লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৪:৫৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এনসিটিবিতে এক বছরে ২,৭১১ কোটি টাকার ভয়াবহ দুর্নীতি

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কার্যক্রমে ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাঠ্যবই ছাপানো, বাঁধাই ও সরবরাহসহ সংশ্লিষ্ট ২৫টি খাতে মোট ২ হাজার ৭১১ কোটি ২০ লাখ ১২ হাজার ৯১৭ টাকার আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই পাঠ্যবইগুলো ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীরা হাতে পেয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্নীতির বড় একটি অংশ সংঘটিত হয়েছে পাঠ্যপুস্তকের মান নিয়ন্ত্রণ না করে অনিয়মিত ব্যয় করার মাধ্যমে। এই খাতে ১ হাজার ৭৮৫ কোটি ৮ লাখ ৮৮ হাজার ৭১১ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া চাহিদার অতিরিক্ত বই মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের কার্যাদেশ প্রদান করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৫১৬ কোটি ৩৪ লাখ ৪১ হাজার ২১১ টাকা। মুদ্রণ ও সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রাক্কলন অপেক্ষা অতিরিক্ত দরে কার্যাদেশ দেওয়ায় আরও ২১৬ কোটি ৪৯ লাখ ২৯ হাজার ৭৫৪ টাকা লোকসান হয়েছে।

বোর্ডের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও ব্যাপক অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো অনুমোদন ছাড়াই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১ কোটি ৬ লাখ ৯৩ হাজার ২৯৭ টাকা উৎসাহ ভাতা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের প্রাপ্যতাবিহীন প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা বাবদ সম্মানী দেওয়া হয়েছে ৭৬ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩ টাকা। নিয়মিত কাজের জন্য সম্মানী হিসেবে আরও ৭৯ লাখ ৭০ হাজার ৮৫০ টাকা এবং দরপত্র কমিটির সদস্যদের অবৈধ সম্মানী বাবদ ৩৫ লাখ ৩৪ হাজার ৬৮০ টাকা প্রদান করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, 'ইন্ডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডি' নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রেসের কাজ তদারকির দায়িত্ব দেওয়ার পরও এনসিটিবি নিজেরা প্রেস মনিটরিং বিল বাবদ ১ কোটি ৩৭ লাখ ২৬ হাজার ১০০ টাকা তুলে নিয়েছে, অথচ ওই প্রতিষ্ঠানকে বিল দেওয়া হয়েছে ৫৭ লাখ ১৮ হাজার ৮৯৮ টাকা। রয়্যালটি বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর যথাযথভাবে আদায় না করায় সরকারের ১২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৪৫৬ টাকা এবং ২৪ লাখ ৯০ হাজার ৭৭২ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।

অন্যান্য অনিয়মের মধ্যে রয়েছে সেসিপ প্রকল্পের কর্মকর্তাদের বিধিবহির্ভূত সম্মানী (২১ লাখ ৪০ হাজার ৯১৭ টাকা), রুটিন কাজে পরামর্শক নিয়োগ (৩২ লাখ ৬২ হাজার ৯৭০ টাকা) এবং অগ্রিম বিল সমন্বয় না করা। নিয়ম অনুযায়ী ৭ লাখ টাকার বেশি অগ্রিম গ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন থাকলেও, কর্মকর্তারা ১ কোটি ২৮ লাখ ৬১ হাজার ৫২০ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম গ্রহণ করেছেন। এছাড়া ১ জন মাত্র দরদাতা থাকা সত্ত্বেও দরপত্র বাতিল না করে কার্যাদেশ প্রদান করায় ৬১ কোটি ৮ লাখ ৮২ হাজার ৪১৫ টাকা এবং সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দেওয়ায় ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৩ হাজার ৩৪৩ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

