লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৬:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো ইবাদত: মানবসেবার গুরুত্ব ও ফজিলত

পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদে হাজারো মানুষ নানা দুর্যোগ ও বিপর্যয়ে আক্রান্ত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। হতদরিদ্র মানুষগুলো দুঃখে, শোকে, বেদনায়, যন্ত্রণায় এবং হতাশায় জর্জরিত হয়ে দিনাতিপাত করে। অসহায় মা নিজের কথা ভুলে জীর্ণ-শীর্ণ কঙ্কালসার ক্ষুধার্ত শিশুর কান্নায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। বার্ধক্যের জরাজীর্ণতা, ক্ষুধার যন্ত্রণা, রোগের তীব্রতা এবং আর্থিক অসচ্ছলতায় ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জীবনের চরাই-উতরাই পাড়ি দেয় অসংখ্য মানুষ। তাদের বিক্ষত মনের বুকফাটা আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। আক্ষেপের বিষয় হলো, মানবিকতার বাণী প্রচারকারী তথাকথিত সুশীল সমাজ তাদের পাশে নেই। দানে-বিসর্জনে এগিয়ে এসে তাদের মলিন চেহারায় হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে না কেউ। অথচ আমাদের আবির্ভাবই হয়েছে মানবতার কল্যাণ সাধনের জন্য। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি। মানবতার কল্যাণে তোমাদের অস্তিত্ব দান করা হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।’ (সুরা আলে ইমরান : ১১০)।

মানবতার চিরকল্যাণকামী প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) জীবনের পরতে পরতে আমাদের শিখিয়েছেন মানবসেবার আলোকোজ্জল আদর্শ ও প্রাণীর সেবার দর্শন। বঞ্চিত, আক্রান্ত ও পীড়িতদের জন্য তার হৃদয়ে প্রোথিত ছিল গভীর মমতা, নিখাদ ভালোবাসা ও পরম সহানুভূতি। বিপদাপদে তিনি মানুষের পাশে দাঁড়াতেন হৃদয়ের ডানা বিছিয়ে। ওহির প্রথম সাক্ষাতে যখন তিনি শঙ্কিত ও কম্পিত হয়ে পড়েন, তখন তার সহধর্মিণী খাদিজাতুল কোবরা (রা.) তাকে সান্ত্বনা দিয়ে সাহস জুগিয়ে বলেছিলেন, ‘আল্লাহতায়ালা আপনাকে কখনও অপমানিত করবেন না। কারণ, আপনি তো আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্প্রীতি বজায় রাখেন, অসহায়দের ভার বহন করেন, নিঃস্বকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন, অতিথিকে আপ্যায়ন করেন এবং সত্যের পথে বিপদগ্রস্তদের সহযোগিতা করেন।’ (বোখারি : ৩)।

পার্থিব জীবনে সুখ সব সময় স্থায়ী হয় না। কখনও কুসুমাস্তীর্ণ জীবনযাত্রা কণ্টকাকীর্ণ হয়ে ওঠে, নির্মল আকাশ ঢেকে যায় বিষণ্ণতার কালো মেঘে। দুনিয়ালোভী ধনীদের দুয়ার বন্ধ হয়ে যায়, স্বার্থপরতার বিষবাষ্পে রক্তের আত্মীয়রাও দূরে সরে যায়। উপকারী বন্ধুর দুর্দিনে অনেকেই পাশে দাঁড়ায় না। অথচ রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ঈমানদারের একটি পার্থিব কষ্ট লাঘব করবে, আল্লাহতায়ালা তার কেয়ামত দিবসের একটি কষ্ট লাঘব করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবী মানুষকে ছাড় দেবে, আল্লাহতায়ালা ইহ-পরকালে তাকে ছাড় দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহতায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।’ (মুসলিম : ২৬৯৯)। তিনি আরও বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা দয়ালুদের ওপর দয়া করেন। যারা জমিনে বসবাস করছে, তাদের প্রতি তোমরা দয়া কর; তাহলে যিনি আকাশে আছেন, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (তিরমিজি : ১৯২৪)।

মোমিনের প্রতিটি কাজ হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। ইখলাসশূন্য আমলের কোনো মূল্য নেই। লৌকিকতাপূর্ণ আমল ভঙ্গুর পৃথিবীতে জমকালো দেখালেও পরকালে এর কোনো দাম নেই। বিশুদ্ধ নিয়তের মাধ্যমেই মোমিনের প্রতিটি কাজ ইবাদতে পরিণত হয়। মানুষের বাহবা পাওয়ার মনোভাবে কৃত আমল জাহান্নামে যাওয়ার কারণও হতে পারে (মুসলিম : ৪৮১৭)।

