লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পিবিআইয়ের তদন্তে নটর ডেম কলেজ কর্মী লিপিকা হত্যার রহস্য উদঘাটন

পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার একটি ভাড়া বাসার চারতলার ফ্ল্যাটে একাই ঘুমিয়ে ছিলেন লিপিকা জুলিয়ানা গমেজ (৪০)। রাত গভীর হলে ছাদ থেকে রশি বেয়ে তাঁর ফ্ল্যাটের ভেন্টিলেটর ভেঙে ভেতরে ঢোকে এক ব্যক্তি। পরে দরজা খুলে দিলে ভেতরে প্রবেশ করে আরেকজন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল চুরি করা। কিন্তু ঘুম ভেঙে লিপিকার চিৎকার শুরু করলে পরিস্থিতি বদলে যায়।

চুরি করতে আসা নজরুলের (২২) হাতে থাকা লোহার পাইপের আঘাতে রক্তাক্ত হন নটর ডেম কলেজের অফিস সহকারী লিপিকা। এরপর মাথায় বালিশ দিয়ে চেপে ধরেন জুয়েল (২১)। কিছুক্ষণের মধ্যে নিস্তেজ হয়ে পড়ে তাঁর শরীর। দুটি মুঠোফোন ও একটি হাতব্যাগ, কিছু গয়না নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে দেন ওই দুজন। ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর রাতে।

পরদিন সকালে লিপিকা কলেজে না যাওয়ায় ফোন করতে থাকেন সহকর্মীরা। খোঁজ করতে গিয়ে দুপুরের দিকে ফ্ল্যাটের ভেতর প্রবেশ করতেই মরদেহ দেখতে পান তাঁরা। এ ঘটনায় ১১ সেপ্টেম্বর সূত্রাপুর থানায় হত্যা মামলা করেন লিপিকার খালাতো ভাই প্রিন্স গমেজ। মামলার তদন্ত শুরু করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

হত্যার ১২ দিন পর ২২ সেপ্টেম্বর জুয়েল ও নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৫ সালের ৭ মে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মমিনুল ইসলাম। মামলাটি এখন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা পর্যায়ে আছে। গ্রেপ্তার দুই আসামি কারাগারে আছেন।

তদন্তে উঠে এসেছে, লিপিকার বাসায় চুরি করতে চাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল তিনি ওই বাসায় দীর্ঘদিন একাই থাকতেন। সেই তথ্য জানতেন পাশের বাসার দারোয়ানের ছেলে জুয়েল রানা। জুয়েল ও নজরুলের মধ্যে সাত–আট বছরের পরিচয়। জুয়েল বন্ধু নজরুলকে বিষয়টি জানান। তাঁদের ধারণা ছিল, লিপিকার বাসায় চুরি করলে অনেক টাকাপয়সা পাওয়া যাবে। এরপর দুজনে মিলে চুরির পরিকল্পনা করেন।

ঘটনার দুই দিন আগে ৯ সেপ্টেম্বর বাসার আশপাশ ঘুরে দেখেন তাঁরা। কীভাবে ভেতরে ঢোকা যায়, সেটিও ঠিক করেন। এরপর রাত আনুমানিক তিনটার দিকে নজরুল ছাদ দিয়ে রশির সাহায্যে লিপিকার বাসার পেছনের দিকে নামেন। ভেন্টিলেটর ভেঙে ভেতরে ঢুকে মূল দরজা খুলে জুয়েলকে বাসায় ঢোকান। দুজন তখন ঘরের বিভিন্ন জিনিস খুঁজছিলেন। একপর্যায়ে লিপিকার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি চিৎকার শুরু করলে নজরুল লোহার পাইপ দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করেন। তাৎক্ষণিকভাবে লিপিকা অচেতন হয়ে যান, রক্তপাত শুরু হয়। এরপর জুয়েল বালিশ দিয়ে রক্ত বন্ধ করতে মাথা চেপে ধরেন। পিবিআইয়ের ভাষ্য, এর পরেই লিপিকার মৃত্যু হয়।

এরপর লিপিকার দুটি মুঠোফোন ও একটি হাতব্যাগ ও কিছু গয়না নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যান তাঁরা। যাওয়ার সময় বাইরে থেকে দরজায় লিপিকার ব্যবহৃত তালা লাগিয়ে দেন। মামলার বাদী প্রিন্স গমেজ বলেন, লিপিকা এই বাসাতেই দীর্ঘদিন থাকতেন। একবার তিনি পাঁচতলা থেকে চারতলায় বাসা পরিবর্তন করেন। বাসা পরিবর্তনের সময় পাশের বাসার দারোয়ানের ছেলে জুয়েল মজুরির বিনিময়ে তাঁর কাজে সহযোগিতা করেন। তখনই তিনি জানতে পারেন, চারতলার ওই ফ্ল্যাটে লিপিকা একাই থাকেন।

পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসে, লিপিকার হাতব্যাগে ২৬ হাজার ৩৫০ টাকা ছিল। এই টাকা তাঁরা দুজন ভাগ করে নেন। পরে চুরি করা দুটি মুঠোফোনও বিক্রি করেন। ফোন দুটি সদরঘাট এলাকার শিবলু হোসেন ও জয়ের কাছে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করে সেই টাকা ভাগ করে নেন তাঁরা। লিপিকার ব্যাগে থাকা টাকা এবং মুঠোফোনের পাশাপাশি গয়না মনে করে কিছু অলংকারও নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা। পরে পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেগুলো প্রকৃত গয়না নয়। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ‘গয়না উদ্ধারের পর আমরা সেগুলো পরীক্ষা করে জানতে পারি, গয়নাগুলো ইমিটেশন ছিল। সোনা ছিল না।’

তদন্ত কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মূলত তাঁরা দুজন চুরি করার উদ্দেশ্যে ওই বাসায় ঢোকেন। একপর্যায়ে লিপিকার ঘুম ভেঙে গেলে চিৎকার শুরু করেন। এ সময় নজরুল মাথায় রড দিয়ে আঘাত করেন।’ তিনি বলেন, আসামিরা কিছু টাকা নিয়ে যান এবং সোনার গয়না মনে করে কিছু অলংকারও নিয়ে যান। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায়, সেগুলো প্রকৃত গয়না নয়। মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘দুজন আসামি আদালতে জবানবন্দি দেন। হত্যার পরে আসামিরা লুট করেন দুটি মোবাইল। আমরা ওই মোবাইলের সূত্র ধরে তদন্ত করি এবং অবস্থান শনাক্ত করে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে তাঁদের সদরঘাট ও সূত্রাপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করি। গ্রেপ্তারের সময় আসামিদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি প্লাস, দুটি স্ক্রু ড্রাইভার এবং লিপিকার চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার করা হয়।’

লিপিকা হত্যার পরও বাইরে থেকে বাসার দরজা তালাবদ্ধ ছিল। ফলে প্রথম দিকে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। বাসার কেয়ারটেকার মিতুর জবানবন্দি অনুযায়ী, ১১ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে নয়টার দিকে লিপিকার অফিসের সহকর্মী জনি তাঁকে ফোন করে জানতে চান, লিপিকা বাসায় আছেন কি না। মিতু চারতলায় গিয়ে দেখেন, ফ্ল্যাট তালাবদ্ধ। তিনি নিচে এসে জনিকে জানান, দরজা তালাবদ্ধ—সম্ভবত লিপিকা কোথাও গেছেন। পরে দুপুরে লিপিকার সহকর্মী জনি ও জয় তাঁকে খুঁজতে আসেন। তাঁরা জানান, লিপিকার মুঠোফোন বন্ধ। তবে কেয়ারটেকার মিতুর কাছে যেহেতু ফ্ল্যাটের একটি চাবি ছিল, তাই তাঁরা দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার সিদ্ধান্ত নেন।

