লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চীনের প্রভাব রুখতে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন কোটি ডলারের কর্মসূচি

বিশ্বজুড়ে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় নতুন করে বড় ধরনের কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। গত বছর ব্যাপক বাজেট কাটছাঁটের কারণে বিভিন্ন উদ্যোগ স্থগিত হয়ে গেলেও, এখন নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি সেসব কর্মসূচি পুনরায় চালু করতে শত শত কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে দেশটি।

ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে মার্কিন কংগ্রেসকে জানিয়েছে যে, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও মধ্য আমেরিকার পুরোনো সমুদ্রতলের টেলিযোগাযোগ কেবল প্রতিস্থাপনে ১৭ কোটি ৫৮ লাখ মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোতে চীনের প্রভাব বিস্তার ঠেকানো। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিনিয়োগ পশ্চিম গোলার্ধ, আফ্রিকা ও এশিয়ায় চীনের কূটনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় মার্কিন বৃহত্তর কৌশলেরই একটি অংশ।

মার্কিন কংগ্রেসে জমা দেয়া অর্থায়নের প্রস্তাবে ‘ক্যারিবীয় ও মধ্য আমেরিকার সমুদ্রতলের কেবলের ওপর চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) নিয়ন্ত্রণ মোকাবিলা প্রকল্প’ নামে একটি কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় নিরাপদ সমুদ্রতলের কেবল স্থাপন করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে চীনা প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে বিশ্বস্ত বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে কাজ করতে সহায়তা করা হবে। এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া ও হাইতি এই সুবিধা পেতে পারে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের কিছু অংশ নিকারাগুয়ায় থাকলেও দেশটির সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কাজ করবে না।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে চীনের টেলিযোগাযোগ, অবকাঠামো ও বন্দর খাতে বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তার মতে, চীনের প্রকল্পগুলো শুরুতে সাশ্রয়ী মনে হলেও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিলম্ব এবং নিম্নমানের সেবার কারণে পরে সেগুলোর প্রকৃত খরচ অনেক বেড়ে যায়। সমুদ্রতলের কেবল প্রকল্পের বাইরে চীনের বৈশ্বিক প্রভাব মোকাবিলায় প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ের আরও বিভিন্ন প্রকল্প বিবেচনা করছে পররাষ্ট্র দপ্তর।

পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সেখানে ৩৪ কোটিরও বেশি ডলার ব্যয়ে ৫০টির বেশি প্রকল্পের প্রস্তাব রয়েছে, যার অধিকাংশই লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়াকেন্দ্রিক। এসবের মধ্যে অনেক উদ্যোগ আগেই অনুমোদিত হয়েছিল, কিন্তু ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সির (ডিওজিই) বাজেট কমানো ও জনবল ছাঁটাইয়ের কারণে সেগুলো স্থগিত হয়ে গিয়েছিল। ওই সময় মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএআইডি) বিলুপ্ত করা হয় এবং শত শত কূটনৈতিক পদও বাতিল করা হয়।

নতুন পরিকল্পনার মধ্যে আর্জেন্টিনা ও বেলিজে সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে, যা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে চীনের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষার কাজ করবে। এছাড়া ইকুয়েডর, জ্যামাইকা, মেক্সিকো, প্যারাগুয়ে, পেরু ও উরুগুয়েতে বন্দর পরিচালনা, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ খাতে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি পরবর্তী দালাই লামা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় চীনের প্রভাব ঠেকাতে নিরাপদ যোগাযোগ প্রযুক্তি সরবরাহ এবং নজরদারি ও সেন্সরশিপ প্রযুক্তি রপ্তানিকারী চীনা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম মোকাবিলার উদ্যোগও বিবেচনায় রয়েছে।

এই নতুন অর্থায়নের পরিকল্পনা স্পষ্ট করছে যে, বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা চললেও কৌশলগত প্রতিযোগিতা থেকে সরে আসছে না ওয়াশিংটন। আগামী সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ফিলিপাইনে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে বৈঠক করেছেন, তবুও এই প্রস্তাবগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও কৌশলগত প্রতিযোগিতা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে রয়ে গেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সরকারি দপ্তরের শীর্ষ পদে রাজনীতিকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে কর্মকর্তাদের ক্ষোভ