প্রজ্ঞাময়ের লীলায় ধন ও মনের শুভমিলন ঘটে খুব কম মানুষের জীবনে। যার হৃদয়ে প্রশস্ততা আছে, সে দানে মুক্তহস্ত হয়। দান-সুখের উল্লাসে তার চোখে-মুখে ফুটে ওঠে অপার্থিব হাসি। অথচ মানুষ এখন এমনভাবে এগিয়ে আসে, যেখানে উপকারের বদলা পাওয়ার আশা থাকে। কিন্তু আল্লাহর প্রিয় বান্দারা নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা আল্লাহর ভালোবাসায় মিসকিন, এতিম ও বন্দিদের খাবার দান করে। (আর তাদের বলে,) আমরা তো তোমাদের খাওয়াই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। আমরা তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না এবং কৃতজ্ঞতাও নই।’ (সুরা দাহর : ৮-৯)।

মানবসেবার একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে ব্যক্তিগত বা ঘরোয়া সদকা বাক্স। এতে প্রতিদিন সাধ্যমতো খুচরা নোট রাখা যেতে পারে। পরিবারের সব সদস্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে অংশ নিলে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই দানের প্রতি উৎসাহিত হবে এবং মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন পরোপকারী হিসেবে গড়ে উঠবে। মাস শেষে এই টাকা গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিতরণ করলে তাদের মনের ভাঙন ও দুঃখবোধের প্লাবন কিছুটা হলেও কমতে পারে। দাতার জন্য তাদের দোয়া সরাসরি আরশে আজিমে কড়া নাড়বে। বস্তুত আমাদের কাছে যা জমা থাকবে তা এক সময় নিঃশেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আল্লাহর কাছে যা পাঠিয়ে দেব তা পরকালীন সঞ্চয় হিসেবে স্থায়ী হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমাদের কাছে যা কিছু আছে, তা নিঃশেষ হয়ে যাবে; আর আল্লাহর কাছে যা আছে, তা স্থায়ী।’ (সুরা নাহল : ৯৬)। তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা যে কোনো সৎকর্ম নিজেদের কল্যাণার্থে সামনে (আখেরাতে) প্রেরণ করবে, আল্লাহর কাছে তা পাবে। নিশ্চয় তোমরা যে কোনো কাজ কর, আল্লাহ তা দেখছেন।’ (সুরা বাকারা : ১১০)।

জনপ্রিয় সংবাদ

নেপালে ভয়াবহ বন্যায় ১৭ জনের মরদেহ উদ্ধার, নিখোঁজ ৩৮৪ পর্যটক

অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো ইবাদত: মানবসেবার গুরুত্ব ও ফজিলত

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:১০:০৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদে হাজারো মানুষ নানা দুর্যোগ ও বিপর্যয়ে আক্রান্ত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। হতদরিদ্র মানুষগুলো দুঃখে, শোকে, বেদনায়, যন্ত্রণায় এবং হতাশায় জর্জরিত হয়ে দিনাতিপাত করে। অসহায় মা নিজের কথা ভুলে জীর্ণ-শীর্ণ কঙ্কালসার ক্ষুধার্ত শিশুর কান্নায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। বার্ধক্যের জরাজীর্ণতা, ক্ষুধার যন্ত্রণা, রোগের তীব্রতা এবং আর্থিক অসচ্ছলতায় ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জীবনের চরাই-উতরাই পাড়ি দেয় অসংখ্য মানুষ। তাদের বিক্ষত মনের বুকফাটা আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। আক্ষেপের বিষয় হলো, মানবিকতার বাণী প্রচারকারী তথাকথিত সুশীল সমাজ তাদের পাশে নেই। দানে-বিসর্জনে এগিয়ে এসে তাদের মলিন চেহারায় হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে না কেউ। অথচ আমাদের আবির্ভাবই হয়েছে মানবতার কল্যাণ সাধনের জন্য। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি। মানবতার কল্যাণে তোমাদের অস্তিত্ব দান করা হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।’ (সুরা আলে ইমরান : ১১০)।

মানবতার চিরকল্যাণকামী প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) জীবনের পরতে পরতে আমাদের শিখিয়েছেন মানবসেবার আলোকোজ্জল আদর্শ ও প্রাণীর সেবার দর্শন। বঞ্চিত, আক্রান্ত ও পীড়িতদের জন্য তার হৃদয়ে প্রোথিত ছিল গভীর মমতা, নিখাদ ভালোবাসা ও পরম সহানুভূতি। বিপদাপদে তিনি মানুষের পাশে দাঁড়াতেন হৃদয়ের ডানা বিছিয়ে। ওহির প্রথম সাক্ষাতে যখন তিনি শঙ্কিত ও কম্পিত হয়ে পড়েন, তখন তার সহধর্মিণী খাদিজাতুল কোবরা (রা.) তাকে সান্ত্বনা দিয়ে সাহস জুগিয়ে বলেছিলেন, ‘আল্লাহতায়ালা আপনাকে কখনও অপমানিত করবেন না। কারণ, আপনি তো আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্প্রীতি বজায় রাখেন, অসহায়দের ভার বহন করেন, নিঃস্বকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন, অতিথিকে আপ্যায়ন করেন এবং সত্যের পথে বিপদগ্রস্তদের সহযোগিতা করেন।’ (বোখারি : ৩)।