মিতুর জবানবন্দি অনুযায়ী, তিনি, জনি ও জয় তিনজন মিলে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন। ড্রয়িংরুমে আলো দেখতে পান তাঁরা। এরপর উত্তর দিকের জানালার ওপর ভেন্টিলেটর ভাঙা দেখতে পান। শয়নকক্ষে গিয়ে দেখেন, লিপিকা খাটের ওপর দক্ষিণ শিয়রে ডান কাত হয়ে শুয়ে আছেন। তাঁর মাথার নিচে ও ওপরে বালিশ। ডাকাডাকি করেও সাড়া না পাওয়ায় মিতু মাথার ওপর থেকে বালিশটি সরান। তখনই দেখা যায়, লিপিকার মাথার বাঁ পাশে রক্তাক্ত জখম। এ সময় ঘাবড়ে যান সবাই। আবার ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে বুঝতে পারেন, তিনি মারা গেছেন।

মিতু প্রথম আলোকে বলেন, ম্যাডাম আগে পাঁচতলায় থাকতেন। পরে চারতলার ফ্ল্যাটে আসেন। বাসা চেঞ্জ করার সময় পাশের বাসার দারোয়ানের ছেলে জুয়েলের সহায়তা নেন ম্যাডাম। তখনই হয়তো জুয়েল ম্যাডাম সম্পর্কে ধারণা করেছিল। তিনি জানান, এক মাস আগে তিনি ওই বাসার কেয়ারটেকারের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন।

লিপিকা গমেজের খালাতো ভাই প্রিন্স গমেজ জানান, লিপিকা জুলিয়ানা গমেজ ১৯৯৪ সালে বিয়ে করেছিলেন। পরে পড়াশোনার জন্য লন্ডনে যান। দেশে ফেরার কয়েক বছর পর ২০০০ সালে তাঁর বিচ্ছেদ হয়। এরপর আর বিয়ে করেননি। তাঁর কোনো সন্তানও ছিল না। মামলার বাদীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে লিপিকা ওই বাসায় তাঁর ঠাকুরমার সঙ্গে থাকতেন। ঠাকুরমা মারা গেলে একাই থাকতেন তিনি। পারিবারিকভাবে বিত্তশালী ছিলেন লিপিকা। বাবা ও বড় বোন মারা গেছেন অনেক আগে। মা থাকতেন গ্রামের বাড়িতে। ২০১৬ সালের মার্চে নটর ডেম কলেজে অফিস সহকারী হিসেবে যোগ দেন তিনি।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জুয়েল রানা বলেন, ঘটনার দুই দিন আগে ৯ সেপ্টেম্বর তিনি বন্ধু নজরুলকে জানান, তাঁদের বাড়ির পাশে একজন নারী একা থাকেন। সেখানে চুরি করলে টাকাপয়সা পাওয়া যেতে পারে। এরপর তাঁরা ঘটনাস্থলের আশপাশ ঘুরে দেখেন। ঘটনার দিন ২০০ টাকা দিয়ে একটি নোস প্লায়ার্স নিয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে যান। রাত তিনটার মধ্যে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করেন। নজরুল আগে ভেতরে ঢোকেন। পরে জুয়েলও ঢোকেন। ঘরে গিয়ে তাঁরা মানিব্যাগ ও ভ্যানিটি ব্যাগ পান। একটি লাল বক্সও বের করেন। লিপিকার মাথার কাছ থেকে একটি দুল নেওয়ার সময় তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। তখন লিপিকা ‘কে কে’ বলে চিৎকার করতে থাকেন। জুয়েলের জবানবন্দি অনুযায়ী, নজরুল লাঠি দিয়ে লিপিকার মাথায় আঘাত করেন। আর জুয়েল বালিশ দিয়ে লিপিকার মাথা চেপে ধরেন। এরপর বেশি রক্তপাত দেখে ঘরের দরজা বন্ধ করে বের হয়ে যান। টাকাপয়সা ভাগ করে নেন। রশিসহ কিছু জিনিস বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেন। জুয়েলের জবানবন্দি অনুযায়ী, নজরুল তাঁকে ২৬ হাজার টাকার মধ্যে ১৬ হাজার টাকা দেন। একই জবানবন্দি দেন আসামি নজরুল।

মামলার বাদী প্রিন্স গমেজ বলেন, প্রশাসন ভালোভাবে সহযোগিতা করায় এই চাঞ্চল্যকর মামলার দ্রুত শুনানি হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ২১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রয়াণের ২৭ বছর: খলনায়ক থেকে যেভাবে জসীম হয়ে উঠেছিলেন ঢাকাই সিনেমার কিংবদন্তি নায়ক

