লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৮:১০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৃটেনের সহায়তা কমছে অর্ধেকের বেশি, সুন্দরবনের জলবায়ু প্রকল্প বন্ধ

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সুন্দরবন এলাকায় চলমান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বৃটেন সরকারের পক্ষ থেকে বৈদেশিক দ্বিপক্ষীয় সহায়তা বাজেট ব্যাপক হারে কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে সুন্দরবনের উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ প্রত্যাশিত সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং তাদের জীবিকা নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

বৃটিশ উন্নয়ন সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন ২০২৩ সালে সুন্দরবন অঞ্চলে জলবায়ু-সহনশীল এই প্রকল্পটির কাজ শুরু করেছিল। ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলার কথা থাকা এই উদ্যোগের আওতায় সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ও মাছ চাষের আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং ঘূর্ণিঝড় ও অতিবৃষ্টির আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। পুরো প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল প্রায় ৫৭ হাজার মানুষের কাছে সুবিধা পেঁছে দেওয়া। কিন্তু হঠাৎ অর্থায়ন সংকুচিত হওয়ায় চলতি বছর মাত্র ৩৭ হাজার মানুষ এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ প্রায় ২০ হাজার মানুষ সরাসরি সাহায্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

প্রকল্পটির জন্য ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২.২ মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ পাওয়ার কথা থাকলেও প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন জানিয়েছে, তারা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থের তুলনায় ‘অনেক কম’ অর্থ পেয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে আকস্মিকভাবে জুনের মধ্যে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ব্যাপক তদবিরের পর প্রকল্প বন্ধের সময়সীমা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তটি মূলত বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সহায়তা কমানোর একটি বড় সিদ্ধান্তের অংশ। ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশে বৃটেনের দ্বিপক্ষীয় সহায়তা ৬৬.৭ মিলিয়ন পাউন্ড থেকে কমিয়ে ৩১ মিলিয়ন পাউন্ডে নামিয়ে আনা হবে, যা আগের চেয়ে অর্ধেকেরও বেশি কম। একই সময়ে যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক বৈদেশিক সহায়তা বাজেট তাদের স্থূল জাতীয় আয়ের (জিএনআই) ০.৫ শতাংশ থেকে ০.৩ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের জলবায়ু সহনশীলতা বিষয়ক প্রধান তামান্না রহমান বলেন, আকস্মিকভাবে এই প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তৈরি হওয়া আস্থার জায়গাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রকল্পের সুফলকে টেকসই করার সুযোগও অনেক কমে গেছে।

সুন্দরবনের স্থানীয় বাসিন্দা বিনা মণ্ডল এই প্রকল্পের মাধ্যমে একটি সৌর প্যানেল পেয়েছিলেন। এর ফলে রাতেও কাজ করার সুযোগ পাওয়ায় তার পরিবারের মাছ ধরার আয় মাসে ২-৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪-৫ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছিল। আরেক বাসিন্দা বাসন্তী মণ্ডল সৌরচালিত ধান ভাঙানোর মেশিন পেয়ে বাড়িতে বসেই আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। হঠাৎ প্রকল্প বন্ধের খবরে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। যখন এই উদ্যোগগুলো সুফল দিতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই কেন সহায়তা বন্ধ হচ্ছে, তা তারা বুঝতে পারছেন না।

এছাড়া প্রকল্পের আওতায় থাকা ১৪০ জন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান এবং প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। এখন মাঝপথে প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেলে তারা আবার ‘শূন্য অবস্থায়’ ফিরে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন। সংস্থাটি জানিয়েছে, এই আর্থিক ঘাটতি পূরণে তারা বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের কাছ থেকে নতুন অনুদান পাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে মাত্র কয়েক মাসের নোটিশে প্রকল্প বন্ধের সিদ্ধান্ত আসায় নতুন কোনো অর্থায়ন খোঁজার পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি।

বৃটিশ পার্লামেন্টের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক কমিটির চেয়ার সারাহ চ্যাম্পিয়ন এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, এভাবে মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই বছর আগে প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিম্নআয়ের দেশগুলোর পাশে থাকার বিষয়ে যুক্তরাজ্যের অঙ্গীকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। এতে বৃটিশ করদাতাদের অর্থের সঠিক ব্যবহার ব্যাহত হবে এবং লন্ডনের আন্তর্জাতিক সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) জানিয়েছে, তারা উচ্চমাত্রার অনুদানভিত্তিক বৈদেশিক সহায়তা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে। এর পরিবর্তে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে সরাসরি অংশীদারত্ব তৈরিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, এই নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে সরকারি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা, অর্থায়ন বাড়ানো এবং বাইরের সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

