লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১০:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্যারিসে সহিংসতা ও লুটপাট: ২০২৭ সালের ফরাসি নির্বাচন ঘিরে নতুন বিতর্ক

স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, শিল্প ও মুক্তচিন্তার ঐতিহাসিক প্রতীক ফরাসি রাজধানী প্যারিসের রাস্তায় সম্প্রতি নেমে এসেছে চরম অশান্তি। ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সুন্দর এই শহরের বুকে ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি ভবনে হামলার নানা চিত্র সামনে এসেছে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, শিক্ষাব্যবস্থা ও সরকারি পরিষেবার অবনতি এবং বাড়তে থাকা সামাজিক বৈষম্য নিয়ে জনমনে জমে থাকা ক্ষোভ থেকেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। তবে নিছক আইনশৃঙ্খলার অবনতি ছাড়াও এই নৈরাজ্যের পেছনে রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের গভীর সংকট দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

বিক্ষোভের আড়ালে সহিংস পরিস্থিতির দায় নিয়ে ইতিমধ্যেই ফরাসি রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র কাদা ছোড়াছুড়ি। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু এই তাণ্ডবের পেছনে উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর যোগসাজশ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তৎপরতার অভিযোগ এনেছেন। অন্যদিকে বিরোধী বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলেশোঁ পুলিশের সার্বিক ভূমিকা এবং সংঘাত নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। পাশাপাশি মেরিন ল্য পেন ও জর্দান বারদেলার মতো ডানপন্থী নেতারা কড়া হাতে আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রের কঠোর পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন।

রাজনীতিবিদদের পারস্পরিক অভিযোগের বাইরে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই তাণ্ডবের প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। বিক্ষোভের সময় ঘটে যাওয়া সংঘাত ও লুটপাট কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ, নাকি এর পেছনে সংগঠিত কোনো উসকানি বা পূর্বপরিকল্পিত অর্থায়ন ছিল—তা খতিয়ে দেখার তাগিদ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা পুলিশের প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল কি না, তা-ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

ফ্রান্সের রাজনৈতিক ইতিহাসে সামাজিক ক্ষোভ থেকে জাতীয় সংকটের উদ্ভব নতুন নয়। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব রাজতন্ত্রের বৈধতা, সামাজিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকট নিরসনে আধুনিক গণতন্ত্রকে প্রভাবিত করলেও তা রক্তপাত ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের ইতিহাস বহন করে। সাম্প্রতিককালে ২০১৮ সালের 'হলুদ জ্যাকেট' বা জিলে জোন আন্দোলনও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও করনীতির প্রতিবাদ থেকে শুরু হয়ে একপর্যায়ে বড় ধরনের জাতীয় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছিল। তবে অন্যায়ের প্রতিবাদ কখনোই অন্যের জীবন ও সম্পদ ধ্বংসের লাইসেন্স হতে পারে না। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দোকান লুট করা বা শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা নষ্ট করে কোনো ন্যায়সংগত দাবি আদায় সম্ভব নয়।

সামনে থাকা ২০২৭ সালের ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে বর্তমান এই অস্থিরতার রাজনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। আগামী বছরের ১৮ এপ্রিল প্রথম দফা এবং ২ মে দ্বিতীয় দফার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সহিংসতার এই পরিবেশ নির্বাচনী বিতর্কে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। সরকার যেখানে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও নিরাপত্তা সুরক্ষায় নজর দেবে, সেখানে বিরোধী দলগুলো প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে সামনে আনবে। ডানপন্থীরা আইনশৃঙ্খলাকে প্রধান ইস্যুতে রূপ দিতে চাইবে এবং বামপন্থীরা নজর দেবে অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও সামাজিক বৈষম্যের ওপর। বিপ্লবের নামে নৈরাজ্য যেমন কাম্য নয়, তেমনই শৃঙ্খলা রক্ষার নামে নাগরিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না হওয়ার দাবিই এখন সাধারণ ফরাসিদের।

জনপ্রিয় সংবাদ

বাঁশের লাঠি দিয়ে মাদকের আস্তানা ধ্বংসের ঘোষণা প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের

প্যারিসে সহিংসতা ও লুটপাট: ২০২৭ সালের ফরাসি নির্বাচন ঘিরে নতুন বিতর্ক

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:৩২:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, শিল্প ও মুক্তচিন্তার ঐতিহাসিক প্রতীক ফরাসি রাজধানী প্যারিসের রাস্তায় সম্প্রতি নেমে এসেছে চরম অশান্তি। ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সুন্দর এই শহরের বুকে ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি ভবনে হামলার নানা চিত্র সামনে এসেছে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, শিক্ষাব্যবস্থা ও সরকারি পরিষেবার অবনতি এবং বাড়তে থাকা সামাজিক বৈষম্য নিয়ে জনমনে জমে থাকা ক্ষোভ থেকেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। তবে নিছক আইনশৃঙ্খলার অবনতি ছাড়াও এই নৈরাজ্যের পেছনে রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের গভীর সংকট দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

বিক্ষোভের আড়ালে সহিংস পরিস্থিতির দায় নিয়ে ইতিমধ্যেই ফরাসি রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র কাদা ছোড়াছুড়ি। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু এই তাণ্ডবের পেছনে উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর যোগসাজশ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তৎপরতার অভিযোগ এনেছেন। অন্যদিকে বিরোধী বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলেশোঁ পুলিশের সার্বিক ভূমিকা এবং সংঘাত নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। পাশাপাশি মেরিন ল্য পেন ও জর্দান বারদেলার মতো ডানপন্থী নেতারা কড়া হাতে আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রের কঠোর পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন।

রাজনীতিবিদদের পারস্পরিক অভিযোগের বাইরে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই তাণ্ডবের প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। বিক্ষোভের সময় ঘটে যাওয়া সংঘাত ও লুটপাট কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ, নাকি এর পেছনে সংগঠিত কোনো উসকানি বা পূর্বপরিকল্পিত অর্থায়ন ছিল—তা খতিয়ে দেখার তাগিদ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা পুলিশের প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল কি না, তা-ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

ফ্রান্সের রাজনৈতিক ইতিহাসে সামাজিক ক্ষোভ থেকে জাতীয় সংকটের উদ্ভব নতুন নয়। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব রাজতন্ত্রের বৈধতা, সামাজিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকট নিরসনে আধুনিক গণতন্ত্রকে প্রভাবিত করলেও তা রক্তপাত ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের ইতিহাস বহন করে। সাম্প্রতিককালে ২০১৮ সালের 'হলুদ জ্যাকেট' বা জিলে জোন আন্দোলনও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও করনীতির প্রতিবাদ থেকে শুরু হয়ে একপর্যায়ে বড় ধরনের জাতীয় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছিল। তবে অন্যায়ের প্রতিবাদ কখনোই অন্যের জীবন ও সম্পদ ধ্বংসের লাইসেন্স হতে পারে না। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দোকান লুট করা বা শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা নষ্ট করে কোনো ন্যায়সংগত দাবি আদায় সম্ভব নয়।

সামনে থাকা ২০২৭ সালের ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে বর্তমান এই অস্থিরতার রাজনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। আগামী বছরের ১৮ এপ্রিল প্রথম দফা এবং ২ মে দ্বিতীয় দফার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সহিংসতার এই পরিবেশ নির্বাচনী বিতর্কে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। সরকার যেখানে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও নিরাপত্তা সুরক্ষায় নজর দেবে, সেখানে বিরোধী দলগুলো প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে সামনে আনবে। ডানপন্থীরা আইনশৃঙ্খলাকে প্রধান ইস্যুতে রূপ দিতে চাইবে এবং বামপন্থীরা নজর দেবে অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও সামাজিক বৈষম্যের ওপর। বিপ্লবের নামে নৈরাজ্য যেমন কাম্য নয়, তেমনই শৃঙ্খলা রক্ষার নামে নাগরিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না হওয়ার দাবিই এখন সাধারণ ফরাসিদের।