পিবিআইয়ের তদন্তে নটর ডেম কলেজ কর্মী লিপিকা হত্যার রহস্য উদঘাটন

প্রকাশিত হয়েছে: ১০:০০:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার একটি ভাড়া বাসার চারতলার ফ্ল্যাটে একাই ঘুমিয়ে ছিলেন লিপিকা জুলিয়ানা গমেজ (৪০)। রাত গভীর হলে ছাদ থেকে রশি বেয়ে তাঁর ফ্ল্যাটের ভেন্টিলেটর ভেঙে ভেতরে ঢোকে এক ব্যক্তি। পরে দরজা খুলে দিলে ভেতরে প্রবেশ করে আরেকজন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল চুরি করা। কিন্তু ঘুম ভেঙে লিপিকার চিৎকার শুরু করলে পরিস্থিতি বদলে যায়।

চুরি করতে আসা নজরুলের (২২) হাতে থাকা লোহার পাইপের আঘাতে রক্তাক্ত হন নটর ডেম কলেজের অফিস সহকারী লিপিকা। এরপর মাথায় বালিশ দিয়ে চেপে ধরেন জুয়েল (২১)। কিছুক্ষণের মধ্যে নিস্তেজ হয়ে পড়ে তাঁর শরীর। দুটি মুঠোফোন ও একটি হাতব্যাগ, কিছু গয়না নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে দেন ওই দুজন। ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর রাতে।

পরদিন সকালে লিপিকা কলেজে না যাওয়ায় ফোন করতে থাকেন সহকর্মীরা। খোঁজ করতে গিয়ে দুপুরের দিকে ফ্ল্যাটের ভেতর প্রবেশ করতেই মরদেহ দেখতে পান তাঁরা। এ ঘটনায় ১১ সেপ্টেম্বর সূত্রাপুর থানায় হত্যা মামলা করেন লিপিকার খালাতো ভাই প্রিন্স গমেজ। মামলার তদন্ত শুরু করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

হত্যার ১২ দিন পর ২২ সেপ্টেম্বর জুয়েল ও নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৫ সালের ৭ মে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মমিনুল ইসলাম। মামলাটি এখন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা পর্যায়ে আছে। গ্রেপ্তার দুই আসামি কারাগারে আছেন।

তদন্তে উঠে এসেছে, লিপিকার বাসায় চুরি করতে চাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল তিনি ওই বাসায় দীর্ঘদিন একাই থাকতেন। সেই তথ্য জানতেন পাশের বাসার দারোয়ানের ছেলে জুয়েল রানা। জুয়েল ও নজরুলের মধ্যে সাত–আট বছরের পরিচয়। জুয়েল বন্ধু নজরুলকে বিষয়টি জানান। তাঁদের ধারণা ছিল, লিপিকার বাসায় চুরি করলে অনেক টাকাপয়সা পাওয়া যাবে। এরপর দুজনে মিলে চুরির পরিকল্পনা করেন।

ঘটনার দুই দিন আগে ৯ সেপ্টেম্বর বাসার আশপাশ ঘুরে দেখেন তাঁরা। কীভাবে ভেতরে ঢোকা যায়, সেটিও ঠিক করেন। এরপর রাত আনুমানিক তিনটার দিকে নজরুল ছাদ দিয়ে রশির সাহায্যে লিপিকার বাসার পেছনের দিকে নামেন। ভেন্টিলেটর ভেঙে ভেতরে ঢুকে মূল দরজা খুলে জুয়েলকে বাসায় ঢোকান। দুজন তখন ঘরের বিভিন্ন জিনিস খুঁজছিলেন। একপর্যায়ে লিপিকার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি চিৎকার শুরু করলে নজরুল লোহার পাইপ দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করেন। তাৎক্ষণিকভাবে লিপিকা অচেতন হয়ে যান, রক্তপাত শুরু হয়। এরপর জুয়েল বালিশ দিয়ে রক্ত বন্ধ করতে মাথা চেপে ধরেন। পিবিআইয়ের ভাষ্য, এর পরেই লিপিকার মৃত্যু হয়।

