লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:৪৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাফিলতি ও উদাসীনতা যেভাবে মানুষের জীবন ধ্বংস করে

মানুষের মন ও হৃদয় প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়, তাই হৃদয়ের শুদ্ধি ও নিয়ন্ত্রণের জন্য সবসময় নজরদারি ও শিক্ষার প্রয়োজন। সুরা নাজিয়াতের ৪০-৪১ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, 'পক্ষান্তরে যে স্বীয় প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে ও প্রবৃত্তি থেকে নিজকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।' রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবী মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা.) হৃদয়ের এই অস্থিরতার বিষয়ে সতর্ক করতেন। তিনি বলতেন, রাসুল (সা.)-কে তিনি বলতে শুনেছেন, আদম সন্তানের হৃদয় ফুটন্ত হাঁড়ির পানির মতো অস্থিরভাবে পরিবর্তিত হয়। এক কবি তাই যথার্থই বলেছেন, মানুষকে 'ইনসান' বলা হয় কারণ সে ভুলে যায়, আর হৃদয় বারবার বদলায় বলেই এর নাম রাখা হয়েছে হৃদয়।

উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নবীজি (সা.)-কে জিজ্ঞাস করেছিলেন যে, তিনি কেন সবসময় 'হে অন্তর পরিবর্তনকারী, আমার হৃদয়কে তোমার দ্বীনের ওপর স্থির রাখো' এই দোয়াটি বেশি করেন। উত্তরে রাসুল (সা.) জানিয়েছিলেন, মানুষের হৃদয় আল্লাহর আঙুল দুটির মাঝে থাকে, যাকে ইচ্ছা তিনি দৃঢ় রাখেন, আবার যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। মানুষের জীবনের ভয়াবহ বিপদগুলোর একটি হলো গাফলত, যা অলসতা ও উদাসীনতাকে বোঝায়। এটি এমন এক দুঃখ যা মানুষের সময় অপচয় করে, শক্তি নিঃশেষ করে দেয় এবং হৃদয়কে মৃতপ্রায় করে ফেলে। গাফলত মূলত আল্লাহর ভয় না করা এবং ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার নামান্তর।

গাফলতের ফলে মানুষ তার সামর্থ্য নষ্ট করে এমন সব কাজে সময় ব্যয় করে যার কোনো ইহকালীন বা পরকালীন উপকার নেই। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ মানুষকে গাফলত থেকে সতর্ক করেছেন। সুরা ইউনুসের ৯২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'অবশ্যই মানুষের মধ্যে অনেকে আমার বহু নিদর্শন সম্বন্ধে গাফিল।' আবার সুরা রুমের ৬-৮ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অধিকাংশ মানুষ পার্থিব জীবনের বাহ্যিক বিষয় জানলেও আখেরাতের বিষয়ে গাফিল এবং আল্লাহর সাক্ষাতে অবিশ্বাসী।

শয়তানের কুমন্ত্রণা মানুষের জন্য একটি পরীক্ষা। যদি কোনো মুমিন গাফলতে নিমজ্জিত হয়, তবে তাকে দ্রুত তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে। সুরা আরাফের ২০০-২০২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, শয়তানের কুমন্ত্রণা প্ররোচিত করলে আল্লাহর শরণাপন্ন হতে। যারা তাকওয়ার অধিকারী, তারা আল্লাহকে স্মরণ করার মাধ্যমে তৎক্ষণাৎ সচেতন হয়ে যায়। গাফলত হৃদয়ে পর্দা তৈরি করে, যা সত্য থেকে মানুষকে আড়াল করে রাখে। অনেকে তাওবা করার সিদ্ধান্ত পরে নেওয়ার কথা ভেবে সময় নষ্ট করে, অথচ সময় দ্রুত পেরিয়ে যায় এবং সুযোগ আর ফিরে আসে না।

গাফলতের অন্যতম কারণ হলো আখেরাতের প্রস্তুতির অভাব। সুরা ইউনুসের ৭-৮ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, যারা আমার সাক্ষাতের আশা করে না ও পার্থিব জীবনেই সন্তুষ্ট থাকে, তাদের আবাস হবে দোজখ। এছাড়া সময় নষ্ট করা এবং অবসরকে গুরুত্ব না দেওয়া গাফলতের বড় কারণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, দুটি নিয়ামত—সুস্থতা ও অবসর—এর ব্যাপারে মানুষ প্রতারিত হয়। কিয়ামতের দিনে জীবনের হিসাব দেওয়ার সময় যৌবনের ব্যবহারের বিষয়েও জিজ্ঞাসিত হতে হবে।

