লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই অভ্যুত্থান: মামলার চাপে ও শাস্তির মুখে দেড় হাজার পুলিশ সদস্য

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর অভিযোগে পুলিশের ১ হাজার ৪৯০ জন সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এই মামলার জেরে বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে বড় ধরনের প্রশাসনিক পরিবর্তন এসেছে। এখন পর্যন্ত ৬৮ জন পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং ৫৭ জন এখনো পলাতক রয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক আইজিপি, অতিরিক্ত আইজিপি, মহানগর পুলিশ কমিশনার, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও রয়েছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানের পর সারা দেশে ১৩৭ জন পুলিশ সদস্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন, যার মধ্যে ৮০ জন পর্যায়ক্রমে ফিরে এলেও ৫৭ জন এখনো পলাতক। পলাতক সদস্যদের মধ্যে ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, এএসপি, পরিদর্শক, এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল রয়েছেন। পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২৫ বছরের কম চাকরির বয়সের পলাতকদের বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে এবং ২৫ বছরের বেশি বয়সের পলাতকদের সরাসরি চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনিক শাস্তির আওতায় এখন পর্যন্ত ১৪১ জন পুলিশ সদস্যকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৩ জুলাই ১৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে এই তালিকায় রাখা হয়। এর আগে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫৬ জন এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর আরও ৮৫ জন কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া পলায়নের অভিযোগে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী ৯৩ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ জন ডিআইজি, ১২ জন অতিরিক্ত ডিআইজি, ৩২ জন পুলিশ সুপার, ২৫ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ১৭ জন এএসপি রয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন পদমর্যাদার আরও ১৪২ জনকে ওএসডি বা বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে হওয়া মামলায় আরও ২৬ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

শাস্তির মুখে থাকা পুলিশ সদস্যদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, প্রকৃত সম্পৃক্ততা যাচাই না করেই অনেককে মামলায় আসামি করা হয়েছে। অনেকে ঘটনাস্থলে ছিলেন না, কারও ডিউটি রোস্টারে নাম ছিল না, আবার কেউ অন্য ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা রাজনৈতিক প্রভাবেও অনেক নির্দোষ কর্মকর্তা শাস্তির শিকার হচ্ছেন বলে তাদের দাবি। সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি রেবেকা সুলতানা জানান, মিথ্যা অভিযোগ সাজিয়ে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, অথচ ওই দিন তাঁর কোনো ডিউটি ছিল না।

পুলিশের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করেন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে জড়িতদের বিচার হওয়া জরুরি। তবে সাবেক আইজিপি মো. আবদুল কাইয়ুমের মতে, যথাযথ অনুসন্ধান ছাড়া ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়, যাতে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি প্রমোশন বা চাকরি থেকে বঞ্চিত না হন। এদিকে সিআইডি প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়াসহ কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলেও তাদের এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলে পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ কয়েকজন দণ্ডিত হয়েছেন। এছাড়া রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম। অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বাহিনীর বাইরে চলে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

গ্রাম আদালতের ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে ঢাকায় প্রশিক্ষণ শুরু

জুলাই অভ্যুত্থান: মামলার চাপে ও শাস্তির মুখে দেড় হাজার পুলিশ সদস্য

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:১৮:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর অভিযোগে পুলিশের ১ হাজার ৪৯০ জন সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এই মামলার জেরে বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে বড় ধরনের প্রশাসনিক পরিবর্তন এসেছে। এখন পর্যন্ত ৬৮ জন পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং ৫৭ জন এখনো পলাতক রয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক আইজিপি, অতিরিক্ত আইজিপি, মহানগর পুলিশ কমিশনার, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও রয়েছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানের পর সারা দেশে ১৩৭ জন পুলিশ সদস্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন, যার মধ্যে ৮০ জন পর্যায়ক্রমে ফিরে এলেও ৫৭ জন এখনো পলাতক। পলাতক সদস্যদের মধ্যে ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, এএসপি, পরিদর্শক, এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল রয়েছেন। পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২৫ বছরের কম চাকরির বয়সের পলাতকদের বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে এবং ২৫ বছরের বেশি বয়সের পলাতকদের সরাসরি চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনিক শাস্তির আওতায় এখন পর্যন্ত ১৪১ জন পুলিশ সদস্যকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৩ জুলাই ১৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে এই তালিকায় রাখা হয়। এর আগে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫৬ জন এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর আরও ৮৫ জন কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া পলায়নের অভিযোগে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী ৯৩ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ জন ডিআইজি, ১২ জন অতিরিক্ত ডিআইজি, ৩২ জন পুলিশ সুপার, ২৫ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ১৭ জন এএসপি রয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন পদমর্যাদার আরও ১৪২ জনকে ওএসডি বা বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে হওয়া মামলায় আরও ২৬ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

শাস্তির মুখে থাকা পুলিশ সদস্যদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, প্রকৃত সম্পৃক্ততা যাচাই না করেই অনেককে মামলায় আসামি করা হয়েছে। অনেকে ঘটনাস্থলে ছিলেন না, কারও ডিউটি রোস্টারে নাম ছিল না, আবার কেউ অন্য ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা রাজনৈতিক প্রভাবেও অনেক নির্দোষ কর্মকর্তা শাস্তির শিকার হচ্ছেন বলে তাদের দাবি। সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি রেবেকা সুলতানা জানান, মিথ্যা অভিযোগ সাজিয়ে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, অথচ ওই দিন তাঁর কোনো ডিউটি ছিল না।

পুলিশের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করেন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে জড়িতদের বিচার হওয়া জরুরি। তবে সাবেক আইজিপি মো. আবদুল কাইয়ুমের মতে, যথাযথ অনুসন্ধান ছাড়া ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়, যাতে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি প্রমোশন বা চাকরি থেকে বঞ্চিত না হন। এদিকে সিআইডি প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়াসহ কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলেও তাদের এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলে পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ কয়েকজন দণ্ডিত হয়েছেন। এছাড়া রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম। অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বাহিনীর বাইরে চলে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।