লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৮:৪০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরান যুদ্ধের জেরে তেল কোম্পানির রেকর্ড মুনাফা, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক চাপ

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বড় তেল কোম্পানিগুলোর মুনাফা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের দুই বৃহৎ তেল কোম্পানি এক্সনমোবিল ও শেভরনের মোট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৬৫০ কোটি ডলারে। এই রেকর্ড আয় যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, কারণ সাধারণ ভোক্তারা জ্বালানির উচ্চমূল্যের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

গত শুক্রবার প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে শেভরনের নিট মুনাফা হয়েছে ১২ বিলিয়ন বা ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন বা ৯৬০ কোটি ডলার বেশি। একই সময়ে এক্সনমোবিলের মুনাফা হয়েছে ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৪৫০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এর আগে গত বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ জ্বালানি কোম্পানি শেলও তাদের দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় তাদের মুনাফা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

শেভরনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাইক ওয়ার্থ এই মুনাফার পেছনে নিয়ন্ত্রিত বিনিয়োগ, যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড উৎপাদন ও শোধনাগারের উচ্চ সক্ষমতাকে কৃতিত্ব দিয়েছেন। এক্সনমোবিলের সিইও ড্যারেন উডস জানান, সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যেও কার্যক্রম নির্বিঘ্নভাবে পরিচালনা করতে পারাই তাদের সাফল্যের মূল কারণ। তবে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই অতিরিক্ত মুনাফা সত্ত্বেও বড় তেল কোম্পানিগুলো নতুন তেলক্ষেত্র বা খনন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী নয়। তাদের আশঙ্কা, ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটলে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত কমে যেতে পারে, তখন নতুন বিনিয়োগের অর্থ তুলে আনা কঠিন হবে। বর্তমানে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ৯০ ডলারের কাছাকাছি, যদিও ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তা একসময় ১২০ ডলারে উঠেছিল। বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে এখন প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ৪ ডলারের বেশি, যা ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলেছে। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা তেল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ও শেলডন হোয়াইটহাউস তেল কোম্পানিগুলোর কাছে জানতে চেয়েছেন, তারা যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে কীভাবে লাভবান হয়েছে এবং যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে হোয়াইট হাউসে কোনো তদবির করেছে কি না। ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ব্র্যাড শারম্যান যুদ্ধকালীন অতিরিক্ত মুনাফার ওপর বিশেষ কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, ভোক্তাদের হয় কম দামে জ্বালানি দিতে হবে, নয়তো অতিরিক্ত মুনাফার কর থেকে প্রাপ্ত অর্থ জনগণকে ফেরত দিতে হবে।

তবে তেলশিল্প এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের (এপিআই) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডাস্টিন মেয়ার বলেন, বৈশ্বিক তেলবাজার অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও স্বচ্ছ, সেখানে মূল্য কারসাজির সুযোগ নেই। এক্সনমোবিল জানিয়েছে, আগামী চার বছরে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন ও পরিশোধন সক্ষমতা বাড়াতে তারা ৭১ বিলিয়ন বা ৭ হাজার ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। অতিরিক্ত মুনাফায় কর আরোপের বিষয়ে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, ১৯৮০ সালের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এতে প্রত্যাশিত রাজস্ব আসে না বরং দেশীয় উৎপাদন নিরুৎসাহিত হয় এবং করব্যবস্থা জটিল হয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের ধারণা, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেশি থাকলে আগামী প্রান্তিকগুলোতেও বড় তেল কোম্পানিগুলো মোটা অঙ্কের মুনাফা করবে, ফলে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, কোম্পানিগুলোর ওপর রাজনৈতিক চাপও তত বাড়তে পারে।

তখন নতুন বিনিয়োগের অর্থ তুলে আনা কঠিন হবে।প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, চলতি বছর গড়ে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ৯০ ডলার থাকলে বৈশ্বিক তেল খাতের অতিরিক্ত মুনাফা ৪২৫ বিলিয়ন বা ৪২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে উঠতে পারে।ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম একসময় ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে উঠেছিল।

