লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০২:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নদীকে আড়াল বানিয়ে লাশ গুম, পৌনে ছয় বছরে উদ্ধার ২৪৯৪ মরদেহ

অপরাধের প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নদীকে লাশ গুমের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে অপরাধী চক্রগুলো। গত পাঁচ বছর ৯ মাসে (২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) দেশের নানা প্রান্তের নদ-নদী থেকে অন্তত ২ হাজার ৪৯৪টি মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌ পুলিশ। এর মধ্যে রয়েছে অসংখ্য হত্যাকাণ্ড, দুর্ঘটনা ও আত্মহত্যার ঘটনা। তবে লাশ উদ্ধার হলেও পচন ধরা, চেহারা বিকৃত হওয়া কিংবা ফিঙ্গারপ্রিন্ট মুছে যাওয়ার কারণে শত শত মরদেহের পরিচয় মিলছে না, যার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা।

নৌ পুলিশের সদর দপ্তরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে উদ্ধার করা হয় ২ হাজার ৬৪টি মরদেহ। বছরভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, ২০২১ সালে ৩১৮টি, ২০২২ সালে ৩৬০টি, ২০২৩ সালে ৪০৫টি, ২০২৪ সালে ৪৪০টি এবং ২০২৫ সালে ৫৪১টি লাশ পাওয়া যায়। এই পাঁচ বছরে ক্রমান্বয়ে লাশ উদ্ধারের সংখ্যা বেড়েছে, যার মধ্যে ৩৩৫টি ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। অন্যদিকে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর) নদী থেকে আরও ৪৩০টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে ৩১৪ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হলেও বাকি ১১৬ জনের পরিচয় না মেলায় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।

চলতি বছরের ওই ৯ মাসে উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে ৫৭টি ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে। বাকি ঘটনাগুলোর ময়নাতদন্ত ও তদন্তে উঠে এসেছে মৃত্যুর নানা কারণ—এর মধ্যে গোসল করতে গিয়ে ১১৬ জন, ঘুরতে গিয়ে ৫৭ জন, নৌ দুর্ঘটনায় ৩৮ জন, মাছ ধরতে গিয়ে ৩৭ জন, নৌযান থেকে পড়ে ১৯ জন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ২ জন এবং নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ১ জনের মৃত্যু হয়। অপর ১০৪ জনের মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয় করা সম্ভব না হওয়ায় অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে গত পাঁচ বছর নয় মাসে উদ্ধার হওয়া ২ হাজার ৪৯৪টি মরদেহের মধ্যে মোট ১ হাজার ৭৩৯ জনের পরিচয় মিলেছে এবং ৭৫৫ জন অজ্ঞাত হিসেবে রয়ে গেছেন। এই সময়ের মধ্যে ৩৯২টি হত্যা মামলা, ২৬টি আত্মহত্যা মামলা এবং ২ হাজার ৭৭টি অপমৃত্যুর মামলা করেছে পুলিশ।

নৌ পুলিশ পুরো দেশের নদীপথকে ১১টি অঞ্চলে ভাগ করে নজরদারি চালায়। এগুলো হলো ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, বরিশাল, ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী, টাঙ্গাইল, খুলনা ও সিলেট। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩ বছর ৯ মাসের অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ৩৯৮টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে ঢাকা অঞ্চলে। ঢাকা অঞ্চলের অধীনে বুড়িগঙ্গা, খিলক্ষেতসংলগ্ন বালু নদ, শীতলক্ষ্যার একাংশ, দোহারসংলগ্ন পদ্মা ও নরসিংদীসংলগ্ন মেঘনা নদী অন্তর্ভুক্ত। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা নারায়ণগঞ্জে ২৫৩টি, বরিশালে ২১১টি, রাজশাহীতে ১৭৭টি, চট্টগ্রামে ১৬৭টি, ফরিদপুরে ১৪৯টি, চাঁদপুরে ১২৭টি, খুলনায় ১২৭টি, কিশোরগঞ্জে ৯৪টি, টাঙ্গাইলে ৯৩টি এবং সবচেয়ে কম সিলেটে ২০টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেও ঢাকা অঞ্চলে সর্বাধিক ৭৮টি এবং সিলেটে সর্বনিম্ন ৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

