লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৩:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই আন্দোলনে প্রবাসীদের নীরব ভূমিকা ও রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অবদান

ইতিহাস যখন লেখা হয়, তখন মূলত রাজপথের আন্দোলন, ব্যারিকেড, স্লোগান এবং রক্তক্ষয়ী অধ্যায়গুলোই দৃশ্যমান হয়। তবে এই ইতিহাসের আরেকটি অদৃশ্য ও গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান। জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে যখন দেশের ভেতরে শিক্ষার্থীরা জীবন বাজি রেখে লড়াই করছিলেন, তখন লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, টরন্টো, দুবাই, রিয়াদ, রোম বা কুয়ালালামপুরের মতো শহরগুলো থেকে হাজারো প্রবাসী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে এক নীরব আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তাদের এই প্রয়াস কেবল রাজনৈতিক সংহতি ছিল না, বরং এটি ছিল আত্মপরিচয়ের এক গভীর প্রশ্ন।

রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। জুলাই মাসে দেশে প্রায় ১.৯১ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে, যা আগের মাসগুলোর তুলনায় কম ছিল। প্রবাসীদের একটি অংশের সীমিত সময়ের জন্য রেমিট্যান্স না পাঠানোর আহ্বান কেবল একটি অনলাইন প্রচারণা ছিল না, বরং এটি ছিল অর্থনীতির ভাষায় প্রতীকী চাপ সৃষ্টির চেষ্টা। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পতনের পেছনে মৌসুমি প্রবণতা, হুন্ডি এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের মতো বিভিন্ন কারণও সক্রিয় ছিল। ৫ আগস্টের পর থেকে রেমিট্যান্সের প্রবাহ আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে, যা ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানো এবং নতুন অর্থনৈতিক প্রত্যাশারই প্রতিফলন।

গত দেড় দশকে অনেক সাংবাদিক, লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী দেশ ছেড়ে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় আশ্রয় নিয়েছেন। প্রবাসভিত্তিক এসব প্ল্যাটফর্ম দেশে সংবাদমাধ্যমের সীমাবদ্ধতার বিপরীতে বিকল্প তথ্যপ্রবাহের জায়গা তৈরি করে দিয়েছিল। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন সঠিক তথ্যের দুয়ার খুলে দিয়েছিল, তেমনি গুজবের ঝুঁকিও ছিল প্রবল। তাই ইতিহাসের প্রতি দায়িত্বশীল হতে সত্যের প্রতি আনুগত্য ছিল অপরিহার্য।

প্রবাসীদের এই অবদানের পাশাপাশি কিছু তিক্ত বাস্তবতাও রয়ে গেছে। প্রবাসীরা আজও বিমানবন্দরে হয়রানি, বিদেশে শ্রমবাজারে প্রতারণা এবং দূতাবাসের সেবায় অসন্তোষের শিকার হন। জাতীয় উন্নয়রের অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও নীতিনির্ধারণের টেবিলে তাদের প্রতিনিধিত্ব নেই বললেই চলে। রাষ্ট্র যখন ডলারের প্রয়োজনে প্রবাসীদের দিকে তাকায়, তখন তাদের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার অংশীদার হিসেবে কতটা মূল্যায়ন করে, সেই প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত।

আধুনিক যুগে ভৌগোলিক দূরত্ব যে রাজনৈতিক দূরত্ব নয়, তা জুলাই আন্দোলন প্রমাণ করেছে। স্মার্টফোন ও ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার যুগে একজন প্রবাসীও দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রভাব ফেলতে পারেন। রাষ্ট্র যদি এই শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তবে তা উন্নয়নের বড় সম্পদে পরিণত হতে পারে। অন্যথায়, এটি অসন্তোষের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে রূপ নিতে পারে। ইতিহাসের পাতায় রাজপথের বীরদের পাশাপাশি প্রবাসের এই নীরব যোদ্ধাদেরও সমান মর্যাদায় স্থান পাওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশে রেমিট্যান্স আসে প্রায় ১.৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের মাসগুলোর তুলনায় কম ছিল। তবে এই পতনের পেছনে কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচিই কাজ করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। মৌসুমি প্রবণতা, ব্যাংকিং চ্যানেলের ব্যবহার, হুন্ডি, বৈশ্বিক শ্রমবাজার সবকিছুই রেমিট্যান্সের ওপর

এই ৫৭ জনের গল্প শুধু কয়েকজন মানুষের নয়। এটি সেই প্রবাসীদের প্রতীক, যারা নিজের দেশের জন্য কথা বলতে গিয়ে বিদেশের মাটিতেও মূল্য চুকিয়েছেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে তথ্যচিত্র নিয়ে হট্টগোল

