লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৬:০২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বোর্হেসকে লেখা সুসান সন্টাগের চিঠিতে বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ

সুসান সন্টাগ বেঁচে থাকলে এখন তাঁর বয়স হতো ৯৫ বছর। তাঁর প্রজ্ঞা, বাক্‌শক্তি ও বুদ্ধিমত্তার পাশাপাশি অসাধারণ রুচিবোধ তাঁর লেখাকে দীর্ঘস্থায়ী করে রেখেছে। ভালো জিনিস চিনে নেওয়ার এবং তা নিয়ে কথা বলার এক অনন্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। ‘ক্যাম্প’ প্রসঙ্গে তিনি একবার বলেছিলেন, এটি হলো ‘খারাপ রুচির ভালো রুচি’। প্রচলিত মানদণ্ডে মূল্য না থাকলেও কোনো কিছুর অদ্ভুত সৌন্দর্য বা কৃত্রিমতার ভেতরের আনন্দ চিনে নেওয়ার চোখ তাঁর ছিল। এই রুচিবোধের কারণেই তিনি হোর্সে লুইস বোর্হেসকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন।

বোর্হেস কেবল তাঁর সাহিত্যিক অনুরাগের জায়গা ছিলেন না, ছিলেন তাঁর এক পরম বন্ধুও। বোর্হেসের মৃত্যুর দশ বছর পর তাঁর স্মৃতির উদ্দেশে একটি চিঠি লিখেছিলেন সন্টাগ। মৃত বন্ধুকে লেখা সেই চিঠিতে একদিকে যেমন ছিল হারানোর বেদনা ও সাহিত্যের প্রতি গভীর প্রেম, অন্যদিকে ছিল বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর উদ্বেগ। সন্টাগের এই চিঠিটি ২০০১ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধসংকলন ‘হোয়্যার দ্য স্ট্রেস ফল্‌স: এসেইজ’-এ স্থান পায়, যা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

চিঠিতে সন্টাগ আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, বই যখন খুব সহজে মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে এবং লেখা যখন মুহূর্তে পরিবর্তন বা সম্পাদনা করা যাবে, তখন মানুষের ভেতরের নীরব জগৎ বা ‘ইনওয়ার্ডনেস’ (অন্তর্জগৎ) ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে পারে। বইয়ের স্থান দখল করতে পারে এমন এক ‘টেক্সট’, যার সঙ্গে মানুষের কেবল প্রয়োজন ও ব্যবহারের সম্পর্ক থাকবে। শেষ পর্যন্ত লিখিত শব্দও হয়ে উঠতে পারে বিজ্ঞাপন ও পর্দা-নির্ভর বাস্তবতার অংশ।

বোর্হেসকে স্মরণ করে সন্টাগ লিখেছিলেন, সময়ের হিসেবে দশ বছর হয়তো সামান্য, কিন্তু প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতি মাপতে গেলে এটি এক দীর্ঘ শূন্যতা। সমকালীন লেখকদের মধ্যে বোর্হেসকে তিনি সাহিত্যিক অমরত্বের অধিকারী বলে মনে করতেন, যিনি নিজের সময় ও সংস্কৃতিকে অতিক্রম করতে পেরেছিলেন। সন্টাগের চোখে বোর্হেস ছিলেন আত্মমুগ্ধতাহীন, স্বচ্ছ এবং অত্যন্ত শিল্পসচেতন এক লেখক। তিনি নিজেকে এমনভাবে বিচ্ছিন্ন ও সংযত রেখেছিলেন যে অন্য সময়ের এক মানসিক ভ্রমণকারী হয়ে উঠেছিলেন।

বোর্হেস সময়কে অন্যদের মতো দেখতেন না। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে তিনি আলাদা ঘরে ভাগ করতে চাননি। তিনি প্রায়ই রবার্ট ব্রাউনিংয়ের একটি উক্তি মনে করিয়ে দিয়ে বলতেন, বর্তমান হলো সেই ক্ষণ, যখন ভবিষ্যৎ ধীরে ধীরে অতীতে ভেঙে পড়ে। বোর্হেসের এই বিনয় ও হতাশা ছিল অত্যন্ত সৃষ্টিশীল। তিনি জানতেন পৃথিবী কতটা ভয়াবহ, কিন্তু সেই মোহমুক্ততাকে তিনি অসুখী হওয়ার কারণ হতে দেননি, বরং তাকে কল্পনার সম্পদে পরিণত করেছিলেন। নিজের অন্ধত্বকেও তিনি সম্পদে রূপ দিয়েছিলেন।