নদীতে ভাসমান লাশ উদ্ধারের পর আলামতের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করা হয় এবং ডিএনএ নমুনা ও ছবি থানায় সংরক্ষণ করে মৃতদেহ দাফনের জন্য আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সম্প্রতি গত ২৩ আগস্ট ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী থেকে মাত্র ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে এক নারী, এক শিশু এবং এক তরুণ ও তরুণীর গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কেরানীগঞ্জের মীরেরবাগ কোল্ড স্টোরেজ সংলগ্ন তীরে পাওয়া নারীর গলায় কালো কাপড় ও শিশুটির শরীরে ওড়না প্যাঁচানো ছিল। কালিন্দীর মাদারীপুর ঘাটে পাওয়া তরুণ-তরুণীর হাত একসাথে বাঁধা ও আঘাতের চিহ্ন ছিল। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম ১১ দিন পর তাদের বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে। ঘটনার পর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় পৃথক দুটি হত্যা মামলা হয়েছে। নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, খুনিরা নিজেদের বাঁচাতে নদীকে বেছে নিয়েছে; ডিএনএ নমুনা রাখা হয়েছে যাতে স্বজনেরা এলে পরিচয় মেলানো যায়।

একইভাবে গত বছরের ৩০ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের একটি নদী থেকে বাঁশের সঙ্গে ওড়না দিয়ে বাঁধা অবস্থায় এক অজ্ঞাত নারীর বিবস্ত্র মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাকে বেওয়ারিশ দাফনের পর পুলিশ স্টেশনে থাকা ছবি দেখে স্বজনেরা শনাক্ত করলে জানা যায় এটি একটি হত্যাকাণ্ড এবং পরে আসামি গ্রেপ্তার হলে সে আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়। অন্যদিকে, গত বছরের ১৬ জানুয়ারি শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধার করা অটোরিকশাচালক জব্বার হাওলাদারের (৪৫) মরদেহ ছবি ও পায়ের মোজা দেখে শনাক্ত করেন তাঁর ছেলে মাহবুবুর রহমান। তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মাইনুল ইসলাম জানান, নিখোঁজের তদন্তে নেমে আল আমিনের কাছ থেকে ব্যবহৃত মোবাইল ও পরে শাওন নামের একজনকে আটক করা হয়। শাওন স্বীকার করে, নেশাজাতীয় ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে জব্বারকে আদমজী ঘাটে নদীতে ফেলে অটোরিকশা ও ফোন ছিনতাই করে সাতজন টাকা ভাগ করে নিয়েছিল। এই ঘটনায় জড়িত চক্রের সাত সদস্যকেই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে এবং চারজন আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে।

নৌ পুলিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ময়নাতদন্তে যেসব মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখা গেছে, সেখানে শ্বাসরোধ, ধর্ষণ, মাথায় আঘাত, হাত-পা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কাটা, জখম বা বস্তাবন্দী করে পানিতে ফেলে দেওয়ার বিবরণ রয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নদীতে ভেসে ওঠার আগেই লাশে পচন ধরে আঙুলের ছাপ ও চেহারা নষ্ট হয়ে যায়, ফলে অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। দ্য মেডিকোলিগ্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক মোস্তাক রহিম জানান, পচনের কারণে বা জলজ প্রাণীর আঘাতে প্রমাণের ক্ষতি হয়। গরমের দিনে ডোবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লাশ ভাসলে মৃত্যুর কারণ বোঝা সহজ হয়। তবে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর ফরেনসিক বিভাগে আধুনিক ল্যাব ও সরঞ্জামের অভাব থাকায় বিকৃত লাশের সঠিক কারণ বের করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

নৌ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) মো. রেজাউল করিম জানান, ব্যবসায়িক শত্রুতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, মাদকের প্রভাব, পরকীয়া কিংবা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং বাণিজ্যিক এলাকায় বেশি ঘটে। নদীপথে বর্ষায় সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার ও শুষ্ক মৌসুমে সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার (যার সাড়ে তিন হাজার কিমি সচল) পাহারা দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আদমজী ঘাটের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও নির্জন পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করে গোয়েন্দা নজরদারি, সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও টহল বাড়ানো হচ্ছে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, অপরাধীরা মনে করে স্রোতে লাশ ভেসে দূরবর্তী স্থানে চলে যাবে এবং পরিচয় গোপন থাকবে। এই প্রবণতা বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিবিড় মনস্তাত্ত্বিক তদন্ত ও নদীসংলগ্ন নির্জন পয়েন্টগুলোতে নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।