জনপ্রিয় সংবাদ

পূবাইলে ডিজে পার্টির আড়ালে মাদক ব্যবসা, গ্রেপ্তার চার

ইরান যুদ্ধের জেরে তেল কোম্পানির রেকর্ড মুনাফা, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক চাপ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:৩৫:১২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বড় তেল কোম্পানিগুলোর মুনাফা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের দুই বৃহৎ তেল কোম্পানি এক্সনমোবিল ও শেভরনের মোট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৬৫০ কোটি ডলারে। এই রেকর্ড আয় যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, কারণ সাধারণ ভোক্তারা জ্বালানির উচ্চমূল্যের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

গত শুক্রবার প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে শেভরনের নিট মুনাফা হয়েছে ১২ বিলিয়ন বা ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন বা ৯৬০ কোটি ডলার বেশি। একই সময়ে এক্সনমোবিলের মুনাফা হয়েছে ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৪৫০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এর আগে গত বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ জ্বালানি কোম্পানি শেলও তাদের দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় তাদের মুনাফা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

শেভরনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাইক ওয়ার্থ এই মুনাফার পেছনে নিয়ন্ত্রিত বিনিয়োগ, যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড উৎপাদন ও শোধনাগারের উচ্চ সক্ষমতাকে কৃতিত্ব দিয়েছেন। এক্সনমোবিলের সিইও ড্যারেন উডস জানান, সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যেও কার্যক্রম নির্বিঘ্নভাবে পরিচালনা করতে পারাই তাদের সাফল্যের মূল কারণ। তবে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই অতিরিক্ত মুনাফা সত্ত্বেও বড় তেল কোম্পানিগুলো নতুন তেলক্ষেত্র বা খনন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী নয়। তাদের আশঙ্কা, ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটলে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত কমে যেতে পারে, তখন নতুন বিনিয়োগের অর্থ তুলে আনা কঠিন হবে। বর্তমানে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ৯০ ডলারের কাছাকাছি, যদিও ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তা একসময় ১২০ ডলারে উঠেছিল। বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে এখন প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ৪ ডলারের বেশি, যা ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলেছে। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা তেল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ও শেলডন হোয়াইটহাউস তেল কোম্পানিগুলোর কাছে জানতে চেয়েছেন, তারা যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে কীভাবে লাভবান হয়েছে এবং যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে হোয়াইট হাউসে কোনো তদবির করেছে কি না। ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ব্র্যাড শারম্যান যুদ্ধকালীন অতিরিক্ত মুনাফার ওপর বিশেষ কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, ভোক্তাদের হয় কম দামে জ্বালানি দিতে হবে, নয়তো অতিরিক্ত মুনাফার কর থেকে প্রাপ্ত অর্থ জনগণকে ফেরত দিতে হবে।

তবে তেলশিল্প এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের (এপিআই) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডাস্টিন মেয়ার বলেন, বৈশ্বিক তেলবাজার অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও স্বচ্ছ, সেখানে মূল্য কারসাজির সুযোগ নেই। এক্সনমোবিল জানিয়েছে, আগামী চার বছরে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন ও পরিশোধন সক্ষমতা বাড়াতে তারা ৭১ বিলিয়ন বা ৭ হাজার ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। অতিরিক্ত মুনাফায় কর আরোপের বিষয়ে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, ১৯৮০ সালের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এতে প্রত্যাশিত রাজস্ব আসে না বরং দেশীয় উৎপাদন নিরুৎসাহিত হয় এবং করব্যবস্থা জটিল হয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের ধারণা, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেশি থাকলে আগামী প্রান্তিকগুলোতেও বড় তেল কোম্পানিগুলো মোটা অঙ্কের মুনাফা করবে, ফলে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, কোম্পানিগুলোর ওপর রাজনৈতিক চাপও তত বাড়তে পারে।

তখন নতুন বিনিয়োগের অর্থ তুলে আনা কঠিন হবে।প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, চলতি বছর গড়ে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ৯০ ডলার থাকলে বৈশ্বিক তেল খাতের অতিরিক্ত মুনাফা ৪২৫ বিলিয়ন বা ৪২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে উঠতে পারে।ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম একসময় ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে উঠেছিল।