১৯৮২ সালে বোর্হেসের মৃত্যুর চার বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে সন্টাগ বলেছিলেন, জীবিত লেখকদের মধ্যে অন্য লেখকদের কাছে বোর্হেসের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কেউ নেই। সন্টাগ মনে করতেন, মানুষ যা কিছু অর্জন করেছে তার প্রায় সবকিছুর জন্যই সাহিত্যের কাছে ঋণী। বই হারিয়ে গেলে history বা ইতিহাসও হারিয়ে যাবে, আর মানুষ হারাবে তার নিজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বইকে তিনি কেবল স্বপ্ন ও স্মৃতির সংগ্রহ নয়, বরং সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার একটি পদ্ধতি হিসেবে দেখতেন।

চিঠিতে বোর্হেসকে একটি দুঃসংবাদ দিয়ে সন্টাগ লিখেছিলেন যে, বই এখন এক বিপন্ন প্রজাতি। শুধু মুদ্রিত বই নয়, সাহিত্যের জন্ম ও আত্মিক প্রভাবের জন্য প্রয়োজনীয় পাঠের পরিবেশও আজ হুমকির মুখে। ‘বুকস্ক্রিন’ ও পর্দায় পড়ার এই নতুন প্রযুক্তিকে ‘গণতান্ত্রিক’ বলা হলেও, সন্টাগ ভয় পেয়েছিলেন যে মানুষ তাঁর পড়ার নীরবতা ও অন্তর্জগৎ হারিয়ে ফেলবে। বর্বরদের আর বই পুড়িয়ে ফেলার প্রয়োজন নেই, কারণ ‘বাঘটি ইতিমধ্যেই গ্রন্থাগারে ঢুকে পড়েছে’। তা সত্ত্বেও সন্টাগ বিশ্বাস করতেন, কিছু মানুষ চিরকালই সেই মহান গ্রন্থাগার ও নীরব পাঠের কাছে ফিরে যাবে, যেখানে বোর্হেস থাকবেন তাদের নায়ক ও পৃষ্ঠপোষক হয়ে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বান্দরবানে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৯ সড়ক দ্রুত মেরামতের নির্দেশ মন্ত্রীর

বোর্হেসকে লেখা সুসান সন্টাগের চিঠিতে বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৯:৩৪:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সুসান সন্টাগ বেঁচে থাকলে এখন তাঁর বয়স হতো ৯৫ বছর। তাঁর প্রজ্ঞা, বাক্‌শক্তি ও বুদ্ধিমত্তার পাশাপাশি অসাধারণ রুচিবোধ তাঁর লেখাকে দীর্ঘস্থায়ী করে রেখেছে। ভালো জিনিস চিনে নেওয়ার এবং তা নিয়ে কথা বলার এক অনন্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। ‘ক্যাম্প’ প্রসঙ্গে তিনি একবার বলেছিলেন, এটি হলো ‘খারাপ রুচির ভালো রুচি’। প্রচলিত মানদণ্ডে মূল্য না থাকলেও কোনো কিছুর অদ্ভুত সৌন্দর্য বা কৃত্রিমতার ভেতরের আনন্দ চিনে নেওয়ার চোখ তাঁর ছিল। এই রুচিবোধের কারণেই তিনি হোর্সে লুইস বোর্হেসকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন।

বোর্হেস কেবল তাঁর সাহিত্যিক অনুরাগের জায়গা ছিলেন না, ছিলেন তাঁর এক পরম বন্ধুও। বোর্হেসের মৃত্যুর দশ বছর পর তাঁর স্মৃতির উদ্দেশে একটি চিঠি লিখেছিলেন সন্টাগ। মৃত বন্ধুকে লেখা সেই চিঠিতে একদিকে যেমন ছিল হারানোর বেদনা ও সাহিত্যের প্রতি গভীর প্রেম, অন্যদিকে ছিল বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর উদ্বেগ। সন্টাগের এই চিঠিটি ২০০১ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধসংকলন ‘হোয়্যার দ্য স্ট্রেস ফল্‌স: এসেইজ’-এ স্থান পায়, যা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

