লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০২:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৫ আগস্ট: যেভাবে বদলে গিয়েছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় দিন, যা আন্দোলনকারীদের কাছে ‘৩৬ জুলাই’ নামে পরিচিত। এদিন একটি রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের সফল সমাপ্তি ঘটে এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন নিশ্চিত হয়। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এদিন পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। তার সঙ্গে তার ছোট বোন শেখ রেহানাও দেশ ছাড়েন। বর্তমানে তারা দিল্লিতে অবস্থান করছেন। এই দিনটিই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সূচনা করেছিল, যার পথ ধরে অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা তৈরি হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে আসা ও সংবিধান সংশোধনসহ রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

দুই বছর আগে আজকের এই দিনে সকাল থেকেই ছিল এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। কারফিউ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যুদ্ধংদেহী মনোভাব উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতা ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে রাস্তায় নেমে আসেন। ঢাকার প্রবেশপথ যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও উত্তরা দিয়ে হাজার হাজার মানুষ শহরে প্রবেশ করতে শুরু করেন। সকাল থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন পয়েন্টে জমায়েত হতে থাকেন বিক্ষোভকারীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নির্বিচারে গুলিবর্ষণের মধ্যেও ছাত্র-জনতা গণভবনের দিকে এগিয়ে যান।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে দুপুর ১২টার দিকে গণভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শিথিল হতে শুরু করে। আইএসপিআর-এর মাধ্যমে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বক্তব্য দেওয়ার ঘোষণা এলে জনমনে পরিবর্তনের বার্তা স্পষ্ট হয়। দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা আগরতলার উদ্দেশ্যে দেশত্যাগ করেন। একই সময়ে ধানমন্ডিতে তার রাজনৈতিক কার্যালয় ও ব্যক্তিগত বাসভবন সুধা সদন থেকে নিরাপত্তা কর্মীরা সরে যান। আওয়ামী লীগ কার্যালয় থেকে নেতাকর্মীদের দৌড়ে বের হতে দেখা যায়।

বিকাল ৪টায় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা জানান। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের জোয়ার বয়। পরাধীনতার শিকল ভাঙার তৃপ্তিতে শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, দিনমজুর, রিকশাচালক ও চাকরিজীবীরা আনন্দ মিছিলে শামিল হন। হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, তার মা পদত্যাগের বিষয়টি আগেই বিবেচনা করছিলেন এবং পরিবারের অনুরোধে নিরাপত্তার খাতিরে দেশত্যাগ করেছেন। তিনি আরও জানান, মায়ের বয়স সত্তরের ঘরে এবং তিনি এই বিক্ষোভে খুবই হতাশ ছিলেন।

সরকার পতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব থেকে সরে যান। এরপরই হাজার হাজার মানুষ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশ করেন। সেখানে তারা সরকার পতনের উৎসব করেন এবং ভুয়া ভুয়া স্লোগান দেন। শ্রীলংকার মতোই প্রধানমন্ত্রীর অফিস ও বেডরুমে ছবি তোলেন। এমনকি আসবাবপত্র, পুকুরের মাছ, হাঁস ও খেতের ফসলও নিয়ে যান তারা। জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদ-সদস্যদের চেয়ারে বসে ছবিও তোলেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা কোটা সংস্কার আন্দোলন, যা সরকার বরাবরই তাচ্ছিল্য, ‘রাজাকার’ ও ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে দমনের চেষ্টা করেছিল, তা শেষ পর্যন্ত সফল গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি একইদিনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পায় এবং জামায়াত বিরোধী দলের আসনে বসে। বর্তমানে জুলাই আন্দোলনে নির্বিচারে হত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিচার চলছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

টানা ৩ দিনের ছুটি: গাজীপুরের মহাসড়কে ঘরমুখী মানুষের উপচে পড়া ভিড়

৫ আগস্ট: যেভাবে বদলে গিয়েছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮:১২:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় দিন, যা আন্দোলনকারীদের কাছে ‘৩৬ জুলাই’ নামে পরিচিত। এদিন একটি রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের সফল সমাপ্তি ঘটে এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন নিশ্চিত হয়। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এদিন পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। তার সঙ্গে তার ছোট বোন শেখ রেহানাও দেশ ছাড়েন। বর্তমানে তারা দিল্লিতে অবস্থান করছেন। এই দিনটিই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সূচনা করেছিল, যার পথ ধরে অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা তৈরি হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে আসা ও সংবিধান সংশোধনসহ রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

দুই বছর আগে আজকের এই দিনে সকাল থেকেই ছিল এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। কারফিউ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যুদ্ধংদেহী মনোভাব উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতা ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে রাস্তায় নেমে আসেন। ঢাকার প্রবেশপথ যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও উত্তরা দিয়ে হাজার হাজার মানুষ শহরে প্রবেশ করতে শুরু করেন। সকাল থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন পয়েন্টে জমায়েত হতে থাকেন বিক্ষোভকারীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নির্বিচারে গুলিবর্ষণের মধ্যেও ছাত্র-জনতা গণভবনের দিকে এগিয়ে যান।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে দুপুর ১২টার দিকে গণভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শিথিল হতে শুরু করে। আইএসপিআর-এর মাধ্যমে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বক্তব্য দেওয়ার ঘোষণা এলে জনমনে পরিবর্তনের বার্তা স্পষ্ট হয়। দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা আগরতলার উদ্দেশ্যে দেশত্যাগ করেন। একই সময়ে ধানমন্ডিতে তার রাজনৈতিক কার্যালয় ও ব্যক্তিগত বাসভবন সুধা সদন থেকে নিরাপত্তা কর্মীরা সরে যান। আওয়ামী লীগ কার্যালয় থেকে নেতাকর্মীদের দৌড়ে বের হতে দেখা যায়।

বিকাল ৪টায় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা জানান। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের জোয়ার বয়। পরাধীনতার শিকল ভাঙার তৃপ্তিতে শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, দিনমজুর, রিকশাচালক ও চাকরিজীবীরা আনন্দ মিছিলে শামিল হন। হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, তার মা পদত্যাগের বিষয়টি আগেই বিবেচনা করছিলেন এবং পরিবারের অনুরোধে নিরাপত্তার খাতিরে দেশত্যাগ করেছেন। তিনি আরও জানান, মায়ের বয়স সত্তরের ঘরে এবং তিনি এই বিক্ষোভে খুবই হতাশ ছিলেন।

সরকার পতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব থেকে সরে যান। এরপরই হাজার হাজার মানুষ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশ করেন। সেখানে তারা সরকার পতনের উৎসব করেন এবং ভুয়া ভুয়া স্লোগান দেন। শ্রীলংকার মতোই প্রধানমন্ত্রীর অফিস ও বেডরুমে ছবি তোলেন। এমনকি আসবাবপত্র, পুকুরের মাছ, হাঁস ও খেতের ফসলও নিয়ে যান তারা। জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদ-সদস্যদের চেয়ারে বসে ছবিও তোলেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা কোটা সংস্কার আন্দোলন, যা সরকার বরাবরই তাচ্ছিল্য, ‘রাজাকার’ ও ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে দমনের চেষ্টা করেছিল, তা শেষ পর্যন্ত সফল গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি একইদিনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পায় এবং জামায়াত বিরোধী দলের আসনে বসে। বর্তমানে জুলাই আন্দোলনে নির্বিচারে হত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিচার চলছে।