লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১০:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাব আল-মানদেবে হুতি নিয়ন্ত্রণ: ঝুঁকিতে বাংলাদেশের ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জন্য সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে জ্বালানি তেল নিয়ে গত ২৩ জুলাই যাত্রা শুরু করেছিল ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামের একটি ট্যাংকার। স্বাভাবিক সময়ে বাব আল-মানদেব প্রণালি হয়ে মাত্র ১৬ দিনে জাহাজটি চট্টগ্রামে পৌঁছাতে পারত। কিন্তু হামলার ঝুঁকি এড়াতে বাব আল-মানদেব এড়িয়ে সুয়েজ খাল, ভূমধ্যসাগর ও আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে গত শনিবার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে ট্যাংকারটি। এই বিকল্প পথে জাহাজটির আসতে সময় লেগেছে প্রায় ৫০ দিন। জাহাজটির স্থানীয় প্রতিনিধি প্রাইম ওশেন ট্রেড লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (অপারেশনস) পি কে রয় জানান, এভাবে ঘুরতি পথে আসার কারণে একটি ট্যাংকারেই বাড়তি প্রায় ৪০ লাখ ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ায় জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি ইরান যুদ্ধের কারণে ব্যাহত হওয়ার পর সৌদি আরব থেকে তেল আনার বিকল্প পথ হয়ে উঠেছিল লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালি। কিন্তু ইরান-সমর্থিত হুতিরা ইয়েমেনের মোখা বন্দর ও বাব আল-মানদেবের কৌশলগত পেরিম বা মাইয়ুন দ্বীপ দখল করায় এই আন্তর্জাতিক নৌপথে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালো হয়েছে। হুতিরা দাবি করেছে যে সৌদি আরব ছাড়া অন্য দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ, তবে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জাহাজমালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তীব্র হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এই সংকট শুধু জ্বালানিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামগ্রিক বাণিজ্যের ওপর বড় ধাক্কা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব, মিসর, মরক্কো, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ৩ হাজার ৫৫১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং আমদানি করেছে ১ হাজার ৯৩ কোটি ডলারের পণ্য। এই অঞ্চলগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ৪ হাজার ৬৪৫ কোটি (৪৬ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন) ডলার, যা দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৩৯ শতাংশ। আরও আশঙ্কাজনক হলো, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৭৭ শতাংশ এবং আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশ এই বাব আল-মানদেব ও সুয়েজনির্ভর পথেই যাতায়াত করে।

হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হলে জাহাজগুলো বাব আল-মানদেব এড়িয়ে উত্তমাশা অন্তরিপ ঘুরে চলাচল করতে বাধ্য হবে। শিপিং এজেন্টদের হিসাব অনুযায়ী, এতে প্রতিটি যাত্রায় অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ দিন সময় বেশি লাগবে, যা জাহাজের জ্বালানি ব্যবহার ও ভাড়া বাড়িয়ে দেবে। তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, পণ্য পরিবহনের এই বাড়তি ভাড়া বিদেশি ক্রেতারা পরিশোধ করলেও পরোক্ষ চাপ শেষ পর্যন্ত দেশীয় রপ্তানিকারকদের ওপরেই পড়বে। বিশেষ করে তুরস্ক থেকে তৈরি পোশাকের কাঁচামাল এবং আফ্রিকা থেকে তুলা আমদানিতে বিলম্ব হলে উৎপাদন ও রপ্তানির সময়সূচি বড় ধরনের সংকটে পড়বে।

জ্বালানি খাতের সংকট ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে কোনো জাহাজ আসছে না বললেই চলে, ফলে বাব আল-মানদেবের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এই পথে বিঘ্ন ঘটলে এলএনজি, এলপিজি ও সারসহ বিভিন্ন পণ্য সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা ও বিমা ব্যয় বাড়বে। এর আগে গত মার্চ ও এপ্রিলে দেশজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছিল এবং বর্তমানে পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো সম্ভব না হওয়ায় লোডশেডিং হচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে যেসব প্রতিযোগী দেশ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল নয়, তাদের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা কমে যাবে। তিনি সরকারকে জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎস খোঁজার পাশাপাশি মধ্য মেয়াদে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি লড়াইয়ের চ্যালেঞ্জ জানালেন ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান

বাব আল-মানদেবে হুতি নিয়ন্ত্রণ: ঝুঁকিতে বাংলাদেশের ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:৪০:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জন্য সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে জ্বালানি তেল নিয়ে গত ২৩ জুলাই যাত্রা শুরু করেছিল ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামের একটি ট্যাংকার। স্বাভাবিক সময়ে বাব আল-মানদেব প্রণালি হয়ে মাত্র ১৬ দিনে জাহাজটি চট্টগ্রামে পৌঁছাতে পারত। কিন্তু হামলার ঝুঁকি এড়াতে বাব আল-মানদেব এড়িয়ে সুয়েজ খাল, ভূমধ্যসাগর ও আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে গত শনিবার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে ট্যাংকারটি। এই বিকল্প পথে জাহাজটির আসতে সময় লেগেছে প্রায় ৫০ দিন। জাহাজটির স্থানীয় প্রতিনিধি প্রাইম ওশেন ট্রেড লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (অপারেশনস) পি কে রয় জানান, এভাবে ঘুরতি পথে আসার কারণে একটি ট্যাংকারেই বাড়তি প্রায় ৪০ লাখ ডলার পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ায় জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি ইরান যুদ্ধের কারণে ব্যাহত হওয়ার পর সৌদি আরব থেকে তেল আনার বিকল্প পথ হয়ে উঠেছিল লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালি। কিন্তু ইরান-সমর্থিত হুতিরা ইয়েমেনের মোখা বন্দর ও বাব আল-মানদেবের কৌশলগত পেরিম বা মাইয়ুন দ্বীপ দখল করায় এই আন্তর্জাতিক নৌপথে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালো হয়েছে। হুতিরা দাবি করেছে যে সৌদি আরব ছাড়া অন্য দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ, তবে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জাহাজমালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তীব্র হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এই সংকট শুধু জ্বালানিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামগ্রিক বাণিজ্যের ওপর বড় ধাক্কা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব, মিসর, মরক্কো, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ৩ হাজার ৫৫১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং আমদানি করেছে ১ হাজার ৯৩ কোটি ডলারের পণ্য। এই অঞ্চলগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ৪ হাজার ৬৪৫ কোটি (৪৬ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন) ডলার, যা দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৩৯ শতাংশ। আরও আশঙ্কাজনক হলো, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৭৭ শতাংশ এবং আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশ এই বাব আল-মানদেব ও সুয়েজনির্ভর পথেই যাতায়াত করে।

হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হলে জাহাজগুলো বাব আল-মানদেব এড়িয়ে উত্তমাশা অন্তরিপ ঘুরে চলাচল করতে বাধ্য হবে। শিপিং এজেন্টদের হিসাব অনুযায়ী, এতে প্রতিটি যাত্রায় অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ দিন সময় বেশি লাগবে, যা জাহাজের জ্বালানি ব্যবহার ও ভাড়া বাড়িয়ে দেবে। তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, পণ্য পরিবহনের এই বাড়তি ভাড়া বিদেশি ক্রেতারা পরিশোধ করলেও পরোক্ষ চাপ শেষ পর্যন্ত দেশীয় রপ্তানিকারকদের ওপরেই পড়বে। বিশেষ করে তুরস্ক থেকে তৈরি পোশাকের কাঁচামাল এবং আফ্রিকা থেকে তুলা আমদানিতে বিলম্ব হলে উৎপাদন ও রপ্তানির সময়সূচি বড় ধরনের সংকটে পড়বে।

জ্বালানি খাতের সংকট ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে কোনো জাহাজ আসছে না বললেই চলে, ফলে বাব আল-মানদেবের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এই পথে বিঘ্ন ঘটলে এলএনজি, এলপিজি ও সারসহ বিভিন্ন পণ্য সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা ও বিমা ব্যয় বাড়বে। এর আগে গত মার্চ ও এপ্রিলে দেশজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছিল এবং বর্তমানে পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো সম্ভব না হওয়ায় লোডশেডিং হচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে যেসব প্রতিযোগী দেশ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল নয়, তাদের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা কমে যাবে। তিনি সরকারকে জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎস খোঁজার পাশাপাশি মধ্য মেয়াদে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন।