লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:০৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যাত্রাবাড়ীর স্মৃতিফলকে খোদাই করা শহীদদের শেষ আকুতি ও গল্প

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের গণহত্যার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকা। সেই রক্তাক্ত ইতিহাস ও শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতি ধরে রাখতে যাত্রাবাড়ী থেকে শনির আখড়া পর্যন্ত সড়কে স্থাপন করা হয়েছে কালো ও সাদা পাথরের স্মারক ফলক। যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিচিহ্ন’ এবং যাত্রাবাড়ী মোড়ের ‘শহীদী ঐক্য চত্বর’ এখন কেবলই কিছু নাম নয়, বরং একেকটি অসমাপ্ত জীবনের বেদনাবিধুর গল্প বহন করছে।

এই সড়ক ধরে হাঁটলে চোখে পড়ে কালো ও সাদা পাথরের সারি সারি স্মৃতিফলক। ফ্লাইওভারের নিচের ‘জুলাই স্মৃতিচিহ্ন’-এ ঠাঁই পেয়েছে ৬৩ জন শহীদের সংক্ষিপ্ত জীবনী। আর যাত্রাবাড়ী মোড়ের ‘শহীদী ঐক্য চত্বর’-এ খোদাই করা হয়েছে ৫৬ জন শহীদের নাম। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রবাসী, সাংবাদিক, দিনমজুর, দোকানদার, বাবুর্চি, দর্জি ও রিকশাচালকদের মতো সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের নাম এখানে পাশাপাশি স্থান পেয়েছে, যা গণ-অভ্যুত্থানের সম্মিলিত আত্মত্যাগের জীবন্ত সাক্ষ্য দেয়। যাত্রাবাড়ী থানার বিপরীত পাশ থেকে শুরু করে কুতুবখালী, কাজলা ও শনির আখড়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই ফলকগুলো পথচারীদের থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে।

ফলকগুলোতে খোদাই করা প্রতিটি গল্প যেন এক একটি পরিবারের কান্না। যেমন ১৩ বছর বয়সী শাহাদাত হোসেন শাওন। দারিদ্র্যের কারণে বই-খাতা ছেড়ে বাবার সঙ্গে হালিম বিক্রি শুরু করলেও ৫ই আগস্ট দেশের টানে আন্দোলনে গিয়ে আর ফেরেনি সে। আবার দুই সন্তানের বাবা ও পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী শাহিনের মরদেহ এতটাই ক্ষতবিক্ষত ছিল যে, তার ভাইয়েরাও প্রথমে তাকে চিনতে পারেননি। স্বামীর স্মৃতি জড়িয়ে তার স্ত্রীর প্রশ্ন, “এখন কে আগলে রাখবে আমাকে?”

তরুণ আলেম খুবাইবের ফলকে লেখা রয়েছে তার শেষ কথা, “সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো ভুল না।” অন্যদিকে, college ছাত্র জিহাদ হাসান মাহিম মায়ের নিষেধের জবাবে বলেছিলেন, “মা, আর একদিন মাত্র যাবো।” সেই একদিনই তার জীবনের শেষ দিন হয়ে যায়। মৃত্যুর দুই দিন আগে মাহিম ফেসবুকে লিখেছিলেন, “হয়তো দেশের কাফনের কাপড় শেষ হবে, অথবা মিষ্টির দোকান খালি হবে।” ছয় ভাইবোনের সংসারের শেষ ভরসা গার্মেন্টসকর্মী হাবিব পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারালে তার ছোট ভাই নয়ন লাশের স্তূপ থেকে ভাইয়ের মরদেহ খুঁজে বের করেন। হাবিবের মা আজও ডুকরে কেঁদে প্রশ্ন করেন, “এখন কে আমার সব করবে?”

ফার্নিচার কারিগর জোবায়েদ হোসেন মৃত্যুর আগে আকুতি জানিয়েছিলেন, “তোমরা আমার বাবা-মা আর ছোট ভাইকে দেখে রেখো।” কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী শিহাবের মৃত্যুর পর তার মা নিঃস্ব হয়ে আক্ষেপ করেন, “আমার সংসার এখন থেমে গেছে।” বিদেশে পাড়ি জমানোর সব প্রস্তুতি শেষ করেও শিক্ষার্থীদের পানি খাওয়াতে গিয়ে প্রাণ হারান নাজমুল কাজী। তার দুই বছরের মেয়ে নুজাইরাহ এখনো জানে না যে, তাকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন দেখা বাবা আর কোনোদিন ফিরবেন না। এই ফলকগুলো আসলে একেকটি পরিবারের থেমে যাওয়া হাসি, অপূর্ণ স্বপ্ন আর অশ্রুসিক্ত অপেক্ষার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েন ও শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার বিতর্ক

