২০১১ সাল থেকে স্থবির হয়ে থাকা পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে এই অধিদপ্তরের সঙ্গে একীভূত করার সুপারিশ করা হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ১,১২০ জন চিকিৎসক স্বাস্থ্য বিভাগে যুক্ত হতে চান এবং ৩০৩ জন নন-টেকনিক্যাল ক্যাডার কর্মকর্তা অন্য ক্যাডারে চলে যেতে চান অথবা তাদের অবসর গ্রহণের পর পদগুলো বিলুপ্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনাকে জনস্বাস্থ্যের অধীনে এনে একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবার পরিকল্পনা সহকারী ও কমিউনিটি হেলথকেয়ার প্রোভাইডারদের কাজের এলাকা তিন ভাগে ভাগ করে সমন্বিত সেবা চালুর কথা বলা হয়েছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন ও নগর ওয়ার্ড পর্যায় থেকে রেফারেল ব্যবস্থা চালু করা হবে। এজন্য কমিউনিটি ক্লিনিক সহায়তা ট্রাস্ট অবলুপ্ত করে সেই স্থানে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।

প্রস্তাবিত জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর মহামারি, অতিমারি বা দুর্যোগকালীন সময়ে যেকোনো সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কারখানা সাময়িকভাবে ব্যবহারের জরুরি ক্ষমতা পাবে। এই অধিদপ্তরের সঙ্গে সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, ইপিআই এবং মা ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ একীভূত থাকবে। অন্যদিকে, বর্তমান স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের নাম পরিবর্তন করে 'হাসপাতাল ও রোগ নির্ণায়ক সেবা অধিদপ্তর' করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থার অধীনে উপজেলা বা তার ওপরের স্তরের হাসপাতালগুলোতে কেবল ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায় থেকে রেফার করা রোগীদেরই চিকিৎসা দেওয়া হবে, যাতে চিকিৎসকরা রোগীদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন। চিকিৎসক ও নার্সদের সুসম্পর্ক বজায় রাখতে নার্সিং বিভাগকে পুনরায় এই অধিদপ্তরের অধীনে একীভূত করা হবে এবং নার্সদের জন্য একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও প্যারামেডিকদের জন্য একজন পরিচালকের পদ সৃষ্টি করা হবে।

হাসপাতাল সেবার মান বাড়াতে রোগ নির্ণয় গবেষণাগার, ফার্মেসি, রক্ত পরিসঞ্চালন ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা—এই চারটি সহায়ক কর্মসূচিকে জাতীয় পর্যায় থেকে কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যন্ত আলাদা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা সচল রাখা হবে। এজন্য একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (সহায়ক সেবা) এবং চারটি পরিচালকের পদ সৃষ্টি করা হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও চাইলে এই নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারবে। সর্বজনীন বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক মিডওয়াইফ, প্যারামেডিক, মাঠকর্মী ও চিকিৎসক নিয়োগ করতে হবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে দেশের জিডিপির ৫ শতাংশ অথবা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে, যা রাজনৈতিক দল ও চিকিৎসক সংগঠনগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। সাধারণ কর ছাড়াও সামাজিক দায়বদ্ধতা কর, সিন-ট্যাক্স (পাপ কর), দাতা সংস্থা ও রোগীদের অনুদান থেকে এই অর্থ সংস্থান করা যাবে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক খাতের চাকরিজীবীদের জন্য সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা চালু এবং দেশের ২০ শতাংশ অতিদরিদ্র মানুষকে সব হাসপাতালে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১০ শতাংশ সেবা বেসরকারি হাসপাতালগুলো থেকে নিশ্চিত করতে হবে।

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৭: ৪৯আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৭: ৪৯