চিঠিতে সন্টাগ আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, বই যখন খুব সহজে মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে এবং লেখা যখন মুহূর্তে পরিবর্তন বা সম্পাদনা করা যাবে, তখন মানুষের ভেতরের নীরব জগৎ বা ‘ইনওয়ার্ডনেস’ (অন্তর্জগৎ) ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে পারে। বইয়ের স্থান দখল করতে পারে এমন এক ‘টেক্সট’, যার সঙ্গে মানুষের কেবল প্রয়োজন ও ব্যবহারের সম্পর্ক থাকবে। শেষ পর্যন্ত লিখিত শব্দও হয়ে উঠতে পারে বিজ্ঞাপন ও পর্দা-নির্ভর বাস্তবতার অংশ।

বোর্হেসকে স্মরণ করে সন্টাগ লিখেছিলেন, সময়ের হিসেবে দশ বছর হয়তো সামান্য, কিন্তু প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতি মাপতে গেলে এটি এক দীর্ঘ শূন্যতা। সমকালীন লেখকদের মধ্যে বোর্হেসকে তিনি সাহিত্যিক অমরত্বের অধিকারী বলে মনে করতেন, যিনি নিজের সময় ও সংস্কৃতিকে অতিক্রম করতে পেরেছিলেন। সন্টাগের চোখে বোর্হেস ছিলেন আত্মমুগ্ধতাহীন, স্বচ্ছ এবং অত্যন্ত শিল্পসচেতন এক লেখক। তিনি নিজেকে এমনভাবে বিচ্ছিন্ন ও সংযত রেখেছিলেন যে অন্য সময়ের এক মানসিক ভ্রমণকারী হয়ে উঠেছিলেন।

বোর্হেস সময়কে অন্যদের মতো দেখতেন না। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে তিনি আলাদা ঘরে ভাগ করতে চাননি। তিনি প্রায়ই রবার্ট ব্রাউনিংয়ের একটি উক্তি মনে করিয়ে দিয়ে বলতেন, বর্তমান হলো সেই ক্ষণ, যখন ভবিষ্যৎ ধীরে ধীরে অতীতে ভেঙে পড়ে। বোর্হেসের এই বিনয় ও হতাশা ছিল অত্যন্ত সৃষ্টিশীল। তিনি জানতেন পৃথিবী কতটা ভয়াবহ, কিন্তু সেই মোহমুক্ততাকে তিনি অসুখী হওয়ার কারণ হতে দেননি, বরং তাকে কল্পনার সম্পদে পরিণত করেছিলেন। নিজের অন্ধত্বকেও তিনি সম্পদে রূপ দিয়েছিলেন।

১৯৮২ সালে বোর্হেসের মৃত্যুর চার বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে সন্টাগ বলেছিলেন, জীবিত লেখকদের মধ্যে অন্য লেখকদের কাছে বোর্হেসের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কেউ নেই। সন্টাগ মনে করতেন, মানুষ যা কিছু অর্জন করেছে তার প্রায় সবকিছুর জন্যই সাহিত্যের কাছে ঋণী। বই হারিয়ে গেলে history বা ইতিহাসও হারিয়ে যাবে, আর মানুষ হারাবে তার নিজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বইকে তিনি কেবল স্বপ্ন ও স্মৃতির সংগ্রহ নয়, বরং সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার একটি পদ্ধতি হিসেবে দেখতেন।

চিঠিতে বোর্হেসকে একটি দুঃসংবাদ দিয়ে সন্টাগ লিখেছিলেন যে, বই এখন এক বিপন্ন প্রজাতি। শুধু মুদ্রিত বই নয়, সাহিত্যের জন্ম ও আত্মিক প্রভাবের জন্য প্রয়োজনীয় পাঠের পরিবেশও আজ হুমকির মুখে। ‘বুকস্ক্রিন’ ও পর্দায় পড়ার এই নতুন প্রযুক্তিকে ‘গণতান্ত্রিক’ বলা হলেও, সন্টাগ ভয় পেয়েছিলেন যে মানুষ তাঁর পড়ার নীরবতা ও অন্তর্জগৎ হারিয়ে ফেলবে। বর্বরদের আর বই পুড়িয়ে ফেলার প্রয়োজন নেই, কারণ ‘বাঘটি ইতিমধ্যেই গ্রন্থাগারে ঢুকে পড়েছে’। তা সত্ত্বেও সন্টাগ বিশ্বাস করতেন, কিছু মানুষ চিরকালই সেই মহান গ্রন্থাগার ও নীরব পাঠের কাছে ফিরে যাবে, যেখানে বোর্হেস থাকবেন তাদের নায়ক ও পৃষ্ঠপোষক হয়ে।