এদিকে পাঠ্যবই কেন্দ্রিক দুর্নীতি রোধে বর্তমান সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের নির্দেশে মাঠ পর্যায়ে চাহিদা যাচাই করতে গিয়ে এনসিটিবি কর্মকর্তারা পাঠ্যবইয়ের 'ভুতুড়ে চাহিদা' ধরতে সক্ষম হন। এর ফলে চাহিদা প্রায় এক কোটি কমে যাওয়ায় সরকারি খরচ প্রায় ১৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের কাছে স্বচ্ছভাবে পৌঁছানো এবং কোনো ধরণের দুর্নীতি বা ল্যাকিংস যেন না থাকে, তা নিশ্চিত করাই বর্তমান লক্ষ্য।

প্রতিবেদন বলছে, চাহিদার অতিরিক্ত বই মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের কার্যাদেশ প্রদান করায় আর্থিক ক্ষতি হয় ৫১৬ কোটি ৩৪ লাখ ৪১ হাজার ২১১ টাকা। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক, এসএসসি, ভোকেশনাল, ইবতেদায়ী, দাখিল এবং দাখিল ভোকেশনাল স্তরের এবং ব্রেইল স্তরের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই সরবরাহ সংক্রান্ত ৭৪১টি লটের মূল্যায়ন প্রতিবেদন যাচাই করা হয়। প্রতিবেদন যাচাই করে দেখা যায় যে, ৭৪১টি লটের বিপরীতে ৩০ কোটি ৮৯ লাখ ৪০ হাজার ২৯টি বই সরবরাহের জন্য বিভিন্ন সরবরাহকারীকে ১ হাজার ৮৬২ কোটি ৩৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৪ টাকার ক্রয়াদেশ প্রদান করা হয় এবং কাজ সমাপ্তির সনদ অনুযায়ী ৩০ কোটি ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৬৯২টি বইয়ের কাজ সমাপ্ত করা হয়। কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ও সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক চাহিদাকৃত বইয়ের সংখ্যা ছিল ২১ কোটি ৯৭ লাখ ৪০ হাজার ৬১১টি এবং বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনায় বইয়ের সংখ্যা ছিল ২৪ কোটি ৪৮ লাখ ৮ হাজার ২৩৮টি।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকা সফরে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গোর

এনসিটিবিতে এক বছরে ২,৭১১ কোটি টাকার ভয়াবহ দুর্নীতি

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কার্যক্রমে ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাঠ্যবই ছাপানো, বাঁধাই ও সরবরাহসহ সংশ্লিষ্ট ২৫টি খাতে মোট ২ হাজার ৭১১ কোটি ২০ লাখ ১২ হাজার ৯১৭ টাকার আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই পাঠ্যবইগুলো ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীরা হাতে পেয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্নীতির বড় একটি অংশ সংঘটিত হয়েছে পাঠ্যপুস্তকের মান নিয়ন্ত্রণ না করে অনিয়মিত ব্যয় করার মাধ্যমে। এই খাতে ১ হাজার ৭৮৫ কোটি ৮ লাখ ৮৮ হাজার ৭১১ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া চাহিদার অতিরিক্ত বই মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের কার্যাদেশ প্রদান করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৫১৬ কোটি ৩৪ লাখ ৪১ হাজার ২১১ টাকা। মুদ্রণ ও সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রাক্কলন অপেক্ষা অতিরিক্ত দরে কার্যাদেশ দেওয়ায় আরও ২১৬ কোটি ৪৯ লাখ ২৯ হাজার ৭৫৪ টাকা লোকসান হয়েছে।

