লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১০:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খেলাপি ঋণ উদ্ধারে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ সরকারের

দেশের ব্যাংক খাতের অন্যতম প্রধান সংকট খেলাপি ঋণ থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত করতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। খেলাপি ঋণ কেনা, আদায় এবং প্রয়োজনে জামানত বিক্রির সুযোগ রেখে ‘সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন’ বা ডামা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ইতিমধ্যে বিভাগটি সবার মতামতের জন্য আইনের খসড়া প্রকাশ করেছে।

আদালতে মামলা, সম্পদ বিক্রির দীর্ঘসূত্রতা, আইনি জটিলতা ও দুর্বল পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ বছরের পর বছর আটকে আছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ঋণ ব্যাংকের ব্যালান্স শিট দুর্বল করছে এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে, যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন, ২০২৫’ অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি, অবলোপন, পুনঃ তফসিল এবং আদালতের স্থগিতাদেশে থাকা ঋণ মিলিয়ে সংকটাপন্ন ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানিয়েছেন, তারা এই খসড়া আইনের ওপর সবার মতামত প্রত্যাশা করছেন।

প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় একটি নতুন কাঠামো তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ‘সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট’ গঠিত হবে। এই ইউনিটের লাইসেন্স নিয়ে বেসরকারি পর্যায়ে ‘সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি’ কাজ করবে। এছাড়া ঋণ আদায় ও পুনর্গঠনে সহায়তা করবে ‘লোন সার্ভিসার’ কোম্পানি। নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংক চাইলে কোম্পানির কাছে খেলাপি ঋণ বিক্রি করতে পারবে।

ইউনিটটি একটি স্বতন্ত্র আইনগত সত্তা হিসেবে কাজ করবে এবং সম্পদ অধিগ্রহণ, তদারক, লাইসেন্স প্রদান, জরিমানা আরোপ ও প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিলের ক্ষমতা পাবে। এছাড়া এটি খেলাপি সম্পদের কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার পরিচালনা করবে। কোম্পানি গঠনের জন্য কঠোর শর্ত রাখা হয়েছে, যার মধ্যে পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের ব্যাংকিং, অর্থনীতি বা আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ হতে হবে এবং পর্ষদে অন্তত ২০ শতাংশ স্বাধীন পরিচালক থাকতে হবে।

সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি শুধু ঋণ কিনবে না, বরং ঋণ পুনর্গঠন, ব্যবসা পুনর্বিন্যাস, নতুন বিনিয়োগকারী আনা, ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর কিংবা ব্যবসা ইজারা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিতে পারবে। লোন সার্ভিসার কোম্পানিগুলো ঋণগ্রহীতার সাথে সমঝোতা ও আইনি মামলায় সহায়তা করবে, তবে তারা নিজেরা মামলা করতে বা আমানত নিতে পারবে না। এছাড়া আইনে সিকিউরিটাইজেশনের সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে বিভিন্ন খেলাপি ঋণ একত্র করে বন্ড বা আর্থিক সিকিউরিটি ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করা যায়।

ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান প্রস্তাবিত ডামা আইনের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ, আইনি জটিলতা দূর করা এবং জামানত স্থানান্তরের ক্ষেত্রে স্পষ্ট সুরক্ষা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে, অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকার সময় তিনি দেখেছেন সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি আগেও দুই–তিনটা ছিল। তারা খেলাপি গ্রাহকদের সামনে গিয়ে কখনো ঢোল পেটাত, কখনো বা তাঁদের কাছে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ পাঠাত। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, অতীতের সেই দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে নতুন আইনটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরান-ওমান আলোচনার খবরে তেলের দাম হ্রাস

খেলাপি ঋণ উদ্ধারে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ সরকারের

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:১৫:২৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

দেশের ব্যাংক খাতের অন্যতম প্রধান সংকট খেলাপি ঋণ থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত করতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। খেলাপি ঋণ কেনা, আদায় এবং প্রয়োজনে জামানত বিক্রির সুযোগ রেখে ‘সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন’ বা ডামা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ইতিমধ্যে বিভাগটি সবার মতামতের জন্য আইনের খসড়া প্রকাশ করেছে।

আদালতে মামলা, সম্পদ বিক্রির দীর্ঘসূত্রতা, আইনি জটিলতা ও দুর্বল পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ বছরের পর বছর আটকে আছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ঋণ ব্যাংকের ব্যালান্স শিট দুর্বল করছে এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে, যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন, ২০২৫’ অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি, অবলোপন, পুনঃ তফসিল এবং আদালতের স্থগিতাদেশে থাকা ঋণ মিলিয়ে সংকটাপন্ন ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানিয়েছেন, তারা এই খসড়া আইনের ওপর সবার মতামত প্রত্যাশা করছেন।

প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় একটি নতুন কাঠামো তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ‘সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট’ গঠিত হবে। এই ইউনিটের লাইসেন্স নিয়ে বেসরকারি পর্যায়ে ‘সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি’ কাজ করবে। এছাড়া ঋণ আদায় ও পুনর্গঠনে সহায়তা করবে ‘লোন সার্ভিসার’ কোম্পানি। নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংক চাইলে কোম্পানির কাছে খেলাপি ঋণ বিক্রি করতে পারবে।

ইউনিটটি একটি স্বতন্ত্র আইনগত সত্তা হিসেবে কাজ করবে এবং সম্পদ অধিগ্রহণ, তদারক, লাইসেন্স প্রদান, জরিমানা আরোপ ও প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিলের ক্ষমতা পাবে। এছাড়া এটি খেলাপি সম্পদের কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার পরিচালনা করবে। কোম্পানি গঠনের জন্য কঠোর শর্ত রাখা হয়েছে, যার মধ্যে পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের ব্যাংকিং, অর্থনীতি বা আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ হতে হবে এবং পর্ষদে অন্তত ২০ শতাংশ স্বাধীন পরিচালক থাকতে হবে।

সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি শুধু ঋণ কিনবে না, বরং ঋণ পুনর্গঠন, ব্যবসা পুনর্বিন্যাস, নতুন বিনিয়োগকারী আনা, ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর কিংবা ব্যবসা ইজারা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিতে পারবে। লোন সার্ভিসার কোম্পানিগুলো ঋণগ্রহীতার সাথে সমঝোতা ও আইনি মামলায় সহায়তা করবে, তবে তারা নিজেরা মামলা করতে বা আমানত নিতে পারবে না। এছাড়া আইনে সিকিউরিটাইজেশনের সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে বিভিন্ন খেলাপি ঋণ একত্র করে বন্ড বা আর্থিক সিকিউরিটি ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করা যায়।

ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান প্রস্তাবিত ডামা আইনের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ, আইনি জটিলতা দূর করা এবং জামানত স্থানান্তরের ক্ষেত্রে স্পষ্ট সুরক্ষা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে, অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকার সময় তিনি দেখেছেন সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি আগেও দুই–তিনটা ছিল। তারা খেলাপি গ্রাহকদের সামনে গিয়ে কখনো ঢোল পেটাত, কখনো বা তাঁদের কাছে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ পাঠাত। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, অতীতের সেই দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে নতুন আইনটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।