লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৫:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৬ বছর পর ভারতকে টপকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র

ভৌগোলিক নৈকট্য, স্থলপথে পণ্য পরিবহনের সুবিধা এবং তুলনামূলক কম খরচের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে জোরালো বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল, তাতে বড় পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ ১৬ বছর পর ভারতকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই তালিকায় বড় ব্যবধানে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে চীন। মূলত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি এবং ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কমে যাওয়ার কারণে এই পটপরিবর্তন ঘটেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূরাজনৈতিক নানা বিষয়, যার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক নিয়ে দর-কষাকষি এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পরিবর্তিত পরিস্থিতি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৬৭ কোটি ডলার। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে এই বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ হাজার─৭২ কোটি ডলার। অর্থাৎ ভারতের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ১৯৫ কোটি ডলার বেশি হয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ার কারণেই দেশটির সঙ্গে মোট বাণিজ্য বেড়েছে, যার বড় অংশই হয়েছে সরকারি কেনাকাটার মাধ্যমে। তবে পোশাক রপ্তানিতে প্রতিশ্রুত বিশেষ শুল্কসুবিধা এখনো কার্যকর হয়নি। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য কমার বিষয়ে তিনি বলেন, দুই দেশের আরোপ করা অশুল্ক বাধায় আমদানি ও রপ্তানি কমেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ভোক্তা ও উৎপাদক উভয়ের ওপর।

একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বড় অঙ্কের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই উদ্বৃত্ত ছিল ৬২৬ কোটি ডলার, যা পরবর্তী অর্থবছরে আমদানি বৃদ্ধির কারণে কমে ৫৫৫ কোটি ডলারে নেমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৯১১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং বিপরীতে আমদানি করেছে ৩৫৬ কোটি ডলারের পণ্য। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যঘাটতি কমানোর নীতি হিসেবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন। কয়েক দফা আলোচনার পর এই শুল্ক ২০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়, যা ৭ আগস্ট কার্যকর হয়।

এরপর চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে একটি পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি সই হয়। চুক্তিতে পাল্টা শুল্ক ১৯ শতাংশে নামানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য, ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি পণ্য, ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার অঙ্গীকার করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩০ এপ্রিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে এবং আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে আলোচনা চলছে। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাকে শুল্ক শূন্য করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি। এদিকে চুক্তির ১১ দিন পর, ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করলেও চুক্তিটি বাতিল বা সংশোধনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবায়নের আগেই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য কেনা বাড়িয়েছে। সরকারি পর্যায়ে গম ও এলএনজি এবং বেসরকারি পর্যায়ে সয়াবিনবীজ ও তুলা আমদানি বেড়েছে। এনবিআরের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো গম আমদানি না হলেও গত অর্থবছরে ২২ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের গম এসেছে, যার বড় অংশ আমদানি করেছে সরকার। সয়াবিনবীজ আমদানি ৩৫ কোটি থেকে বেড়ে ৬২ কোটি এবং তুলা ২৩ কোটি থেকে বেড়ে ৩৮ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া সরকারি খাতে এলএনজি আমদানি হয়েছে প্রায় ৪৮ কোটি ডলারের। সব মিলিয়ে আমদানি ৪৩ শতাংশ বেড়ে ২৪৯ কোটি থেকে ৩৫৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বিপরীতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আগের অর্থবছরের ১৪ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৪ শতাংশ।

বেসরকারি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের শীর্ষ আমদানিকারক মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, বাণিজ্যসুবিধা বৃদ্ধি এবং মানসম্মত পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক দামের কারণে তাঁরা আমদানি বাড়িয়েছেন। দ্বিতীয় শীর্ষ আমদানিকারক সীকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের মান ও সরবরাহের নিশ্চয়তা বেশি। ইউক্রেন সংকটের কারণে অন্য উৎস থেকে পণ্য আনার ঝুঁকি বাড়ায় তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়লেও ভারতের ক্ষেত্রে চিত্রটি উল্টো। গত অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানি উভয়ই কমেছে। ২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশ সরকার স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। এর জবাবে ৮ এপ্রিল কলকাতা বিমানবন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশের পণ্য তৃতীয় দেশে রপ্তানির সুবিধা প্রত্যাহার করে ভারত। এছাড়া ভারত তিন দফায় বাংলাদেশি পণ্য আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। গত ১৭ মে ও ২৭ জুন পোশাক, খাদ্য, পাটপণ্য, তুলা ও সুতার বর্জ্য,プラスチック এবং কাঠের আসবাব রপ্তানিতে শর্ত দেওয়া হয়। পরে ১১ আগস্ট আরও কিছু পাটপণ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় এবং পাটপণ্যের ওপর প্রতিকারমূলক শুল্ক আরোপের তদন্ত শুরু করে ভারত।