বোর্ডের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও ব্যাপক অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো অনুমোদন ছাড়াই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১ কোটি ৬ লাখ ৯৩ হাজার ২৯৭ টাকা উৎসাহ ভাতা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের প্রাপ্যতাবিহীন প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা বাবদ সম্মানী দেওয়া হয়েছে ৭৬ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩ টাকা। নিয়মিত কাজের জন্য সম্মানী হিসেবে আরও ৭৯ লাখ ৭০ হাজার ৮৫০ টাকা এবং দরপত্র কমিটির সদস্যদের অবৈধ সম্মানী বাবদ ৩৫ লাখ ৩৪ হাজার ৬৮০ টাকা প্রদান করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, 'ইন্ডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডি' নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রেসের কাজ তদারকির দায়িত্ব দেওয়ার পরও এনসিটিবি নিজেরা প্রেস মনিটরিং বিল বাবদ ১ কোটি ৩৭ লাখ ২৬ হাজার ১০০ টাকা তুলে নিয়েছে, অথচ ওই প্রতিষ্ঠানকে বিল দেওয়া হয়েছে ৫৭ লাখ ১৮ হাজার ৮৯৮ টাকা। রয়্যালটি বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর যথাযথভাবে আদায় না করায় সরকারের ১২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৪৫৬ টাকা এবং ২৪ লাখ ৯০ হাজার ৭৭২ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।

অন্যান্য অনিয়মের মধ্যে রয়েছে সেসিপ প্রকল্পের কর্মকর্তাদের বিধিবহির্ভূত সম্মানী (২১ লাখ ৪০ হাজার ৯১৭ টাকা), রুটিন কাজে পরামর্শক নিয়োগ (৩২ লাখ ৬২ হাজার ৯৭০ টাকা) এবং অগ্রিম বিল সমন্বয় না করা। নিয়ম অনুযায়ী ৭ লাখ টাকার বেশি অগ্রিম গ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন থাকলেও, কর্মকর্তারা ১ কোটি ২৮ লাখ ৬১ হাজার ৫২০ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম গ্রহণ করেছেন। এছাড়া ১ জন মাত্র দরদাতা থাকা সত্ত্বেও দরপত্র বাতিল না করে কার্যাদেশ প্রদান করায় ৬১ কোটি ৮ লাখ ৮২ হাজার ৪১৫ টাকা এবং সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দেওয়ায় ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৩ হাজার ৩৪৩ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

এদিকে পাঠ্যবই কেন্দ্রিক দুর্নীতি রোধে বর্তমান সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের নির্দেশে মাঠ পর্যায়ে চাহিদা যাচাই করতে গিয়ে এনসিটিবি কর্মকর্তারা পাঠ্যবইয়ের 'ভুতুড়ে চাহিদা' ধরতে সক্ষম হন। এর ফলে চাহিদা প্রায় এক কোটি কমে যাওয়ায় সরকারি খরচ প্রায় ১৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের কাছে স্বচ্ছভাবে পৌঁছানো এবং কোনো ধরণের দুর্নীতি বা ল্যাকিংস যেন না থাকে, তা নিশ্চিত করাই বর্তমান লক্ষ্য।

প্রতিবেদন বলছে, চাহিদার অতিরিক্ত বই মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের কার্যাদেশ প্রদান করায় আর্থিক ক্ষতি হয় ৫১৬ কোটি ৩৪ লাখ ৪১ হাজার ২১১ টাকা। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক, এসএসসি, ভোকেশনাল, ইবতেদায়ী, দাখিল এবং দাখিল ভোকেশনাল স্তরের এবং ব্রেইল স্তরের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই সরবরাহ সংক্রান্ত ৭৪১টি লটের মূল্যায়ন প্রতিবেদন যাচাই করা হয়। প্রতিবেদন যাচাই করে দেখা যায় যে, ৭৪১টি লটের বিপরীতে ৩০ কোটি ৮৯ লাখ ৪০ হাজার ২৯টি বই সরবরাহের জন্য বিভিন্ন সরবরাহকারীকে ১ হাজার ৮৬২ কোটি ৩৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৪ টাকার ক্রয়াদেশ প্রদান করা হয় এবং কাজ সমাপ্তির সনদ অনুযায়ী ৩০ কোটি ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৬৯২টি বইয়ের কাজ সমাপ্ত করা হয়। কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ও সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক চাহিদাকৃত বইয়ের সংখ্যা ছিল ২১ কোটি ৯৭ লাখ ৪০ হাজার ৬১১টি এবং বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনায় বইয়ের সংখ্যা ছিল ২৪ কোটি ৪৮ লাখ ৮ হাজার ২৩৮টি।