জুলাই আন্দোলনে প্রবাসীদের নীরব ভূমিকা ও রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অবদান

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮:০৬:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

ইতিহাস যখন লেখা হয়, তখন মূলত রাজপথের আন্দোলন, ব্যারিকেড, স্লোগান এবং রক্তক্ষয়ী অধ্যায়গুলোই দৃশ্যমান হয়। তবে এই ইতিহাসের আরেকটি অদৃশ্য ও গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান। জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে যখন দেশের ভেতরে শিক্ষার্থীরা জীবন বাজি রেখে লড়াই করছিলেন, তখন লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, টরন্টো, দুবাই, রিয়াদ, রোম বা কুয়ালালামপুরের মতো শহরগুলো থেকে হাজারো প্রবাসী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে এক নীরব আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তাদের এই প্রয়াস কেবল রাজনৈতিক সংহতি ছিল না, বরং এটি ছিল আত্মপরিচয়ের এক গভীর প্রশ্ন।

রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। জুলাই মাসে দেশে প্রায় ১.৯১ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে, যা আগের মাসগুলোর তুলনায় কম ছিল। প্রবাসীদের একটি অংশের সীমিত সময়ের জন্য রেমিট্যান্স না পাঠানোর আহ্বান কেবল একটি অনলাইন প্রচারণা ছিল না, বরং এটি ছিল অর্থনীতির ভাষায় প্রতীকী চাপ সৃষ্টির চেষ্টা। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পতনের পেছনে মৌসুমি প্রবণতা, হুন্ডি এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের মতো বিভিন্ন কারণও সক্রিয় ছিল। ৫ আগস্টের পর থেকে রেমিট্যান্সের প্রবাহ আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে, যা ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানো এবং নতুন অর্থনৈতিক প্রত্যাশারই প্রতিফলন।

গত দেড় দশকে অনেক সাংবাদিক, লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী দেশ ছেড়ে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় আশ্রয় নিয়েছেন। প্রবাসভিত্তিক এসব প্ল্যাটফর্ম দেশে সংবাদমাধ্যমের সীমাবদ্ধতার বিপরীতে বিকল্প তথ্যপ্রবাহের জায়গা তৈরি করে দিয়েছিল। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন সঠিক তথ্যের দুয়ার খুলে দিয়েছিল, তেমনি গুজবের ঝুঁকিও ছিল প্রবল। তাই ইতিহাসের প্রতি দায়িত্বশীল হতে সত্যের প্রতি আনুগত্য ছিল অপরিহার্য।

প্রবাসীদের এই অবদানের পাশাপাশি কিছু তিক্ত বাস্তবতাও রয়ে গেছে। প্রবাসীরা আজও বিমানবন্দরে হয়রানি, বিদেশে শ্রমবাজারে প্রতারণা এবং দূতাবাসের সেবায় অসন্তোষের শিকার হন। জাতীয় উন্নয়রের অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও নীতিনির্ধারণের টেবিলে তাদের প্রতিনিধিত্ব নেই বললেই চলে। রাষ্ট্র যখন ডলারের প্রয়োজনে প্রবাসীদের দিকে তাকায়, তখন তাদের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার অংশীদার হিসেবে কতটা মূল্যায়ন করে, সেই প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত।

আধুনিক যুগে ভৌগোলিক দূরত্ব যে রাজনৈতিক দূরত্ব নয়, তা জুলাই আন্দোলন প্রমাণ করেছে। স্মার্টফোন ও ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার যুগে একজন প্রবাসীও দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রভাব ফেলতে পারেন। রাষ্ট্র যদি এই শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তবে তা উন্নয়নের বড় সম্পদে পরিণত হতে পারে। অন্যথায়, এটি অসন্তোষের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে রূপ নিতে পারে। ইতিহাসের পাতায় রাজপথের বীরদের পাশাপাশি প্রবাসের এই নীরব যোদ্ধাদেরও সমান মর্যাদায় স্থান পাওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশে রেমিট্যান্স আসে প্রায় ১.৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের মাসগুলোর তুলনায় কম ছিল। তবে এই পতনের পেছনে কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচিই কাজ করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। মৌসুমি প্রবণতা, ব্যাংকিং চ্যানেলের ব্যবহার, হুন্ডি, বৈশ্বিক শ্রমবাজার সবকিছুই রেমিট্যান্সের ওপর

এই ৫৭ জনের গল্প শুধু কয়েকজন মানুষের নয়। এটি সেই প্রবাসীদের প্রতীক, যারা নিজের দেশের জন্য কথা বলতে গিয়ে বিদেশের মাটিতেও মূল্য চুকিয়েছেন।