চীনের প্রভাব রুখতে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন কোটি ডলারের কর্মসূচি

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:৪৫:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

বিশ্বজুড়ে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় নতুন করে বড় ধরনের কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। গত বছর ব্যাপক বাজেট কাটছাঁটের কারণে বিভিন্ন উদ্যোগ স্থগিত হয়ে গেলেও, এখন নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি সেসব কর্মসূচি পুনরায় চালু করতে শত শত কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে দেশটি।

ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে মার্কিন কংগ্রেসকে জানিয়েছে যে, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও মধ্য আমেরিকার পুরোনো সমুদ্রতলের টেলিযোগাযোগ কেবল প্রতিস্থাপনে ১৭ কোটি ৫৮ লাখ মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোতে চীনের প্রভাব বিস্তার ঠেকানো। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিনিয়োগ পশ্চিম গোলার্ধ, আফ্রিকা ও এশিয়ায় চীনের কূটনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় মার্কিন বৃহত্তর কৌশলেরই একটি অংশ।

মার্কিন কংগ্রেসে জমা দেয়া অর্থায়নের প্রস্তাবে ‘ক্যারিবীয় ও মধ্য আমেরিকার সমুদ্রতলের কেবলের ওপর চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) নিয়ন্ত্রণ মোকাবিলা প্রকল্প’ নামে একটি কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় নিরাপদ সমুদ্রতলের কেবল স্থাপন করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে চীনা প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে বিশ্বস্ত বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে কাজ করতে সহায়তা করা হবে। এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া ও হাইতি এই সুবিধা পেতে পারে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের কিছু অংশ নিকারাগুয়ায় থাকলেও দেশটির সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কাজ করবে না।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে চীনের টেলিযোগাযোগ, অবকাঠামো ও বন্দর খাতে বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তার মতে, চীনের প্রকল্পগুলো শুরুতে সাশ্রয়ী মনে হলেও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিলম্ব এবং নিম্নমানের সেবার কারণে পরে সেগুলোর প্রকৃত খরচ অনেক বেড়ে যায়। সমুদ্রতলের কেবল প্রকল্পের বাইরে চীনের বৈশ্বিক প্রভাব মোকাবিলায় প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ের আরও বিভিন্ন প্রকল্প বিবেচনা করছে পররাষ্ট্র দপ্তর।

পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সেখানে ৩৪ কোটিরও বেশি ডলার ব্যয়ে ৫০টির বেশি প্রকল্পের প্রস্তাব রয়েছে, যার অধিকাংশই লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়াকেন্দ্রিক। এসবের মধ্যে অনেক উদ্যোগ আগেই অনুমোদিত হয়েছিল, কিন্তু ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সির (ডিওজিই) বাজেট কমানো ও জনবল ছাঁটাইয়ের কারণে সেগুলো স্থগিত হয়ে গিয়েছিল। ওই সময় মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএআইডি) বিলুপ্ত করা হয় এবং শত শত কূটনৈতিক পদও বাতিল করা হয়।

নতুন পরিকল্পনার মধ্যে আর্জেন্টিনা ও বেলিজে সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে, যা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে চীনের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষার কাজ করবে। এছাড়া ইকুয়েডর, জ্যামাইকা, মেক্সিকো, প্যারাগুয়ে, পেরু ও উরুগুয়েতে বন্দর পরিচালনা, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ খাতে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি পরবর্তী দালাই লামা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় চীনের প্রভাব ঠেকাতে নিরাপদ যোগাযোগ প্রযুক্তি সরবরাহ এবং নজরদারি ও সেন্সরশিপ প্রযুক্তি রপ্তানিকারী চীনা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম মোকাবিলার উদ্যোগও বিবেচনায় রয়েছে।

এই নতুন অর্থায়নের পরিকল্পনা স্পষ্ট করছে যে, বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা চললেও কৌশলগত প্রতিযোগিতা থেকে সরে আসছে না ওয়াশিংটন। আগামী সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ফিলিপাইনে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে বৈঠক করেছেন, তবুও এই প্রস্তাবগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও কৌশলগত প্রতিযোগিতা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে রয়ে গেছে।