এসব পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের কারণে দুই দেশের বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ছিল প্রায় ৬৫ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরে ১২ শতাংশ কমে ৫৭ কোটি ডলারে নেমেছে। ভারত থেকে তুলা আমদানি ২৩ শতাংশ কমে ৪০ কোটি এবং তুলার সুতা ১৭৫ কোটি থেকে কমে ১৪৭ কোটি ডলার হয়েছে। এনবিআরের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতে রপ্তানি প্রায় ৩ শতাংশ এবং আমদানি সাড়ে ৭ শতাংশ কমেছে। ভারত থেকে মোট আমদানি হয়েছে ৮৯৬ কোটি ডলারের পণ্য এবং মোট বাণিজ্য প্রায় ৭ শতাংশ কমে ১ হাজার ৭২ কোটি ডলারে নেমেছে। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে দুই দেশের ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাকে শুল্কছাড় কার্যকর হলে সেখানে রপ্তানি আরও বাড়বে, যা নিয়ে আগামী সেপ্টেম্বরে আলোচনার কথা রয়েছে।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে পরিবর্তন এলেও বাংলাদেশের শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে চীন। গত অর্থবছরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট পণ্য বাণিজ্য হয়েছে ২ হাজার ২৯৬ কোটি ডলারের, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের চেয়ে প্রায় ৮১ শতাংশ বেশি। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য মূলত আমদানিনির্ভর, যেখান থেকে গত অর্থবছরে ২ হাজার ২১৪ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে (বৃদ্ধি ৭%) এবং রপ্তানি হয়েছে ৮২ কোটি ডলারের পণ্য (বৃদ্ধি ১১%)। এনবিআরের হিসাবে, গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৯৩৮ কোটি ডলার, যার মধ্যে চীনের অংশ ১৯%, যুক্তরাষ্ট্রের ১১% এবং ভারতের ৯%। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চীন ও ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্যের বড় অংশই রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের সুফল পেতে প্রতিশ্রুত শুল্কসুবিধা দ্রুত কার্যকর করা জরুরি।

দেখা গেছে, গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি বেড়েছে ৪৩ শতাংশ।

.এনবিআরের হিসাবে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য আমদানি ছিল ৭ হাজার ৩১২ কোটি ডলারের।

জনপ্রিয় সংবাদ

শিল্পকারখানায় আগামীকাল থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে

১৬ বছর পর ভারতকে টপকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশিত হয়েছে: ০৯:৫৫:৫৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভৌগোলিক নৈকট্য, স্থলপথে পণ্য পরিবহনের সুবিধা এবং তুলনামূলক কম খরচের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে জোরালো বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল, তাতে বড় পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ ১৬ বছর পর ভারতকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই তালিকায় বড় ব্যবধানে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে চীন। মূলত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি এবং ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কমে যাওয়ার কারণে এই পটপরিবর্তন ঘটেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূরাজনৈতিক নানা বিষয়, যার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক নিয়ে দর-কষাকষি এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পরিবর্তিত পরিস্থিতি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৬৭ কোটি ডলার। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে এই বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ হাজার─৭২ কোটি ডলার। অর্থাৎ ভারতের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ১৯৫ কোটি ডলার বেশি হয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ার কারণেই দেশটির সঙ্গে মোট বাণিজ্য বেড়েছে, যার বড় অংশই হয়েছে সরকারি কেনাকাটার মাধ্যমে। তবে পোশাক রপ্তানিতে প্রতিশ্রুত বিশেষ শুল্কসুবিধা এখনো কার্যকর হয়নি। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য কমার বিষয়ে তিনি বলেন, দুই দেশের আরোপ করা অশুল্ক বাধায় আমদানি ও রপ্তানি কমেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ভোক্তা ও উৎপাদক উভয়ের ওপর।

একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বড় অঙ্কের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই উদ্বৃত্ত ছিল ৬২৬ কোটি ডলার, যা পরবর্তী অর্থবছরে আমদানি বৃদ্ধির কারণে কমে ৫৫৫ কোটি ডলারে নেমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৯১১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং বিপরীতে আমদানি করেছে ৩৫৬ কোটি ডলারের পণ্য। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যঘাটতি কমানোর নীতি হিসেবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন। কয়েক দফা আলোচনার পর এই শুল্ক ২০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়, যা ৭ আগস্ট কার্যকর হয়।