সঙ্গদোষও গাফলতের অন্যতম কারণ। আল্লাহ সুরা কাহফের ২৮ নম্বর আয়াতে নবীজিকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তিনি এমন লোকদের সংসর্গ ত্যাগ করেন যাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণে অমনোযোগী। বর্তমানে মোবাইল, টিভি ও ডিজিটাল স্ক্রিনের অতিরিক্ত ব্যবহার গাফলতের বড় দরজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ বিভ্রান্তিকর দৃশ্যে ডুবে সময় নষ্ট করে, যার ফলে কুরআন পড়া বা আল্লাহর কাছে একান্তে প্রার্থনা করার সময়ও অনেকে পায় না। সুরা আম্বিয়ার ১-৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সতর্ক করে বলেছেন, মানুষের হিসাবের সময় আসন্ন, অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে আছে।

এক কবি বলেছেন, 'মানুষকে বলা হয় ইনসান, কারণ সে ভুলে যায়। আর হৃদয়কে হৃদয় এ জন্য বলা হয় যে, এটি বারবার বদলায়।' শাহর ইবনে হাওশাব (রহ.) বলেন, 'আমি উম্মে সালামা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে মুমিনদের মা, আল্লাহর রাসুল (সা.) আপনার ঘরে থাকলে সবচেয়ে বেশি কী দোয়া করতেন? তিনি বললেন, তিনি বেশি বেশি বলতেন, হে অন্তর পরিবর্তনকারী, আমার হৃদয়কে তোমার দ্বীনের ওপর স্থির রাখো।' আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি এত বেশি এই দোয়া কেন করেন? তিনি বললেন, হে উম্মে সালামা, মানুষের হৃদয় আল্লাহর আঙুল দুটির মাঝে থাকে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছে দৃঢ় রাখেন, আর যাকে ইচ্ছে পথভ্রষ্ট করে দেন।' (তিরমিজি : ৩৫২২)।

আরেকটি কারণ হলো সময় নষ্ট করা। অবসর সময়কে মূল্য না দেওয়া। তখন মানুষ উদ্দেশ্যহীন হয়ে বেঁচে থাকে, আর জীবন বৃথা যায়। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, 'দুটি নিয়ামত আছে, যেগুলোর ব্যাপারে অনেক মানুষ প্রতারিত হয়: সুস্থতা ও অবসর।' (বোখারি : ৬৪১২)। বিশ্বনবী (সা.) আরও বলেছেন, 'কিয়ামতের দিনে কোনো বান্দার পা সরবে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞেস করা হবে—তার জীবন কোথায় কাটাল, তার যৌবন কোথায় শেষ করল।' (তিরমিজি : ২৪১৬)।

জনপ্রিয় সংবাদ

সিইসির পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বিরোধীদের বড় বিক্ষোভ, যোগ দিচ্ছেন মমতা

গাফিলতি ও উদাসীনতা যেভাবে মানুষের জীবন ধ্বংস করে

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:৩১:৪১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

মানুষের মন ও হৃদয় প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়, তাই হৃদয়ের শুদ্ধি ও নিয়ন্ত্রণের জন্য সবসময় নজরদারি ও শিক্ষার প্রয়োজন। সুরা নাজিয়াতের ৪০-৪১ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, 'পক্ষান্তরে যে স্বীয় প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে ও প্রবৃত্তি থেকে নিজকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।' রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবী মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা.) হৃদয়ের এই অস্থিরতার বিষয়ে সতর্ক করতেন। তিনি বলতেন, রাসুল (সা.)-কে তিনি বলতে শুনেছেন, আদম সন্তানের হৃদয় ফুটন্ত হাঁড়ির পানির মতো অস্থিরভাবে পরিবর্তিত হয়। এক কবি তাই যথার্থই বলেছেন, মানুষকে 'ইনসান' বলা হয় কারণ সে ভুলে যায়, আর হৃদয় বারবার বদলায় বলেই এর নাম রাখা হয়েছে হৃদয়।

উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নবীজি (সা.)-কে জিজ্ঞাস করেছিলেন যে, তিনি কেন সবসময় 'হে অন্তর পরিবর্তনকারী, আমার হৃদয়কে তোমার দ্বীনের ওপর স্থির রাখো' এই দোয়াটি বেশি করেন। উত্তরে রাসুল (সা.) জানিয়েছিলেন, মানুষের হৃদয় আল্লাহর আঙুল দুটির মাঝে থাকে, যাকে ইচ্ছা তিনি দৃঢ় রাখেন, আবার যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন। মানুষের জীবনের ভয়াবহ বিপদগুলোর একটি হলো গাফলত, যা অলসতা ও উদাসীনতাকে বোঝায়। এটি এমন এক দুঃখ যা মানুষের সময় অপচয় করে, শক্তি নিঃশেষ করে দেয় এবং হৃদয়কে মৃতপ্রায় করে ফেলে। গাফলত মূলত আল্লাহর ভয় না করা এবং ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার নামান্তর।

