লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১০:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তুরস্ক ও লিবিয়ার সমুদ্রসীমা চুক্তিতে ক্ষুব্ধ মিসর ইসরায়েল ও ইইউ

দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধে বিভক্ত উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার রাজনৈতিক সমীকরণে তৈরি হয়েছে নয়া মোড়। মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে বিভক্ত দেশটির দলগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বিপরীতমুখী অবস্থানে থাকলেও ভূমধ্যসাগরের সমুদ্রসীমা ইস্যুতে তুরস্কের সঙ্গে একই কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ২০ অক্টোবর আঙ্কারার সঙ্গে সম্পাদিত কৌশলগত সমুদ্রসীমা চুক্তিটি অনুমোদন দিয়েছে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় পার্লামেন্ট। তবে আঙ্কারা ও ত্রিপোলির এই সমঝোতা মেনে নিতে পারছে না মিসর, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), গ্রিস ও ইসরায়েল। নতুন করে এই চুক্তি অনুমোদনের ফলে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের ভূরাজনীতি ও খনিজ জ্বালানি কূটনীতিতে তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

ভূমধ্যসাগরে দুই দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) এবং সমুদ্রসীমা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর প্রথম এই ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছায় আঙ্কারা ও ত্রিপোলি। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোয়ান এবং জাতিসংঘ স্বীকৃত তৎকালীন লিবীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ আল সাররাজের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরের জলসীমায় নিজেদের অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাসহ প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের আইনি ও কূটনৈতিক ভিত্তি নিশ্চিত করে তুরস্ক। তবে ২০২০ সালে চুক্তিটির তীব্র বিরোধিতা করে তা একতরফাভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় সরকার এবং শীর্ষ সামরিক কমান্ডার খলিফা হাফতার।

সাম্প্রতিক সময়ে সেই পুরোনো অবস্থান পরিবর্তন করেছে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠী। সামরিক কমান্ডার খলিফা হাফতারের ছেলে সাদ্দাম হাফতারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও ক্ষমতা নিশ্চিত করার হিসাব-নিকাশে তুরস্কের সঙ্গে কৌশলগত আপস করে পূর্বাঞ্চলীয় পার্লামেন্টও শেষ পর্যন্ত এটি অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিভক্তির অবসান ঘটিয়ে চুক্তিটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পেলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উদ্বেগ।

পার্শ্ববর্তী দেশ মিসরের দাবি, আঙ্কারা-ত্রিপোলি সমঝোতার কারণে ভূমধ্যসাগরে কায়রোর নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সমুদ্রসীমার অধিকার ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে আঙ্কারার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী থাকা সত্ত্বেও পূর্বাঞ্চলীয় সেনাপ্রধান খলিফা হাফতারের সঙ্গে তুরস্কের সামরিক বোঝাপড়া তৈরি হওয়া এবং পূর্ব লিবিয়ায় তুর্কি বাহিনীর সম্ভাব্য উপস্থিতি মিসরের প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাত্তাহ আল-সিসির প্রশাসনকে গভীর দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরোধিতার মূলে রয়েছে জোটের দুই সদস্য দেশ গ্রিস ও সাইপ্রাসের স্বার্থ রক্ষা। ব্রাসেলসের অভিযোগ, এই চুক্তি গ্রিস ও সাইপ্রাসের সার্বভৌম জলসীমার আইনগত অধিকার সরাসরি লঙ্ঘন করে। ইইউ একে জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক সনদ বা আনক্লসের (UNCLOS) নীতিমালার পরিপন্থি হিসেবে অভিহিত করেছে। তবে আঙ্কারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা আনক্লস সনদে অনুস্বাক্ষরকারী দেশ না হওয়ায় এই আন্তর্জাতিক আইনি শর্ত মানতে আইনত বাধ্য নয়।

একইভাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেল আবিব। ইসরায়েলের অভিযোগ, পূর্বাঞ্চলীয় ভূমধ্যসাগরে কৌশলগত ভারসাম্য নষ্ট করছে তুরস্ক। বিশেষ করে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরায়েলের সামরিক ও আঞ্চলিক জ্বালানি অংশীদারত্ব রয়েছে। ওই জলসীমায় তেল আবিবের পরিকল্পিত পাইপলাইন ও প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন প্রকল্পগুলোর জন্য আঙ্কারার এই অর্থনৈতিক অঞ্চল পুনর্নির্ধারণকে সরাসরি হুমকি বলে মনে করছে ইসরায়েল।

ভূমধ্যসাগরে পরাশক্তিগুলোর তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখেও নিজস্ব আইনি অবস্থান থেকে পিছু হটতে রাজি নয় তুরস্ক। আঙ্কারার দাবি, সমুদ্রসীমা সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায্যতার নীতির ওপর ভিত্তি করেই চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোন কোন পক্ষ এই সমঝোতার বিরোধিতা করছে তা আঙ্কারার জানা রয়েছে এবং বিরোধীদের এসব আপত্তিকর অবস্থানকে কোনোভাবেই প্রাধান্য দেওয়া হবে না।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দৃশ্যত এটি কেবল দুটি দেশের জলসীমা বিন্যাসের চুক্তি হলেও প্রকৃতপক্ষে এর গভীরে লুকিয়ে রয়েছে বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদের নিয়ন্ত্রণ, সামরিক প্রভাব বিস্তার এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার দ্বিমুখী লড়াই। লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় পার্লামেন্টের এই চূড়ান্ত অনুমোদনের ফলে অঞ্চলে বিরোধ নিষ্পত্তির বদলে পরাশক্তিগুলোর মুখোমুখি অবস্থান আরও কঠোর আকার ধারণ করতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