এরপর লিপিকার দুটি মুঠোফোন ও একটি হাতব্যাগ ও কিছু গয়না নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যান তাঁরা। যাওয়ার সময় বাইরে থেকে দরজায় লিপিকার ব্যবহৃত তালা লাগিয়ে দেন। মামলার বাদী প্রিন্স গমেজ বলেন, লিপিকা এই বাসাতেই দীর্ঘদিন থাকতেন। একবার তিনি পাঁচতলা থেকে চারতলায় বাসা পরিবর্তন করেন। বাসা পরিবর্তনের সময় পাশের বাসার দারোয়ানের ছেলে জুয়েল মজুরির বিনিময়ে তাঁর কাজে সহযোগিতা করেন। তখনই তিনি জানতে পারেন, চারতলার ওই ফ্ল্যাটে লিপিকা একাই থাকেন।

পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসে, লিপিকার হাতব্যাগে ২৬ হাজার ৩৫০ টাকা ছিল। এই টাকা তাঁরা দুজন ভাগ করে নেন। পরে চুরি করা দুটি মুঠোফোনও বিক্রি করেন। ফোন দুটি সদরঘাট এলাকার শিবলু হোসেন ও জয়ের কাছে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করে সেই টাকা ভাগ করে নেন তাঁরা। লিপিকার ব্যাগে থাকা টাকা এবং মুঠোফোনের পাশাপাশি গয়না মনে করে কিছু অলংকারও নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা। পরে পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেগুলো প্রকৃত গয়না নয়। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ‘গয়না উদ্ধারের পর আমরা সেগুলো পরীক্ষা করে জানতে পারি, গয়নাগুলো ইমিটেশন ছিল। সোনা ছিল না।’

তদন্ত কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মূলত তাঁরা দুজন চুরি করার উদ্দেশ্যে ওই বাসায় ঢোকেন। একপর্যায়ে লিপিকার ঘুম ভেঙে গেলে চিৎকার শুরু করেন। এ সময় নজরুল মাথায় রড দিয়ে আঘাত করেন।’ তিনি বলেন, আসামিরা কিছু টাকা নিয়ে যান এবং সোনার গয়না মনে করে কিছু অলংকারও নিয়ে যান। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায়, সেগুলো প্রকৃত গয়না নয়। মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘দুজন আসামি আদালতে জবানবন্দি দেন। হত্যার পরে আসামিরা লুট করেন দুটি মোবাইল। আমরা ওই মোবাইলের সূত্র ধরে তদন্ত করি এবং অবস্থান শনাক্ত করে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে তাঁদের সদরঘাট ও সূত্রাপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করি। গ্রেপ্তারের সময় আসামিদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি প্লাস, দুটি স্ক্রু ড্রাইভার এবং লিপিকার চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার করা হয়।’

লিপিকা হত্যার পরও বাইরে থেকে বাসার দরজা তালাবদ্ধ ছিল। ফলে প্রথম দিকে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। বাসার কেয়ারটেকার মিতুর জবানবন্দি অনুযায়ী, ১১ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে নয়টার দিকে লিপিকার অফিসের সহকর্মী জনি তাঁকে ফোন করে জানতে চান, লিপিকা বাসায় আছেন কি না। মিতু চারতলায় গিয়ে দেখেন, ফ্ল্যাট তালাবদ্ধ। তিনি নিচে এসে জনিকে জানান, দরজা তালাবদ্ধ—সম্ভবত লিপিকা কোথাও গেছেন। পরে দুপুরে লিপিকার সহকর্মী জনি ও জয় তাঁকে খুঁজতে আসেন। তাঁরা জানান, লিপিকার মুঠোফোন বন্ধ। তবে কেয়ারটেকার মিতুর কাছে যেহেতু ফ্ল্যাটের একটি চাবি ছিল, তাই তাঁরা দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার সিদ্ধান্ত নেন।