যাত্রাবাড়ীর স্মৃতিফলকে খোদাই করা শহীদদের শেষ আকুতি ও গল্প

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:০৯:১৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের গণহত্যার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকা। সেই রক্তাক্ত ইতিহাস ও শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতি ধরে রাখতে যাত্রাবাড়ী থেকে শনির আখড়া পর্যন্ত সড়কে স্থাপন করা হয়েছে কালো ও সাদা পাথরের স্মারক ফলক। যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিচিহ্ন’ এবং যাত্রাবাড়ী মোড়ের ‘শহীদী ঐক্য চত্বর’ এখন কেবলই কিছু নাম নয়, বরং একেকটি অসমাপ্ত জীবনের বেদনাবিধুর গল্প বহন করছে।

এই সড়ক ধরে হাঁটলে চোখে পড়ে কালো ও সাদা পাথরের সারি সারি স্মৃতিফলক। ফ্লাইওভারের নিচের ‘জুলাই স্মৃতিচিহ্ন’-এ ঠাঁই পেয়েছে ৬৩ জন শহীদের সংক্ষিপ্ত জীবনী। আর যাত্রাবাড়ী মোড়ের ‘শহীদী ঐক্য চত্বর’-এ খোদাই করা হয়েছে ৫৬ জন শহীদের নাম। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রবাসী, সাংবাদিক, দিনমজুর, দোকানদার, বাবুর্চি, দর্জি ও রিকশাচালকদের মতো সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের নাম এখানে পাশাপাশি স্থান পেয়েছে, যা গণ-অভ্যুত্থানের সম্মিলিত আত্মত্যাগের জীবন্ত সাক্ষ্য দেয়। যাত্রাবাড়ী থানার বিপরীত পাশ থেকে শুরু করে কুতুবখালী, কাজলা ও শনির আখড়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই ফলকগুলো পথচারীদের থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে।

ফলকগুলোতে খোদাই করা প্রতিটি গল্প যেন এক একটি পরিবারের কান্না। যেমন ১৩ বছর বয়সী শাহাদাত হোসেন শাওন। দারিদ্র্যের কারণে বই-খাতা ছেড়ে বাবার সঙ্গে হালিম বিক্রি শুরু করলেও ৫ই আগস্ট দেশের টানে আন্দোলনে গিয়ে আর ফেরেনি সে। আবার দুই সন্তানের বাবা ও পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী শাহিনের মরদেহ এতটাই ক্ষতবিক্ষত ছিল যে, তার ভাইয়েরাও প্রথমে তাকে চিনতে পারেননি। স্বামীর স্মৃতি জড়িয়ে তার স্ত্রীর প্রশ্ন, “এখন কে আগলে রাখবে আমাকে?”

তরুণ আলেম খুবাইবের ফলকে লেখা রয়েছে তার শেষ কথা, “সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো ভুল না।” অন্যদিকে, college ছাত্র জিহাদ হাসান মাহিম মায়ের নিষেধের জবাবে বলেছিলেন, “মা, আর একদিন মাত্র যাবো।” সেই একদিনই তার জীবনের শেষ দিন হয়ে যায়। মৃত্যুর দুই দিন আগে মাহিম ফেসবুকে লিখেছিলেন, “হয়তো দেশের কাফনের কাপড় শেষ হবে, অথবা মিষ্টির দোকান খালি হবে।” ছয় ভাইবোনের সংসারের শেষ ভরসা গার্মেন্টসকর্মী হাবিব পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারালে তার ছোট ভাই নয়ন লাশের স্তূপ থেকে ভাইয়ের মরদেহ খুঁজে বের করেন। হাবিবের মা আজও ডুকরে কেঁদে প্রশ্ন করেন, “এখন কে আমার সব করবে?”

ফার্নিচার কারিগর জোবায়েদ হোসেন মৃত্যুর আগে আকুতি জানিয়েছিলেন, “তোমরা আমার বাবা-মা আর ছোট ভাইকে দেখে রেখো।” কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী শিহাবের মৃত্যুর পর তার মা নিঃস্ব হয়ে আক্ষেপ করেন, “আমার সংসার এখন থেমে গেছে।” বিদেশে পাড়ি জমানোর সব প্রস্তুতি শেষ করেও শিক্ষার্থীদের পানি খাওয়াতে গিয়ে প্রাণ হারান নাজমুল কাজী। তার দুই বছরের মেয়ে নুজাইরাহ এখনো জানে না যে, তাকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন দেখা বাবা আর কোনোদিন ফিরবেন না। এই ফলকগুলো আসলে একেকটি পরিবারের থেমে যাওয়া হাসি, অপূর্ণ স্বপ্ন আর অশ্রুসিক্ত অপেক্ষার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।