লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে কবি হওয়ার মোহ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি

বাংলাদেশে রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এক অদ্ভুত প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা এরশাদ আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিস্তৃত।

বাংলাদেশে কবি হওয়ার ঐতিহ্যবাহী পথটি এখন যেন বদলে গেছে। একসময় কবি হতে হলে বছরের পর বছর সাধনা, পাঠকের প্রত্যাখ্যান সহ্য করা এবং সাহিত্য সমাজের কঠিন পরীক্ষা পাড়ি দিতে হতো। কিন্তু বর্তমানে কবিতা নয়, বরং ক্ষমতা, পদ-পদবি, সরকারি সংবর্ধনা আর পরিচিতির সিঁড়ি ব্যবহার করে কবি হওয়ার এক নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মন্ত্রী বা এমপি হলেই কবিতা পাঠের মঞ্চের প্রয়োজন পড়ছে এবং ক্ষমতার বলয় ব্যবহার করে নিজের সাহিত্যিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার আয়োজন চলছে।

এই প্রবণতা এ দেশে নতুন নয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে ক্ষমতার সঙ্গে কবিত্বের এই অদ্ভুত মেলবন্ধন প্রথম প্রত্যক্ষ করেছিল বাংলাদেশ। তৎকালীন স্বৈরশাসক নিজেকে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে রাষ্ট্রের প্রচারযন্ত্র ও নানা সাহিত্যিক আয়োজন ব্যবহার করেছিলেন। সেই সময়ে কবি মোহাম্মদ রফিকের বিখ্যাত ‘খোলা কবিতা’ শাসকের এই কবি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষাকে তীব্র ব্যঙ্গ ও আঘাত করেছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও চরিত্র ও দল বদলে এই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

সম্প্রতি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন সাবেক এমপি ও মন্ত্রীর মধ্যেও কবি হওয়ার প্রবল আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। তাঁরা নিজেদের কবি প্রমাণ করতে এমন সব সাহিত্যিকদের কাছ থেকে স্বীকৃতি বা সার্টিফিকেট নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন, যাঁরা রাজনৈতিকভাবে তাঁদের ঘোর বিরোধী ছিলেন। এমনকি আজীবন শহীদ জিয়াউর রহমানের সমালোচনা করে কবিতা লেখা বা রাজনৈতিকভাবে জিয়া-বিরোধী অবস্থান নেওয়া আওয়ামী লীগ-সমর্থক কবিদের জন্মদিনে সংবর্ধনা দেওয়া, তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা এবং সাহিত্যিক অভিভাবক হিসেবে মেনে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে।

একজন রাজনীতিবিদের অবশ্যই কবিতা লেখার অধিকার রয়েছে। তবে সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ব্যক্তিগত কবি-পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও সরকারি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মঞ্চ ব্যবহার করা হয়। একজন মন্ত্রী যখন রাষ্ট্রের অধীন কোনো প্রতিষ্ঠানের মঞ্চে নিজের কবিতা পাঠের বড় আয়োজন করেন, তখন সেখানে স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) তৈরি হয়। এটি সাহিত্যিক অনুষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংয়ের অনুষ্ঠানে রূপ নেয়। কবিতা যেখানে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার কথা, সেখানে তা ক্ষমতার অলংকারে পরিণত হচ্ছে এবং কবিরাও সুযোগ-সুবিধার আশায় ক্ষমতার দরবারে শামিল হচ্ছেন।

কবি হওয়া কোনো সরকারি পদ বা political nomination নয়। একশোটি কবিতা লিখে বা কবিদের ডেকে সংবর্ধনা নিলেই কেউ কবি হয়ে যান না, যদি না পাঠকের কাছে তাঁর লেখার সাহিত্যিক মূল্য থাকে। কোনো মন্ত্রী বা এমপি ভালো কবিতা লিখলে তাঁকে কবি হিসেবে মেনে নিতে কোনো আপত্তি নেই, তবে তার বিচার হওয়া উচিত কেবল কবিতার মানে, রাজনৈতিক পরিচয়ে বা ক্ষমতার দাপটে নয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে নিটওয়্যার খাতে উৎপাদন ও রপ্তানি আদেশ বিপর্যয়

ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে কবি হওয়ার মোহ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:৪৫:৩৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশে কবি হওয়ার ঐতিহ্যবাহী পথটি এখন যেন বদলে গেছে। একসময় কবি হতে হলে বছরের পর বছর সাধনা, পাঠকের প্রত্যাখ্যান সহ্য করা এবং সাহিত্য সমাজের কঠিন পরীক্ষা পাড়ি দিতে হতো। কিন্তু বর্তমানে কবিতা নয়, বরং ক্ষমতা, পদ-পদবি, সরকারি সংবর্ধনা আর পরিচিতির সিঁড়ি ব্যবহার করে কবি হওয়ার এক নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মন্ত্রী বা এমপি হলেই কবিতা পাঠের মঞ্চের প্রয়োজন পড়ছে এবং ক্ষমতার বলয় ব্যবহার করে নিজের সাহিত্যিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার আয়োজন চলছে।

এই প্রবণতা এ দেশে নতুন নয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে ক্ষমতার সঙ্গে কবিত্বের এই অদ্ভুত মেলবন্ধন প্রথম প্রত্যক্ষ করেছিল বাংলাদেশ। তৎকালীন স্বৈরশাসক নিজেকে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে রাষ্ট্রের প্রচারযন্ত্র ও নানা সাহিত্যিক আয়োজন ব্যবহার করেছিলেন। সেই সময়ে কবি মোহাম্মদ রফিকের বিখ্যাত ‘খোলা কবিতা’ শাসকের এই কবি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষাকে তীব্র ব্যঙ্গ ও আঘাত করেছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও চরিত্র ও দল বদলে এই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

সম্প্রতি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন সাবেক এমপি ও মন্ত্রীর মধ্যেও কবি হওয়ার প্রবল আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। তাঁরা নিজেদের কবি প্রমাণ করতে এমন সব সাহিত্যিকদের কাছ থেকে স্বীকৃতি বা সার্টিফিকেট নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন, যাঁরা রাজনৈতিকভাবে তাঁদের ঘোর বিরোধী ছিলেন। এমনকি আজীবন শহীদ জিয়াউর রহমানের সমালোচনা করে কবিতা লেখা বা রাজনৈতিকভাবে জিয়া-বিরোধী অবস্থান নেওয়া আওয়ামী লীগ-সমর্থক কবিদের জন্মদিনে সংবর্ধনা দেওয়া, তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা এবং সাহিত্যিক অভিভাবক হিসেবে মেনে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে।

একজন রাজনীতিবিদের অবশ্যই কবিতা লেখার অধিকার রয়েছে। তবে সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ব্যক্তিগত কবি-পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও সরকারি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মঞ্চ ব্যবহার করা হয়। একজন মন্ত্রী যখন রাষ্ট্রের অধীন কোনো প্রতিষ্ঠানের মঞ্চে নিজের কবিতা পাঠের বড় আয়োজন করেন, তখন সেখানে স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) তৈরি হয়। এটি সাহিত্যিক অনুষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংয়ের অনুষ্ঠানে রূপ নেয়। কবিতা যেখানে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার কথা, সেখানে তা ক্ষমতার অলংকারে পরিণত হচ্ছে এবং কবিরাও সুযোগ-সুবিধার আশায় ক্ষমতার দরবারে শামিল হচ্ছেন।

কবি হওয়া কোনো সরকারি পদ বা political nomination নয়। একশোটি কবিতা লিখে বা কবিদের ডেকে সংবর্ধনা নিলেই কেউ কবি হয়ে যান না, যদি না পাঠকের কাছে তাঁর লেখার সাহিত্যিক মূল্য থাকে। কোনো মন্ত্রী বা এমপি ভালো কবিতা লিখলে তাঁকে কবি হিসেবে মেনে নিতে কোনো আপত্তি নেই, তবে তার বিচার হওয়া উচিত কেবল কবিতার মানে, রাজনৈতিক পরিচয়ে বা ক্ষমতার দাপটে নয়।