পার্থিব জীবনে সুখ সব সময় স্থায়ী হয় না। কখনও কুসুমাস্তীর্ণ জীবনযাত্রা কণ্টকাকীর্ণ হয়ে ওঠে, নির্মল আকাশ ঢেকে যায় বিষণ্ণতার কালো মেঘে। দুনিয়ালোভী ধনীদের দুয়ার বন্ধ হয়ে যায়, স্বার্থপরতার বিষবাষ্পে রক্তের আত্মীয়রাও দূরে সরে যায়। উপকারী বন্ধুর দুর্দিনে অনেকেই পাশে দাঁড়ায় না। অথচ রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ঈমানদারের একটি পার্থিব কষ্ট লাঘব করবে, আল্লাহতায়ালা তার কেয়ামত দিবসের একটি কষ্ট লাঘব করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবী মানুষকে ছাড় দেবে, আল্লাহতায়ালা ইহ-পরকালে তাকে ছাড় দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহতায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।’ (মুসলিম : ২৬৯৯)। তিনি আরও বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা দয়ালুদের ওপর দয়া করেন। যারা জমিনে বসবাস করছে, তাদের প্রতি তোমরা দয়া কর; তাহলে যিনি আকাশে আছেন, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (তিরমিজি : ১৯২৪)।

মোমিনের প্রতিটি কাজ হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। ইখলাসশূন্য আমলের কোনো মূল্য নেই। লৌকিকতাপূর্ণ আমল ভঙ্গুর পৃথিবীতে জমকালো দেখালেও পরকালে এর কোনো দাম নেই। বিশুদ্ধ নিয়তের মাধ্যমেই মোমিনের প্রতিটি কাজ ইবাদতে পরিণত হয়। মানুষের বাহবা পাওয়ার মনোভাবে কৃত আমল জাহান্নামে যাওয়ার কারণও হতে পারে (মুসলিম : ৪৮১৭)।

প্রজ্ঞাময়ের লীলায় ধন ও মনের শুভমিলন ঘটে খুব কম মানুষের জীবনে। যার হৃদয়ে প্রশস্ততা আছে, সে দানে মুক্তহস্ত হয়। দান-সুখের উল্লাসে তার চোখে-মুখে ফুটে ওঠে অপার্থিব হাসি। অথচ মানুষ এখন এমনভাবে এগিয়ে আসে, যেখানে উপকারের বদলা পাওয়ার আশা থাকে। কিন্তু আল্লাহর প্রিয় বান্দারা নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা আল্লাহর ভালোবাসায় মিসকিন, এতিম ও বন্দিদের খাবার দান করে। (আর তাদের বলে,) আমরা তো তোমাদের খাওয়াই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। আমরা তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না এবং কৃতজ্ঞতাও নই।’ (সুরা দাহর : ৮-৯)।

মানবসেবার একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে ব্যক্তিগত বা ঘরোয়া সদকা বাক্স। এতে প্রতিদিন সাধ্যমতো খুচরা নোট রাখা যেতে পারে। পরিবারের সব সদস্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে অংশ নিলে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই দানের প্রতি উৎসাহিত হবে এবং মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন পরোপকারী হিসেবে গড়ে উঠবে। মাস শেষে এই টাকা গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিতরণ করলে তাদের মনের ভাঙন ও দুঃখবোধের প্লাবন কিছুটা হলেও কমতে পারে। দাতার জন্য তাদের দোয়া সরাসরি আরশে আজিমে কড়া নাড়বে। বস্তুত আমাদের কাছে যা জমা থাকবে তা এক সময় নিঃশেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আল্লাহর কাছে যা পাঠিয়ে দেব তা পরকালীন সঞ্চয় হিসেবে স্থায়ী হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমাদের কাছে যা কিছু আছে, তা নিঃশেষ হয়ে যাবে; আর আল্লাহর কাছে যা আছে, তা স্থায়ী।’ (সুরা নাহল : ৯৬)। তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা যে কোনো সৎকর্ম নিজেদের কল্যাণার্থে সামনে (আখেরাতে) প্রেরণ করবে, আল্লাহর কাছে তা পাবে। নিশ্চয় তোমরা যে কোনো কাজ কর, আল্লাহ তা দেখছেন।’ (সুরা বাকারা : ১১০)।