৮ ডিসেম্বর শুরু হচ্ছে জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা, সময়সূচি চূড়ান্ত

বৃটেনের সহায়তা কমছে অর্ধেকের বেশি, সুন্দরবনের জলবায়ু প্রকল্প বন্ধ

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:০৫:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সুন্দরবন এলাকায় চলমান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বৃটেন সরকারের পক্ষ থেকে বৈদেশিক দ্বিপক্ষীয় সহায়তা বাজেট ব্যাপক হারে কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে সুন্দরবনের উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ প্রত্যাশিত সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং তাদের জীবিকা নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

বৃটিশ উন্নয়ন সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন ২০২৩ সালে সুন্দরবন অঞ্চলে জলবায়ু-সহনশীল এই প্রকল্পটির কাজ শুরু করেছিল। ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলার কথা থাকা এই উদ্যোগের আওতায় সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ও মাছ চাষের আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং ঘূর্ণিঝড় ও অতিবৃষ্টির আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। পুরো প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল প্রায় ৫৭ হাজার মানুষের কাছে সুবিধা পেঁছে দেওয়া। কিন্তু হঠাৎ অর্থায়ন সংকুচিত হওয়ায় চলতি বছর মাত্র ৩৭ হাজার মানুষ এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ প্রায় ২০ হাজার মানুষ সরাসরি সাহায্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

প্রকল্পটির জন্য ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২.২ মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ পাওয়ার কথা থাকলেও প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন জানিয়েছে, তারা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থের তুলনায় ‘অনেক কম’ অর্থ পেয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে আকস্মিকভাবে জুনের মধ্যে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ব্যাপক তদবিরের পর প্রকল্প বন্ধের সময়সীমা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তটি মূলত বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সহায়তা কমানোর একটি বড় সিদ্ধান্তের অংশ। ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশে বৃটেনের দ্বিপক্ষীয় সহায়তা ৬৬.৭ মিলিয়ন পাউন্ড থেকে কমিয়ে ৩১ মিলিয়ন পাউন্ডে নামিয়ে আনা হবে, যা আগের চেয়ে অর্ধেকেরও বেশি কম। একই সময়ে যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক বৈদেশিক সহায়তা বাজেট তাদের স্থূল জাতীয় আয়ের (জিএনআই) ০.৫ শতাংশ থেকে ০.৩ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের জলবায়ু সহনশীলতা বিষয়ক প্রধান তামান্না রহমান বলেন, আকস্মিকভাবে এই প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তৈরি হওয়া আস্থার জায়গাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রকল্পের সুফলকে টেকসই করার সুযোগও অনেক কমে গেছে।

সুন্দরবনের স্থানীয় বাসিন্দা বিনা মণ্ডল এই প্রকল্পের মাধ্যমে একটি সৌর প্যানেল পেয়েছিলেন। এর ফলে রাতেও কাজ করার সুযোগ পাওয়ায় তার পরিবারের মাছ ধরার আয় মাসে ২-৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪-৫ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছিল। আরেক বাসিন্দা বাসন্তী মণ্ডল সৌরচালিত ধান ভাঙানোর মেশিন পেয়ে বাড়িতে বসেই আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। হঠাৎ প্রকল্প বন্ধের খবরে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। যখন এই উদ্যোগগুলো সুফল দিতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই কেন সহায়তা বন্ধ হচ্ছে, তা তারা বুঝতে পারছেন না।

এছাড়া প্রকল্পের আওতায় থাকা ১৪০ জন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান এবং প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। এখন মাঝপথে প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেলে তারা আবার ‘শূন্য অবস্থায়’ ফিরে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন। সংস্থাটি জানিয়েছে, এই আর্থিক ঘাটতি পূরণে তারা বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের কাছ থেকে নতুন অনুদান পাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে মাত্র কয়েক মাসের নোটিশে প্রকল্প বন্ধের সিদ্ধান্ত আসায় নতুন কোনো অর্থায়ন খোঁজার পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি।

বৃটিশ পার্লামেন্টের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক কমিটির চেয়ার সারাহ চ্যাম্পিয়ন এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, এভাবে মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই বছর আগে প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিম্নআয়ের দেশগুলোর পাশে থাকার বিষয়ে যুক্তরাজ্যের অঙ্গীকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। এতে বৃটিশ করদাতাদের অর্থের সঠিক ব্যবহার ব্যাহত হবে এবং লন্ডনের আন্তর্জাতিক সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) জানিয়েছে, তারা উচ্চমাত্রার অনুদানভিত্তিক বৈদেশিক সহায়তা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে। এর পরিবর্তে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে সরাসরি অংশীদারত্ব তৈরিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, এই নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে সরকারি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা, অর্থায়ন বাড়ানো এবং বাইরের সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।