লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:৫৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও বর্তমান বাংলাদেশের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মূল্যায়ন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো একক গোষ্ঠীর আন্দোলনের ফসল ছিল না, বরং এটি ছিল স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সমাজের সম্মিলিত উত্থান। সেই সময় জাতির ঐক্য, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করার মতো তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। মানুষ চেয়েছিল একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক। তবে পরিবর্তনের প্রত্যাশা ঘিরে গড়ে ওঠা বিরল জাতীয় ঐক্য ছিল এই সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি। দুঃখজনকভাবে, তারা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ভিত্তি হিসেবে এই সামাজিক পুঁজিকে কাজে লাগানোর পরিবর্তে আমলাতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখায় মনোযোগ সীমাবদ্ধ করে ফেলে। অভিজাততান্ত্রিক ভাবনার কারণে পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি প্রত্যাশিত গভীরতা পায়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু সাফল্যের মধ্যে সামষ্টিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতা নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর উল্লেখযোগ্য। তবে তাদের মৌলিক সীমাবদ্ধতা ছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় অতিরিক্ত আমলানির্ভরতা। জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত করে কিছু উপদেষ্টার ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বিদেশিদের ওপর বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার ফলে জাতীয় প্রত্যাশা প্রশাসনিক আলোচনায় সংকুচিত হয়ে পড়ে। সংস্কারের ধারণাটি কেবল কিছু বিশেষজ্ঞের বৈঠক ও যমুনার ঘেরাটোপে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। এছাড়া তরুণ শক্তির ক্ষমতায়নের বদলে বিভ্রান্তিকর বার্তা দেওয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অস্থিরতায় ঠেলে দেওয়া এবং আন্দোলনের মালিকানা নিয়ে বিতর্ক জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করেছে।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও বৈষম্য দূর করার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো অন্তরালে রয়ে গেছে। বর্তমান নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংসদ প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিকতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তবে প্রবৃদ্ধির হার ২-এর ঘরে নেমে আসা এবং শিক্ষা খাতে অনাগ্রহের মতো বিষয়গুলো দীর্ঘমেয়াদী উদ্বেগের কারণ। নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে 'আমাদের লোক' সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা এবং শিক্ষাকে সমাজের কেন্দ্রীয় মূল্যবোধে পরিণত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ছোট দেশ ভাবার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই রাষ্ট্র মোটেই ছোট নয়। নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা ও সামাজিক উদ্যোগই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি। সব পরিবর্তন রাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী নয়, বরং ছোট ছোট সামাজিক উদ্যোগ থেকেও বড় পরিবর্তন সম্ভব। জুলাইয়ের মূল প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের চরিত্র পরিবর্তন। সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজসহ প্রতে৵ক নাগরিকের। তাই সফল বা ব্যর্থ—এই সংকীর্ণ প্রশ্নে আটকে না থেকে জুলাইয়ের সামাজিক শক্তি ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে কতটা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে, সেটিই ইতিহাসের বড় প্রশ্ন হয়ে উঠবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় দেশ গড়ার আহ্বান মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রীর

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও বর্তমান বাংলাদেশের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মূল্যায়ন

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:৩১:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো একক গোষ্ঠীর আন্দোলনের ফসল ছিল না, বরং এটি ছিল স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সমাজের সম্মিলিত উত্থান। সেই সময় জাতির ঐক্য, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করার মতো তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। মানুষ চেয়েছিল একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক। তবে পরিবর্তনের প্রত্যাশা ঘিরে গড়ে ওঠা বিরল জাতীয় ঐক্য ছিল এই সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি। দুঃখজনকভাবে, তারা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ভিত্তি হিসেবে এই সামাজিক পুঁজিকে কাজে লাগানোর পরিবর্তে আমলাতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখায় মনোযোগ সীমাবদ্ধ করে ফেলে। অভিজাততান্ত্রিক ভাবনার কারণে পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি প্রত্যাশিত গভীরতা পায়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু সাফল্যের মধ্যে সামষ্টিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতা নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর উল্লেখযোগ্য। তবে তাদের মৌলিক সীমাবদ্ধতা ছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় অতিরিক্ত আমলানির্ভরতা। জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত করে কিছু উপদেষ্টার ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বিদেশিদের ওপর বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার ফলে জাতীয় প্রত্যাশা প্রশাসনিক আলোচনায় সংকুচিত হয়ে পড়ে। সংস্কারের ধারণাটি কেবল কিছু বিশেষজ্ঞের বৈঠক ও যমুনার ঘেরাটোপে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। এছাড়া তরুণ শক্তির ক্ষমতায়নের বদলে বিভ্রান্তিকর বার্তা দেওয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অস্থিরতায় ঠেলে দেওয়া এবং আন্দোলনের মালিকানা নিয়ে বিতর্ক জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করেছে।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও বৈষম্য দূর করার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো অন্তরালে রয়ে গেছে। বর্তমান নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংসদ প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিকতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তবে প্রবৃদ্ধির হার ২-এর ঘরে নেমে আসা এবং শিক্ষা খাতে অনাগ্রহের মতো বিষয়গুলো দীর্ঘমেয়াদী উদ্বেগের কারণ। নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে 'আমাদের লোক' সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা এবং শিক্ষাকে সমাজের কেন্দ্রীয় মূল্যবোধে পরিণত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ছোট দেশ ভাবার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই রাষ্ট্র মোটেই ছোট নয়। নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা ও সামাজিক উদ্যোগই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি। সব পরিবর্তন রাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী নয়, বরং ছোট ছোট সামাজিক উদ্যোগ থেকেও বড় পরিবর্তন সম্ভব। জুলাইয়ের মূল প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের চরিত্র পরিবর্তন। সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজসহ প্রতে৵ক নাগরিকের। তাই সফল বা ব্যর্থ—এই সংকীর্ণ প্রশ্নে আটকে না থেকে জুলাইয়ের সামাজিক শক্তি ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে কতটা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে, সেটিই ইতিহাসের বড় প্রশ্ন হয়ে উঠবে।