কালাইয়ে যৌথ অভিযানে মাদকসহ আটক ৪

তুরস্ক ও লিবিয়ার সমুদ্রসীমা চুক্তিতে ক্ষুব্ধ মিসর ইসরায়েল ও ইইউ

প্রকাশিত হয়েছে: ১২:০৮:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধে বিভক্ত উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার রাজনৈতিক সমীকরণে তৈরি হয়েছে নয়া মোড়। মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে বিভক্ত দেশটির দলগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বিপরীতমুখী অবস্থানে থাকলেও ভূমধ্যসাগরের সমুদ্রসীমা ইস্যুতে তুরস্কের সঙ্গে একই কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ২০ অক্টোবর আঙ্কারার সঙ্গে সম্পাদিত কৌশলগত সমুদ্রসীমা চুক্তিটি অনুমোদন দিয়েছে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় পার্লামেন্ট। তবে আঙ্কারা ও ত্রিপোলির এই সমঝোতা মেনে নিতে পারছে না মিসর, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), গ্রিস ও ইসরায়েল। নতুন করে এই চুক্তি অনুমোদনের ফলে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের ভূরাজনীতি ও খনিজ জ্বালানি কূটনীতিতে তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

ভূমধ্যসাগরে দুই দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) এবং সমুদ্রসীমা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর প্রথম এই ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছায় আঙ্কারা ও ত্রিপোলি। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোয়ান এবং জাতিসংঘ স্বীকৃত তৎকালীন লিবীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ আল সাররাজের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরের জলসীমায় নিজেদের অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাসহ প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের আইনি ও কূটনৈতিক ভিত্তি নিশ্চিত করে তুরস্ক। তবে ২০২০ সালে চুক্তিটির তীব্র বিরোধিতা করে তা একতরফাভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় সরকার এবং শীর্ষ সামরিক কমান্ডার খলিফা হাফতার।

সাম্প্রতিক সময়ে সেই পুরোনো অবস্থান পরিবর্তন করেছে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠী। সামরিক কমান্ডার খলিফা হাফতারের ছেলে সাদ্দাম হাফতারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও ক্ষমতা নিশ্চিত করার হিসাব-নিকাশে তুরস্কের সঙ্গে কৌশলগত আপস করে পূর্বাঞ্চলীয় পার্লামেন্টও শেষ পর্যন্ত এটি অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিভক্তির অবসান ঘটিয়ে চুক্তিটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পেলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উদ্বেগ।

পার্শ্ববর্তী দেশ মিসরের দাবি, আঙ্কারা-ত্রিপোলি সমঝোতার কারণে ভূমধ্যসাগরে কায়রোর নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সমুদ্রসীমার অধিকার ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে আঙ্কারার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী থাকা সত্ত্বেও পূর্বাঞ্চলীয় সেনাপ্রধান খলিফা হাফতারের সঙ্গে তুরস্কের সামরিক বোঝাপড়া তৈরি হওয়া এবং পূর্ব লিবিয়ায় তুর্কি বাহিনীর সম্ভাব্য উপস্থিতি মিসরের প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাত্তাহ আল-সিসির প্রশাসনকে গভীর দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরোধিতার মূলে রয়েছে জোটের দুই সদস্য দেশ গ্রিস ও সাইপ্রাসের স্বার্থ রক্ষা। ব্রাসেলসের অভিযোগ, এই চুক্তি গ্রিস ও সাইপ্রাসের সার্বভৌম জলসীমার আইনগত অধিকার সরাসরি লঙ্ঘন করে। ইইউ একে জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক সনদ বা আনক্লসের (UNCLOS) নীতিমালার পরিপন্থি হিসেবে অভিহিত করেছে। তবে আঙ্কারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা আনক্লস সনদে অনুস্বাক্ষরকারী দেশ না হওয়ায় এই আন্তর্জাতিক আইনি শর্ত মানতে আইনত বাধ্য নয়।

একইভাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেল আবিব। ইসরায়েলের অভিযোগ, পূর্বাঞ্চলীয় ভূমধ্যসাগরে কৌশলগত ভারসাম্য নষ্ট করছে তুরস্ক। বিশেষ করে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরায়েলের সামরিক ও আঞ্চলিক জ্বালানি অংশীদারত্ব রয়েছে। ওই জলসীমায় তেল আবিবের পরিকল্পিত পাইপলাইন ও প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন প্রকল্পগুলোর জন্য আঙ্কারার এই অর্থনৈতিক অঞ্চল পুনর্নির্ধারণকে সরাসরি হুমকি বলে মনে করছে ইসরায়েল।

ভূমধ্যসাগরে পরাশক্তিগুলোর তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখেও নিজস্ব আইনি অবস্থান থেকে পিছু হটতে রাজি নয় তুরস্ক। আঙ্কারার দাবি, সমুদ্রসীমা সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায্যতার নীতির ওপর ভিত্তি করেই চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোন কোন পক্ষ এই সমঝোতার বিরোধিতা করছে তা আঙ্কারার জানা রয়েছে এবং বিরোধীদের এসব আপত্তিকর অবস্থানকে কোনোভাবেই প্রাধান্য দেওয়া হবে না।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দৃশ্যত এটি কেবল দুটি দেশের জলসীমা বিন্যাসের চুক্তি হলেও প্রকৃতপক্ষে এর গভীরে লুকিয়ে রয়েছে বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদের নিয়ন্ত্রণ, সামরিক প্রভাব বিস্তার এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার দ্বিমুখী লড়াই। লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় পার্লামেন্টের এই চূড়ান্ত অনুমোদনের ফলে অঞ্চলে বিরোধ নিষ্পত্তির বদলে পরাশক্তিগুলোর মুখোমুখি অবস্থান আরও কঠোর আকার ধারণ করতে পারে।