গাফলতের ফলে মানুষ তার সামর্থ্য নষ্ট করে এমন সব কাজে সময় ব্যয় করে যার কোনো ইহকালীন বা পরকালীন উপকার নেই। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ মানুষকে গাফলত থেকে সতর্ক করেছেন। সুরা ইউনুসের ৯২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'অবশ্যই মানুষের মধ্যে অনেকে আমার বহু নিদর্শন সম্বন্ধে গাফিল।' আবার সুরা রুমের ৬-৮ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অধিকাংশ মানুষ পার্থিব জীবনের বাহ্যিক বিষয় জানলেও আখেরাতের বিষয়ে গাফিল এবং আল্লাহর সাক্ষাতে অবিশ্বাসী।

শয়তানের কুমন্ত্রণা মানুষের জন্য একটি পরীক্ষা। যদি কোনো মুমিন গাফলতে নিমজ্জিত হয়, তবে তাকে দ্রুত তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে। সুরা আরাফের ২০০-২০২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, শয়তানের কুমন্ত্রণা প্ররোচিত করলে আল্লাহর শরণাপন্ন হতে। যারা তাকওয়ার অধিকারী, তারা আল্লাহকে স্মরণ করার মাধ্যমে তৎক্ষণাৎ সচেতন হয়ে যায়। গাফলত হৃদয়ে পর্দা তৈরি করে, যা সত্য থেকে মানুষকে আড়াল করে রাখে। অনেকে তাওবা করার সিদ্ধান্ত পরে নেওয়ার কথা ভেবে সময় নষ্ট করে, অথচ সময় দ্রুত পেরিয়ে যায় এবং সুযোগ আর ফিরে আসে না।

গাফলতের অন্যতম কারণ হলো আখেরাতের প্রস্তুতির অভাব। সুরা ইউনুসের ৭-৮ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, যারা আমার সাক্ষাতের আশা করে না ও পার্থিব জীবনেই সন্তুষ্ট থাকে, তাদের আবাস হবে দোজখ। এছাড়া সময় নষ্ট করা এবং অবসরকে গুরুত্ব না দেওয়া গাফলতের বড় কারণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, দুটি নিয়ামত—সুস্থতা ও অবসর—এর ব্যাপারে মানুষ প্রতারিত হয়। কিয়ামতের দিনে জীবনের হিসাব দেওয়ার সময় যৌবনের ব্যবহারের বিষয়েও জিজ্ঞাসিত হতে হবে।

সঙ্গদোষও গাফলতের অন্যতম কারণ। আল্লাহ সুরা কাহফের ২৮ নম্বর আয়াতে নবীজিকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তিনি এমন লোকদের সংসর্গ ত্যাগ করেন যাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণে অমনোযোগী। বর্তমানে মোবাইল, টিভি ও ডিজিটাল স্ক্রিনের অতিরিক্ত ব্যবহার গাফলতের বড় দরজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ বিভ্রান্তিকর দৃশ্যে ডুবে সময় নষ্ট করে, যার ফলে কুরআন পড়া বা আল্লাহর কাছে একান্তে প্রার্থনা করার সময়ও অনেকে পায় না। সুরা আম্বিয়ার ১-৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সতর্ক করে বলেছেন, মানুষের হিসাবের সময় আসন্ন, অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে আছে।

এক কবি বলেছেন, 'মানুষকে বলা হয় ইনসান, কারণ সে ভুলে যায়। আর হৃদয়কে হৃদয় এ জন্য বলা হয় যে, এটি বারবার বদলায়।' শাহর ইবনে হাওশাব (রহ.) বলেন, 'আমি উম্মে সালামা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে মুমিনদের মা, আল্লাহর রাসুল (সা.) আপনার ঘরে থাকলে সবচেয়ে বেশি কী দোয়া করতেন? তিনি বললেন, তিনি বেশি বেশি বলতেন, হে অন্তর পরিবর্তনকারী, আমার হৃদয়কে তোমার দ্বীনের ওপর স্থির রাখো।' আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি এত বেশি এই দোয়া কেন করেন? তিনি বললেন, হে উম্মে সালামা, মানুষের হৃদয় আল্লাহর আঙুল দুটির মাঝে থাকে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছে দৃঢ় রাখেন, আর যাকে ইচ্ছে পথভ্রষ্ট করে দেন।' (তিরমিজি : ৩৫২২)।

আরেকটি কারণ হলো সময় নষ্ট করা। অবসর সময়কে মূল্য না দেওয়া। তখন মানুষ উদ্দেশ্যহীন হয়ে বেঁচে থাকে, আর জীবন বৃথা যায়। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, 'দুটি নিয়ামত আছে, যেগুলোর ব্যাপারে অনেক মানুষ প্রতারিত হয়: সুস্থতা ও অবসর।' (বোখারি : ৬৪১২)। বিশ্বনবী (সা.) আরও বলেছেন, 'কিয়ামতের দিনে কোনো বান্দার পা সরবে না, যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞেস করা হবে—তার জীবন কোথায় কাটাল, তার যৌবন কোথায় শেষ করল।' (তিরমিজি : ২৪১৬)।