লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০১:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অর্থনৈতিক সংকটকে ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার আহ্বান অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমানের

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকির গভীরতা স্বীকার করে দেশে ‘অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন পানাম ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান। মঙ্গলবার সাপ্তাহিক কাউন্টারপয়েন্ট-এ প্রকাশিত ‘এ স্টেট অব ইকোনমিক ইমার্জেন্সি’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি এই সতর্কবার্তা দেন। তিনি উল্লেখ করেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশ দীর্ঘমেয়াদে স্থবির প্রবৃদ্ধি, দুর্বল বিনিয়োগ ও মূল্যস্ফীতির বেড়াজালে আটকে পড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাসেও দেশের অর্থনীতির এই করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। আইএমএফ ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। সংস্থাটির মতে, ২০৩১ অর্থবছরের আগে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশে নামার সম্ভাবনা কম। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০২৬ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ ০ দশমিক ৫ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে এবং পরবর্তী ২০২৭ ও ২০২৮ অর্থবছরে বিনিয়োগ বৃদ্ধির হার যথাক্রমে মাত্র ০ দশমিক ৩ ও ১ শতাংশ হতে পারে।

বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার প্রভাবে দেশে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধির শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এপ্রিলের প্রাক্কলনে ২০২৫ অর্থবছরে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে দারিদ্র্যের হার কমে ২০২৮ অর্থবছরে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ হওয়ার ধারণা করা হয়েছিল। তবে পরিবর্তিত পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৮ অর্থবছরে ২২ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

চলতি দশকের শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আয় জিডিপির প্রায় ৮ শতাংশে আটকে থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ, যা আগে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ হওয়ার ধারণা ছিল। অপরদিকে সরকারি ব্যয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে সুদের পরিশোধে। ২০২৫ অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্বের ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ পরিশোধে লাগলেও ২০৩১ অর্থবছরে তা প্রায় ৪০ শতাংশ স্পর্শ করতে পারে।

জ্যোতি রহমান জানান, এই আর্থিক সংকটের পেছনে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বা বৈশ্বিক উত্তাপ দায়ী নয়। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, করপোরেট খাতের নগদ অর্থ সংকট, বিনিয়োগের অভাব ও নীতিগত অনিশ্চয়তা অভ্যন্তরীণ পুনরুদ্ধারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাগাতার প্রবৃদ্ধির মন্দা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও প্রকৃত মজুরি কমিয়ে দিচ্ছে, পাশাপাশি শ্রমবাজারে অংশগ্রহণও কমছে। বিনিয়োগে স্থবিরতা বজায় থাকলে সার্বিক প্রবৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সরকারি রাজস্ব আদায় তিনটি ক্ষেত্রই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভঙ্গুরতার কারণে ঋণপ্রবাহ বিঘ্নিত হচ্ছে এবং অতিরিক্ত ঋণে জর্জরিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নতুন বিনিয়োগ সক্ষমতাও হারাচ্ছে।

সংকট মোকাবিলায় শুধু মুদ্রানীতি শিথিল করা বা সাময়িক ঋণসহায়তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন জ্যোতি রহমান। তিনি ব্যাংক ও করপোরেট খাতের সুনির্দিষ্ট পুনর্গঠন, সতর্ক রাজস্বনীতি, স্থিতিশীল বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, ভর্তুকি সংস্কার এবং ঝুঁকিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার সুপারিশ করেছেন। তিনি মনে করেন, বড় ধরনের সংস্কার সফল হলেও চলতি দশক শেষ হওয়ার আগে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই সরকারের উচিত ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত ক্ষতির হিসাব প্রকাশ করা, সংকটের সার্বিক ভয়াবহতা প্রকাশ্যে স্বীকার করা এবং ব্যয়সংকোচন বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া।

পরিস্থিতির ধারাবাহিকভাবে অবনতি হওয়ায় আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলো বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস একের পর এক ছাঁটাই করছে। আইএমএফের পূর্বাভাসে ২০২৭ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৮ অর্থবছরের পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, আগামী দশকেও দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে থাকতে পারে। একইভাবে বিশ্বব্যাংক ২০২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০২৮ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ করেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাজেকে সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলি

অর্থনৈতিক সংকটকে ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার আহ্বান অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমানের

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:৫০:৩৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকির গভীরতা স্বীকার করে দেশে ‘অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন পানাম ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান। মঙ্গলবার সাপ্তাহিক কাউন্টারপয়েন্ট-এ প্রকাশিত ‘এ স্টেট অব ইকোনমিক ইমার্জেন্সি’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি এই সতর্কবার্তা দেন। তিনি উল্লেখ করেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশ দীর্ঘমেয়াদে স্থবির প্রবৃদ্ধি, দুর্বল বিনিয়োগ ও মূল্যস্ফীতির বেড়াজালে আটকে পড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাসেও দেশের অর্থনীতির এই করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। আইএমএফ ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। সংস্থাটির মতে, ২০৩১ অর্থবছরের আগে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশে নামার সম্ভাবনা কম। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০২৬ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ ০ দশমিক ৫ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে এবং পরবর্তী ২০২৭ ও ২০২৮ অর্থবছরে বিনিয়োগ বৃদ্ধির হার যথাক্রমে মাত্র ০ দশমিক ৩ ও ১ শতাংশ হতে পারে।

বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার প্রভাবে দেশে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধির শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এপ্রিলের প্রাক্কলনে ২০২৫ অর্থবছরে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে দারিদ্র্যের হার কমে ২০২৮ অর্থবছরে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ হওয়ার ধারণা করা হয়েছিল। তবে পরিবর্তিত পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৮ অর্থবছরে ২২ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

চলতি দশকের শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আয় জিডিপির প্রায় ৮ শতাংশে আটকে থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ, যা আগে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ হওয়ার ধারণা ছিল। অপরদিকে সরকারি ব্যয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে সুদের পরিশোধে। ২০২৫ অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্বের ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ পরিশোধে লাগলেও ২০৩১ অর্থবছরে তা প্রায় ৪০ শতাংশ স্পর্শ করতে পারে।

জ্যোতি রহমান জানান, এই আর্থিক সংকটের পেছনে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বা বৈশ্বিক উত্তাপ দায়ী নয়। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, করপোরেট খাতের নগদ অর্থ সংকট, বিনিয়োগের অভাব ও নীতিগত অনিশ্চয়তা অভ্যন্তরীণ পুনরুদ্ধারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাগাতার প্রবৃদ্ধির মন্দা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও প্রকৃত মজুরি কমিয়ে দিচ্ছে, পাশাপাশি শ্রমবাজারে অংশগ্রহণও কমছে। বিনিয়োগে স্থবিরতা বজায় থাকলে সার্বিক প্রবৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সরকারি রাজস্ব আদায় তিনটি ক্ষেত্রই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভঙ্গুরতার কারণে ঋণপ্রবাহ বিঘ্নিত হচ্ছে এবং অতিরিক্ত ঋণে জর্জরিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নতুন বিনিয়োগ সক্ষমতাও হারাচ্ছে।

সংকট মোকাবিলায় শুধু মুদ্রানীতি শিথিল করা বা সাময়িক ঋণসহায়তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন জ্যোতি রহমান। তিনি ব্যাংক ও করপোরেট খাতের সুনির্দিষ্ট পুনর্গঠন, সতর্ক রাজস্বনীতি, স্থিতিশীল বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, ভর্তুকি সংস্কার এবং ঝুঁকিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার সুপারিশ করেছেন। তিনি মনে করেন, বড় ধরনের সংস্কার সফল হলেও চলতি দশক শেষ হওয়ার আগে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই সরকারের উচিত ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত ক্ষতির হিসাব প্রকাশ করা, সংকটের সার্বিক ভয়াবহতা প্রকাশ্যে স্বীকার করা এবং ব্যয়সংকোচন বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া।

পরিস্থিতির ধারাবাহিকভাবে অবনতি হওয়ায় আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলো বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস একের পর এক ছাঁটাই করছে। আইএমএফের পূর্বাভাসে ২০২৭ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৮ অর্থবছরের পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, আগামী দশকেও দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে থাকতে পারে। একইভাবে বিশ্বব্যাংক ২০২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০২৮ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ করেছে।