মিতুর জবানবন্দি অনুযায়ী, তিনি, জনি ও জয় তিনজন মিলে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন। ড্রয়িংরুমে আলো দেখতে পান তাঁরা। এরপর উত্তর দিকের জানালার ওপর ভেন্টিলেটর ভাঙা দেখতে পান। শয়নকক্ষে গিয়ে দেখেন, লিপিকা খাটের ওপর দক্ষিণ শিয়রে ডান কাত হয়ে শুয়ে আছেন। তাঁর মাথার নিচে ও ওপরে বালিশ। ডাকাডাকি করেও সাড়া না পাওয়ায় মিতু মাথার ওপর থেকে বালিশটি সরান। তখনই দেখা যায়, লিপিকার মাথার বাঁ পাশে রক্তাক্ত জখম। এ সময় ঘাবড়ে যান সবাই। আবার ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে বুঝতে পারেন, তিনি মারা গেছেন।

মিতু প্রথম আলোকে বলেন, ম্যাডাম আগে পাঁচতলায় থাকতেন। পরে চারতলার ফ্ল্যাটে আসেন। বাসা চেঞ্জ করার সময় পাশের বাসার দারোয়ানের ছেলে জুয়েলের সহায়তা নেন ম্যাডাম। তখনই হয়তো জুয়েল ম্যাডাম সম্পর্কে ধারণা করেছিল। তিনি জানান, এক মাস আগে তিনি ওই বাসার কেয়ারটেকারের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন।

লিপিকা গমেজের খালাতো ভাই প্রিন্স গমেজ জানান, লিপিকা জুলিয়ানা গমেজ ১৯৯৪ সালে বিয়ে করেছিলেন। পরে পড়াশোনার জন্য লন্ডনে যান। দেশে ফেরার কয়েক বছর পর ২০০০ সালে তাঁর বিচ্ছেদ হয়। এরপর আর বিয়ে করেননি। তাঁর কোনো সন্তানও ছিল না। মামলার বাদীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে লিপিকা ওই বাসায় তাঁর ঠাকুরমার সঙ্গে থাকতেন। ঠাকুরমা মারা গেলে একাই থাকতেন তিনি। পারিবারিকভাবে বিত্তশালী ছিলেন লিপিকা। বাবা ও বড় বোন মারা গেছেন অনেক আগে। মা থাকতেন গ্রামের বাড়িতে। ২০১৬ সালের মার্চে নটর ডেম কলেজে অফিস সহকারী হিসেবে যোগ দেন তিনি।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জুয়েল রানা বলেন, ঘটনার দুই দিন আগে ৯ সেপ্টেম্বর তিনি বন্ধু নজরুলকে জানান, তাঁদের বাড়ির পাশে একজন নারী একা থাকেন। সেখানে চুরি করলে টাকাপয়সা পাওয়া যেতে পারে। এরপর তাঁরা ঘটনাস্থলের আশপাশ ঘুরে দেখেন। ঘটনার দিন ২০০ টাকা দিয়ে একটি নোস প্লায়ার্স নিয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে যান। রাত তিনটার মধ্যে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করেন। নজরুল আগে ভেতরে ঢোকেন। পরে জুয়েলও ঢোকেন। ঘরে গিয়ে তাঁরা মানিব্যাগ ও ভ্যানিটি ব্যাগ পান। একটি লাল বক্সও বের করেন। লিপিকার মাথার কাছ থেকে একটি দুল নেওয়ার সময় তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। তখন লিপিকা ‘কে কে’ বলে চিৎকার করতে থাকেন। জুয়েলের জবানবন্দি অনুযায়ী, নজরুল লাঠি দিয়ে লিপিকার মাথায় আঘাত করেন। আর জুয়েল বালিশ দিয়ে লিপিকার মাথা চেপে ধরেন। এরপর বেশি রক্তপাত দেখে ঘরের দরজা বন্ধ করে বের হয়ে যান। টাকাপয়সা ভাগ করে নেন। রশিসহ কিছু জিনিস বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেন। জুয়েলের জবানবন্দি অনুযায়ী, নজরুল তাঁকে ২৬ হাজার টাকার মধ্যে ১৬ হাজার টাকা দেন। একই জবানবন্দি দেন আসামি নজরুল।

মামলার বাদী প্রিন্স গমেজ বলেন, প্রশাসন ভালোভাবে সহযোগিতা করায় এই চাঞ্চল্যকর মামলার দ্রুত শুনানি হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ২১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।