এরপর চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে একটি পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি সই হয়। চুক্তিতে পাল্টা শুল্ক ১৯ শতাংশে নামানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য, ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি পণ্য, ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার অঙ্গীকার করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩০ এপ্রিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে এবং আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে আলোচনা চলছে। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাকে শুল্ক শূন্য করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি। এদিকে চুক্তির ১১ দিন পর, ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করলেও চুক্তিটি বাতিল বা সংশোধনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবায়নের আগেই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য কেনা বাড়িয়েছে। সরকারি পর্যায়ে গম ও এলএনজি এবং বেসরকারি পর্যায়ে সয়াবিনবীজ ও তুলা আমদানি বেড়েছে। এনবিআরের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো গম আমদানি না হলেও গত অর্থবছরে ২২ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের গম এসেছে, যার বড় অংশ আমদানি করেছে সরকার। সয়াবিনবীজ আমদানি ৩৫ কোটি থেকে বেড়ে ৬২ কোটি এবং তুলা ২৩ কোটি থেকে বেড়ে ৩৮ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া সরকারি খাতে এলএনজি আমদানি হয়েছে প্রায় ৪৮ কোটি ডলারের। সব মিলিয়ে আমদানি ৪৩ শতাংশ বেড়ে ২৪৯ কোটি থেকে ৩৫৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বিপরীতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আগের অর্থবছরের ১৪ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৪ শতাংশ।

বেসরকারি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের শীর্ষ আমদানিকারক মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, বাণিজ্যসুবিধা বৃদ্ধি এবং মানসম্মত পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক দামের কারণে তাঁরা আমদানি বাড়িয়েছেন। দ্বিতীয় শীর্ষ আমদানিকারক সীকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের মান ও সরবরাহের নিশ্চয়তা বেশি। ইউক্রেন সংকটের কারণে অন্য উৎস থেকে পণ্য আনার ঝুঁকি বাড়ায় তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়লেও ভারতের ক্ষেত্রে চিত্রটি উল্টো। গত অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানি উভয়ই কমেছে। ২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশ সরকার স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। এর জবাবে ৮ এপ্রিল কলকাতা বিমানবন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশের পণ্য তৃতীয় দেশে রপ্তানির সুবিধা প্রত্যাহার করে ভারত। এছাড়া ভারত তিন দফায় বাংলাদেশি পণ্য আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। গত ১৭ মে ও ২৭ জুন পোশাক, খাদ্য, পাটপণ্য, তুলা ও সুতার বর্জ্য,プラスチック এবং কাঠের আসবাব রপ্তানিতে শর্ত দেওয়া হয়। পরে ১১ আগস্ট আরও কিছু পাটপণ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় এবং পাটপণ্যের ওপর প্রতিকারমূলক শুল্ক আরোপের তদন্ত শুরু করে ভারত।

এসব পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের কারণে দুই দেশের বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ছিল প্রায় ৬৫ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরে ১২ শতাংশ কমে ৫৭ কোটি ডলারে নেমেছে। ভারত থেকে তুলা আমদানি ২৩ শতাংশ কমে ৪০ কোটি এবং তুলার সুতা ১৭৫ কোটি থেকে কমে ১৪৭ কোটি ডলার হয়েছে। এনবিআরের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতে রপ্তানি প্রায় ৩ শতাংশ এবং আমদানি সাড়ে ৭ শতাংশ কমেছে। ভারত থেকে মোট আমদানি হয়েছে ৮৯৬ কোটি ডলারের পণ্য এবং মোট বাণিজ্য প্রায় ৭ শতাংশ কমে ১ হাজার ৭২ কোটি ডলারে নেমেছে। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে দুই দেশের ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাকে শুল্কছাড় কার্যকর হলে সেখানে রপ্তানি আরও বাড়বে, যা নিয়ে আগামী সেপ্টেম্বরে আলোচনার কথা রয়েছে।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে পরিবর্তন এলেও বাংলাদেশের শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে চীন। গত অর্থবছরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট পণ্য বাণিজ্য হয়েছে ২ হাজার ২৯৬ কোটি ডলারের, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের চেয়ে প্রায় ৮১ শতাংশ বেশি। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য মূলত আমদানিনির্ভর, যেখান থেকে গত অর্থবছরে ২ হাজার ২১৪ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে (বৃদ্ধি ৭%) এবং রপ্তানি হয়েছে ৮২ কোটি ডলারের পণ্য (বৃদ্ধি ১১%)। এনবিআরের হিসাবে, গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৯৩৮ কোটি ডলার, যার মধ্যে চীনের অংশ ১৯%, যুক্তরাষ্ট্রের ১১% এবং ভারতের ৯%। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চীন ও ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্যের বড় অংশই রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের সুফল পেতে প্রতিশ্রুত শুল্কসুবিধা দ্রুত কার্যকর করা জরুরি।

দেখা গেছে, গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি বেড়েছে ৪৩ শতাংশ।

.এনবিআরের হিসাবে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য আমদানি ছিল ৭ হাজার ৩১২ কোটি ডলারের।