লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৩:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশের ৪৮ শতাংশ হাসপাতালই অগ্নিঝুঁকিতে, উপেক্ষিত ফায়ার সার্ভিসের সতর্কবার্তা

দেশের চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা চরম হুমকির মুখে রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সাম্প্রতিকতম এক পরিদর্শনে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৪৮ শতাংশ হাসপাতাল ও ক্লিনিকই মারাত্মক অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই তালিকায় দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি হাসপাতালের নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মানুষের জীবন বাঁচানোর শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

গত কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে ইউনাইটেড হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডে করোনা রোগীর মৃত্যু, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে প্রাণহানি এবং শিশু হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাগা আগুনের ঘটনাগুলো অন্যতম। এসব দুর্ঘটনা দেশের হাসপাতালগুলোর ভঙ্গুর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তবে প্রতিটি দুর্ঘটনার পর কিছুদিন আলোচনা হলেও সময়ের ব্যবধানে তা ধামাচাপা পড়ে যায় এবং পরবর্তী বড় কোনো দুর্ঘটনার জন্য যেন অপেক্ষা করা হয়।

ফায়ার সার্ভিস নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে ত্রুটি ও ঝুঁকির জায়গাগুলো চিহ্নিত করে নোটিশ প্রদান এবং জরিমানা করলেও সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে কোনো ভ্রুক্ষেপ দেখা যায় না। বছরের পর বছর একই ধরনের ত্রুটি বহাল রেখে হাসপাতাল পরিচালনা করা হচ্ছে, যা রোগীদের জীবনকে জেনেশুনে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়ার শামিল। নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই যদি হাসপাতাল পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে কোনো প্রতিষ্ঠানই প্রয়োজনীয় সংস্কারে আগ্রহী হবে না।

একটি হাসপাতালকে সাধারণ আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবনের সঙ্গে তুলনা করার সুযোগ নেই। এখানে আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, অক্সিজেন ও মেডিকেল গ্যাসের লাইন এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি থাকে। এছাড়া হাসপাতালে এমন অনেক রোগী থাকেন, যারা শারীরিক অক্ষমতার কারণে নিজে হেঁটে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারেন না। ফলে সামান্য অগ্নিকাণ্ডও কয়েক মিনিটের মধ্যে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই হাসপাতাল নির্মাণের নকশা, বৈদ্যুতিক অবকাঠামো, জরুরি নির্গমন পথ, উন্নত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ধোঁয়া শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ মহড়াকে বিলাসিতা না ভেবে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তার অংশ করতে হবে。

অনেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার অজুহাত দেখিয়ে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না থাকার যুক্তি কোনোভাবেই রোগীর জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলার বৈধতা দিতে পারে না। রোগীর নিরাপত্তার চেয়ে বড় কোনো প্রশাসনিক বা আর্থিক অজুহাত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রয়োজনে ধাপে ধাপে সংস্কার, বিকল্প ভবনে স্থানান্তর বা নতুন অবকাঠামো তৈরি করে ঝুঁকি দূর করতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা সনদ বা এনওসি কঠোরভাবে বাধ্যতামূলক করা উচিত।

স্বাস্থ্যসেবা কেবল চিকিৎসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাসপাতালে আগুনে পুড়ে রোগীর মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক পরিকল্পনা, তদারকি ও জবাবদিহিতার চরম ব্যর্থতা। মানুষ যেখানে জীবন বাঁচানোর আশায় আসে, সেই স্থান যেন কোনোভাবেই নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের।

জনপ্রিয় সংবাদ

নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে দুই পক্ষের হাতাহাতি, লাঞ্ছিত সাখাওয়াত

দেশের ৪৮ শতাংশ হাসপাতালই অগ্নিঝুঁকিতে, উপেক্ষিত ফায়ার সার্ভিসের সতর্কবার্তা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:৩৫:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

দেশের চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা চরম হুমকির মুখে রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সাম্প্রতিকতম এক পরিদর্শনে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৪৮ শতাংশ হাসপাতাল ও ক্লিনিকই মারাত্মক অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই তালিকায় দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি হাসপাতালের নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মানুষের জীবন বাঁচানোর শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

গত কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে ইউনাইটেড হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডে করোনা রোগীর মৃত্যু, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে প্রাণহানি এবং শিশু হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাগা আগুনের ঘটনাগুলো অন্যতম। এসব দুর্ঘটনা দেশের হাসপাতালগুলোর ভঙ্গুর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তবে প্রতিটি দুর্ঘটনার পর কিছুদিন আলোচনা হলেও সময়ের ব্যবধানে তা ধামাচাপা পড়ে যায় এবং পরবর্তী বড় কোনো দুর্ঘটনার জন্য যেন অপেক্ষা করা হয়।

ফায়ার সার্ভিস নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে ত্রুটি ও ঝুঁকির জায়গাগুলো চিহ্নিত করে নোটিশ প্রদান এবং জরিমানা করলেও সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে কোনো ভ্রুক্ষেপ দেখা যায় না। বছরের পর বছর একই ধরনের ত্রুটি বহাল রেখে হাসপাতাল পরিচালনা করা হচ্ছে, যা রোগীদের জীবনকে জেনেশুনে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়ার শামিল। নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই যদি হাসপাতাল পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে কোনো প্রতিষ্ঠানই প্রয়োজনীয় সংস্কারে আগ্রহী হবে না।

একটি হাসপাতালকে সাধারণ আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবনের সঙ্গে তুলনা করার সুযোগ নেই। এখানে আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, অক্সিজেন ও মেডিকেল গ্যাসের লাইন এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি থাকে। এছাড়া হাসপাতালে এমন অনেক রোগী থাকেন, যারা শারীরিক অক্ষমতার কারণে নিজে হেঁটে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারেন না। ফলে সামান্য অগ্নিকাণ্ডও কয়েক মিনিটের মধ্যে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই হাসপাতাল নির্মাণের নকশা, বৈদ্যুতিক অবকাঠামো, জরুরি নির্গমন পথ, উন্নত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ধোঁয়া শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ মহড়াকে বিলাসিতা না ভেবে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তার অংশ করতে হবে。

অনেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার অজুহাত দেখিয়ে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না থাকার যুক্তি কোনোভাবেই রোগীর জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলার বৈধতা দিতে পারে না। রোগীর নিরাপত্তার চেয়ে বড় কোনো প্রশাসনিক বা আর্থিক অজুহাত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রয়োজনে ধাপে ধাপে সংস্কার, বিকল্প ভবনে স্থানান্তর বা নতুন অবকাঠামো তৈরি করে ঝুঁকি দূর করতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা সনদ বা এনওসি কঠোরভাবে বাধ্যতামূলক করা উচিত।

স্বাস্থ্যসেবা কেবল চিকিৎসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাসপাতালে আগুনে পুড়ে রোগীর মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক পরিকল্পনা, তদারকি ও জবাবদিহিতার চরম ব্যর্থতা। মানুষ যেখানে জীবন বাঁচানোর আশায় আসে, সেই স্থান যেন কোনোভাবেই নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের।