লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০২:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজিতে গ্রেপ্তার নয়ন, আদাবরেও নানা অপকর্মের অভিযোগ

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের মাছের আড়তে চাঁদাবাজির অভিযোগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) আদাবর থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নয়ন হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে। বৃহস্পতিবার ডিবির পক্ষ থেকে এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানানো হলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিজের এলাকা আদাবরেও দখলদারি ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নয়ন ও তাঁর সহযোগীদের যুক্ত থাকার বিস্তৃত অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নয়ন ও তাঁর অনুসারীদের অপকর্মে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন তারা।

বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আদাবরের মনসুরাবাদ হাউজিংয়ের ৬ নম্বর সড়কে রাস্তা খুঁড়ে সংস্কার ও পানির লাইনের কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। ওই সড়কের দুই পাশে ৫০ থেকে ৬০টি ভবন রয়েছে। স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ, সড়ক সংস্কারের সুযোগে ভবনগুলোর পানি ও পয়োনিষ্কাশন নালার কাজ নিজেদের মিস্ত্রি দিয়ে করাতে বাধ্য করেছেন নয়নের অনুসারীরা। কাজ শেষ হওয়ার পর প্রতিটি ভবনমালিকের কাছ থেকে জোরপূর্বক ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি টাকা আদায় করা হয়েছে।

৬ নম্বর সড়কের একটি বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী মো. শহীদুল্লাহ জানান, তাঁদের ভবনের একটি লাইনের কাজের জন্য তিন দফায় জোরপূর্বক ২৩ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করা হয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁরা এই টাকা দিতে বাধ্য হন, অথচ সাধারণ মিস্ত্রি দিয়ে কাজটি করালে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকার মধ্যে হয়ে যেত। অন্যদিকে ৬৯ ও ৭০ নম্বর বাড়ির নালার কাজের বিল হিসেবে ৫৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। বাড়িটির তত্ত্বাবধায়ক সাজু হোসেন জানান, ভবনমালিক নিজেদের পরিচিত মিস্ত্রি দিয়ে কাজ করাতে চাইলে ছাত্রদল নেতা নয়নের অনুসারী পরিচয়ে চার-পাঁচজন এসে চাপ সৃষ্টি করে। পরে কাজ শেষে বিপুল টাকা বিল করে হুমকি দেওয়া শুরু করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি জানানো হয়।

কেবল নালার সংস্কারকাজই নয়, আদাবর থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নয়ন হোসেন ও সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মজুমদার জসিমের নেতৃত্বে থানা ছাত্রদলের নেতাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় নির্মাণাধীন ভবন, ফুটপাতের দোকান এবং ছোট-বড় এমব্রয়ডারি কারখানা থেকেও নিয়মিত চাঁদা তোলার অভিযোগ তুলেছেন বাসিন্দারা। চাঁদা না দিয়ে আদাবর এলাকায় কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তাঁরা জানান।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আদাবর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুম বাবুলের আলিফ হাউজিংয়ের একটি বাড়ি দখলের চেষ্টা করেন নয়ন ও মনিরুজ্জামান জসিমের অনুসারীরা। মাসুম বাবুলের পরিবার জানায়, বাড়িটি দখলে ব্যর্থ হয়ে তারা ফটক ও জানালার কাচ ভাঙচুর করে। ঘটনাটির ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, দখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বাকবিতণ্ডা সংঘর্ষে গড়ায়। পরে নয়নের অনুসারীদের ফটক দিয়ে বেরিয়ে যেতে ও বাইরে থেকে জানালার কাচ ভাঙচুর করতে দেখা যায়। ওই ফুটেজে আদাবর থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মজুমদার, যুগ্ম আহ্বায়ক আবির হোসেন, ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের আহ্বায়ক শাহাদাত হোসেন, ১০০ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্যসচিব সাদেক হোসেন এবং ছাত্রদল নেতা জাকির হোসেনের উপস্থিতি দেখা গেছে।

তবে বাড়ি দখলের এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন আদাবর থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মজুমদার। তাঁর দাবি, তিনি কোনো প্রকার দখল বা চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত নন; বরং উদ্ভূত সমস্যা মীমাংসার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এসব অপপ্রচার চালিয়ে তাঁকে এসব অভিযোগে জড়াচ্ছে।

উল্লেখ্য, আদাবর থানা ছাত্রদলের এই কমিটি ঢাকা মহানগর পশ্চিমের অধীনস্থ ছিল। গত মাসে গভীর রাতে মিরপুরের ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার’ নামের একটি মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে সেটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পর কেন্দ্রীয় ছাত্রদল আদাবর থানা কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে। বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক আকরাম আহমেদ ডিবির পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, প্রথমে আদাবরের চাঁদাবাজি সংক্রান্ত ঘটনায় নয়নকে আটকের কথা বলা হলেও পরে তাঁকে কারওয়ান বাজারের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আদাবরে কোনো চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলে সে বিষয়ে মামলা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি এটিকে তাঁর বিরুদ্ধে বড় ধরনের চক্রান্ত বলে দাবি করেন।

সামগ্রিক বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ জানান, কারওয়ান বাজার এলাকার একটি নির্দিষ্ট চাঁদাবাজির মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে নয়ন হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক চাঁদাবাজির অভিযোগ জমা পড়েছে, যা বর্তমানে ডিবির পক্ষ থেকে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্তে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা ও অপরাধের সত্যতা পাওয়া গেলে তাঁদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজিতে গ্রেপ্তার নয়ন, আদাবরেও নানা অপকর্মের অভিযোগ

কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজিতে গ্রেপ্তার নয়ন, আদাবরেও নানা অপকর্মের অভিযোগ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:৩৩:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের মাছের আড়তে চাঁদাবাজির অভিযোগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) আদাবর থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নয়ন হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে। বৃহস্পতিবার ডিবির পক্ষ থেকে এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানানো হলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিজের এলাকা আদাবরেও দখলদারি ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নয়ন ও তাঁর সহযোগীদের যুক্ত থাকার বিস্তৃত অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নয়ন ও তাঁর অনুসারীদের অপকর্মে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন তারা।

বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আদাবরের মনসুরাবাদ হাউজিংয়ের ৬ নম্বর সড়কে রাস্তা খুঁড়ে সংস্কার ও পানির লাইনের কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। ওই সড়কের দুই পাশে ৫০ থেকে ৬০টি ভবন রয়েছে। স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ, সড়ক সংস্কারের সুযোগে ভবনগুলোর পানি ও পয়োনিষ্কাশন নালার কাজ নিজেদের মিস্ত্রি দিয়ে করাতে বাধ্য করেছেন নয়নের অনুসারীরা। কাজ শেষ হওয়ার পর প্রতিটি ভবনমালিকের কাছ থেকে জোরপূর্বক ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি টাকা আদায় করা হয়েছে।

৬ নম্বর সড়কের একটি বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী মো. শহীদুল্লাহ জানান, তাঁদের ভবনের একটি লাইনের কাজের জন্য তিন দফায় জোরপূর্বক ২৩ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করা হয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁরা এই টাকা দিতে বাধ্য হন, অথচ সাধারণ মিস্ত্রি দিয়ে কাজটি করালে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকার মধ্যে হয়ে যেত। অন্যদিকে ৬৯ ও ৭০ নম্বর বাড়ির নালার কাজের বিল হিসেবে ৫৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। বাড়িটির তত্ত্বাবধায়ক সাজু হোসেন জানান, ভবনমালিক নিজেদের পরিচিত মিস্ত্রি দিয়ে কাজ করাতে চাইলে ছাত্রদল নেতা নয়নের অনুসারী পরিচয়ে চার-পাঁচজন এসে চাপ সৃষ্টি করে। পরে কাজ শেষে বিপুল টাকা বিল করে হুমকি দেওয়া শুরু করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি জানানো হয়।

কেবল নালার সংস্কারকাজই নয়, আদাবর থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নয়ন হোসেন ও সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মজুমদার জসিমের নেতৃত্বে থানা ছাত্রদলের নেতাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় নির্মাণাধীন ভবন, ফুটপাতের দোকান এবং ছোট-বড় এমব্রয়ডারি কারখানা থেকেও নিয়মিত চাঁদা তোলার অভিযোগ তুলেছেন বাসিন্দারা। চাঁদা না দিয়ে আদাবর এলাকায় কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তাঁরা জানান।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আদাবর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুম বাবুলের আলিফ হাউজিংয়ের একটি বাড়ি দখলের চেষ্টা করেন নয়ন ও মনিরুজ্জামান জসিমের অনুসারীরা। মাসুম বাবুলের পরিবার জানায়, বাড়িটি দখলে ব্যর্থ হয়ে তারা ফটক ও জানালার কাচ ভাঙচুর করে। ঘটনাটির ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, দখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বাকবিতণ্ডা সংঘর্ষে গড়ায়। পরে নয়নের অনুসারীদের ফটক দিয়ে বেরিয়ে যেতে ও বাইরে থেকে জানালার কাচ ভাঙচুর করতে দেখা যায়। ওই ফুটেজে আদাবর থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মজুমদার, যুগ্ম আহ্বায়ক আবির হোসেন, ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের আহ্বায়ক শাহাদাত হোসেন, ১০০ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্যসচিব সাদেক হোসেন এবং ছাত্রদল নেতা জাকির হোসেনের উপস্থিতি দেখা গেছে।

তবে বাড়ি দখলের এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন আদাবর থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মজুমদার। তাঁর দাবি, তিনি কোনো প্রকার দখল বা চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত নন; বরং উদ্ভূত সমস্যা মীমাংসার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এসব অপপ্রচার চালিয়ে তাঁকে এসব অভিযোগে জড়াচ্ছে।

উল্লেখ্য, আদাবর থানা ছাত্রদলের এই কমিটি ঢাকা মহানগর পশ্চিমের অধীনস্থ ছিল। গত মাসে গভীর রাতে মিরপুরের ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার’ নামের একটি মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে সেটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পর কেন্দ্রীয় ছাত্রদল আদাবর থানা কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে। বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক আকরাম আহমেদ ডিবির পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, প্রথমে আদাবরের চাঁদাবাজি সংক্রান্ত ঘটনায় নয়নকে আটকের কথা বলা হলেও পরে তাঁকে কারওয়ান বাজারের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আদাবরে কোনো চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলে সে বিষয়ে মামলা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি এটিকে তাঁর বিরুদ্ধে বড় ধরনের চক্রান্ত বলে দাবি করেন।

সামগ্রিক বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ জানান, কারওয়ান বাজার এলাকার একটি নির্দিষ্ট চাঁদাবাজির মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে নয়ন হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক চাঁদাবাজির অভিযোগ জমা পড়েছে, যা বর্তমানে ডিবির পক্ষ থেকে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্তে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা ও অপরাধের সত্যতা পাওয়া গেলে তাঁদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।