জনপ্রিয় সংবাদ

গর্তে আট মাস লুকিয়ে থাকার পর ড্রোনে উদ্ধার দুই পা হারানো ইউক্রেনীয় সেনা

নদীকে আড়াল বানিয়ে লাশ গুম, পৌনে ছয় বছরে উদ্ধার ২৪৯৪ মরদেহ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:৩০:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

অপরাধের প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নদীকে লাশ গুমের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে অপরাধী চক্রগুলো। গত পাঁচ বছর ৯ মাসে (২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) দেশের নানা প্রান্তের নদ-নদী থেকে অন্তত ২ হাজার ৪৯৪টি মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌ পুলিশ। এর মধ্যে রয়েছে অসংখ্য হত্যাকাণ্ড, দুর্ঘটনা ও আত্মহত্যার ঘটনা। তবে লাশ উদ্ধার হলেও পচন ধরা, চেহারা বিকৃত হওয়া কিংবা ফিঙ্গারপ্রিন্ট মুছে যাওয়ার কারণে শত শত মরদেহের পরিচয় মিলছে না, যার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা।

নৌ পুলিশের সদর দপ্তরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে উদ্ধার করা হয় ২ হাজার ৬৪টি মরদেহ। বছরভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, ২০২১ সালে ৩১৮টি, ২০২২ সালে ৩৬০টি, ২০২৩ সালে ৪০৫টি, ২০২৪ সালে ৪৪০টি এবং ২০২৫ সালে ৫৪১টি লাশ পাওয়া যায়। এই পাঁচ বছরে ক্রমান্বয়ে লাশ উদ্ধারের সংখ্যা বেড়েছে, যার মধ্যে ৩৩৫টি ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। অন্যদিকে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর) নদী থেকে আরও ৪৩০টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে ৩১৪ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হলেও বাকি ১১৬ জনের পরিচয় না মেলায় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।

চলতি বছরের ওই ৯ মাসে উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে ৫৭টি ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে। বাকি ঘটনাগুলোর ময়নাতদন্ত ও তদন্তে উঠে এসেছে মৃত্যুর নানা কারণ—এর মধ্যে গোসল করতে গিয়ে ১১৬ জন, ঘুরতে গিয়ে ৫৭ জন, নৌ দুর্ঘটনায় ৩৮ জন, মাছ ধরতে গিয়ে ৩৭ জন, নৌযান থেকে পড়ে ১৯ জন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ২ জন এবং নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ১ জনের মৃত্যু হয়। অপর ১০৪ জনের মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয় করা সম্ভব না হওয়ায় অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে গত পাঁচ বছর নয় মাসে উদ্ধার হওয়া ২ হাজার ৪৯৪টি মরদেহের মধ্যে মোট ১ হাজার ৭৩৯ জনের পরিচয় মিলেছে এবং ৭৫৫ জন অজ্ঞাত হিসেবে রয়ে গেছেন। এই সময়ের মধ্যে ৩৯২টি হত্যা মামলা, ২৬টি আত্মহত্যা মামলা এবং ২ হাজার ৭৭টি অপমৃত্যুর মামলা করেছে পুলিশ।

নৌ পুলিশ পুরো দেশের নদীপথকে ১১টি অঞ্চলে ভাগ করে নজরদারি চালায়। এগুলো হলো ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, বরিশাল, ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী, টাঙ্গাইল, খুলনা ও সিলেট। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩ বছর ৯ মাসের অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ৩৯৮টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে ঢাকা অঞ্চলে। ঢাকা অঞ্চলের অধীনে বুড়িগঙ্গা, খিলক্ষেতসংলগ্ন বালু নদ, শীতলক্ষ্যার একাংশ, দোহারসংলগ্ন পদ্মা ও নরসিংদীসংলগ্ন মেঘনা নদী অন্তর্ভুক্ত। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা নারায়ণগঞ্জে ২৫৩টি, বরিশালে ২১১টি, রাজশাহীতে ১৭৭টি, চট্টগ্রামে ১৬৭টি, ফরিদপুরে ১৪৯টি, চাঁদপুরে ১২৭টি, খুলনায় ১২৭টি, কিশোরগঞ্জে ৯৪টি, টাঙ্গাইলে ৯৩টি এবং সবচেয়ে কম সিলেটে ২০টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেও ঢাকা অঞ্চলে সর্বাধিক ৭৮টি এবং সিলেটে সর্বনিম্ন ৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

নদীতে ভাসমান লাশ উদ্ধারের পর আলামতের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করা হয় এবং ডিএনএ নমুনা ও ছবি থানায় সংরক্ষণ করে মৃতদেহ দাফনের জন্য আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সম্প্রতি গত ২৩ আগস্ট ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী থেকে মাত্র ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে এক নারী, এক শিশু এবং এক তরুণ ও তরুণীর গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কেরানীগঞ্জের মীরেরবাগ কোল্ড স্টোরেজ সংলগ্ন তীরে পাওয়া নারীর গলায় কালো কাপড় ও শিশুটির শরীরে ওড়না প্যাঁচানো ছিল। কালিন্দীর মাদারীপুর ঘাটে পাওয়া তরুণ-তরুণীর হাত একসাথে বাঁধা ও আঘাতের চিহ্ন ছিল। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম ১১ দিন পর তাদের বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে। ঘটনার পর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় পৃথক দুটি হত্যা মামলা হয়েছে। নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, খুনিরা নিজেদের বাঁচাতে নদীকে বেছে নিয়েছে; ডিএনএ নমুনা রাখা হয়েছে যাতে স্বজনেরা এলে পরিচয় মেলানো যায়।

একইভাবে গত বছরের ৩০ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের একটি নদী থেকে বাঁশের সঙ্গে ওড়না দিয়ে বাঁধা অবস্থায় এক অজ্ঞাত নারীর বিবস্ত্র মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাকে বেওয়ারিশ দাফনের পর পুলিশ স্টেশনে থাকা ছবি দেখে স্বজনেরা শনাক্ত করলে জানা যায় এটি একটি হত্যাকাণ্ড এবং পরে আসামি গ্রেপ্তার হলে সে আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়। অন্যদিকে, গত বছরের ১৬ জানুয়ারি শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধার করা অটোরিকশাচালক জব্বার হাওলাদারের (৪৫) মরদেহ ছবি ও পায়ের মোজা দেখে শনাক্ত করেন তাঁর ছেলে মাহবুবুর রহমান। তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মাইনুল ইসলাম জানান, নিখোঁজের তদন্তে নেমে আল আমিনের কাছ থেকে ব্যবহৃত মোবাইল ও পরে শাওন নামের একজনকে আটক করা হয়। শাওন স্বীকার করে, নেশাজাতীয় ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে জব্বারকে আদমজী ঘাটে নদীতে ফেলে অটোরিকশা ও ফোন ছিনতাই করে সাতজন টাকা ভাগ করে নিয়েছিল। এই ঘটনায় জড়িত চক্রের সাত সদস্যকেই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে এবং চারজন আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে।

নৌ পুলিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ময়নাতদন্তে যেসব মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখা গেছে, সেখানে শ্বাসরোধ, ধর্ষণ, মাথায় আঘাত, হাত-পা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কাটা, জখম বা বস্তাবন্দী করে পানিতে ফেলে দেওয়ার বিবরণ রয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নদীতে ভেসে ওঠার আগেই লাশে পচন ধরে আঙুলের ছাপ ও চেহারা নষ্ট হয়ে যায়, ফলে অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। দ্য মেডিকোলিগ্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক মোস্তাক রহিম জানান, পচনের কারণে বা জলজ প্রাণীর আঘাতে প্রমাণের ক্ষতি হয়। গরমের দিনে ডোবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লাশ ভাসলে মৃত্যুর কারণ বোঝা সহজ হয়। তবে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর ফরেনসিক বিভাগে আধুনিক ল্যাব ও সরঞ্জামের অভাব থাকায় বিকৃত লাশের সঠিক কারণ বের করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

নৌ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) মো. রেজাউল করিম জানান, ব্যবসায়িক শত্রুতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, মাদকের প্রভাব, পরকীয়া কিংবা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং বাণিজ্যিক এলাকায় বেশি ঘটে। নদীপথে বর্ষায় সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার ও শুষ্ক মৌসুমে সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার (যার সাড়ে তিন হাজার কিমি সচল) পাহারা দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আদমজী ঘাটের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও নির্জন পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করে গোয়েন্দা নজরদারি, সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও টহল বাড়ানো হচ্ছে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, অপরাধীরা মনে করে স্রোতে লাশ ভেসে দূরবর্তী স্থানে চলে যাবে এবং পরিচয় গোপন থাকবে। এই প্রবণতা বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিবিড় মনস্তাত্ত্বিক তদন্ত ও নদীসংলগ্ন নির্জন পয়েন্টগুলোতে নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।