লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:০৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশে প্রয়োজনীয় সব টিকা পাওয়া শিশুর হার কমছে, প্রাদুর্ভাবের শঙ্কা

বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় সব কটি টিকা পাওয়া শিশুর হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও রোগ নজরদারি ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে দেশি ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের এক যৌথ মূল্যায়ন দল জানিয়েছে, দেশের টিকাদান পদ্ধতির অবনতি ঘটেছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে হাম, হুপিং কাশি ও ডিফথেরিয়ার মতো সংক্রামক ব্যাধির বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশে এখনো অনুমোদিত কোনো জাতীয় টিকানীতি নেই; ২০১৩ সালে খসড়া নীতি তৈরি করা হলেও তা পাসের মুখ দেখেনি।

রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক কর্মশালায় গত বুধবার এই মূল্যায়নের তথ্য তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক মঞ্চ গ্যাভি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অধিদপ্তর এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত ৭০ জনের বিশেষজ্ঞ দল নয়টি বিভাগে ভাগ হয়ে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা জনস্বাস্থ্যবিদ ক্যাটরিনা ক্রেটসিঙ্গারের নেতৃত্বে গঠিত এই যৌথ দলটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে টিকাদান কর্মসূচির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করেছে। আগামী মাসের মাঝামাঝি সময়ে দলটি লিখিত প্রতিবেদন ও সুপারিশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেবে।

মূল্যায়ন প্রতিবেদনে শিশুদের সুরক্ষার চিত্র তুলে ধরে জানানো হয়, বিসিজি, পেন্টা ৩ এবং হাম-রুবেলার টিকা পাওয়া শিশুদের 'পূর্ণ সুরক্ষিত' হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে পূর্ণ সুরক্ষিত শিশুর হার ছিল ৮২.৩ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে বেড়ে ৮৩.৯ শতাংশে পৌঁছায়। কিন্তু ২০২৩ সালে তা কমে ৮১.৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৯৫ শতাংশ শিশু। দুর্বল স্থানীয় পরিকল্পনার কারণে প্রতিবছর টিকা পাওয়ার যোগ্য ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিশু টিকার আওতা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। হসেব অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৮ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৯ শিশু হাম-রুবেলার টিকা না পাওয়ায় অনাক্রম্যতায় বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এই ব্যর্থতার ফলেই ২০২৬ সালে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

মাঠপর্যায়ে টিকার কোল্ড চেইন বজায় রাখা ও সংরক্ষণে গুরুতর ত্রুটি চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক জায়গায় টিটেনাস-ডিফথেরিয়া (টিডি) টিকা জমাট বেঁধে যাওয়া এবং দ্বিতীয় স্তরের ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় পাওয়া গেছে। পাশাপাশি তাপমাত্রা ঠিকভাবে পরিমাপ না করা ও তদারকির অভাবও স্পষ্ট। অন্যদিকে, ইপিআইয়ে তীব্র জনবলসংকট কাজ ব্যাহত করছে। বর্তমান জনবলকাঠামো নির্ধারিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালে, যা বর্ধিত জনসংখ্যা ও জটিলতার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। বর্তমানে অনুমোদিত পদের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পদই শূন্য রয়েছে। স্বাস্থ্য সহকারী, পরিদর্শক, ডেটা কর্মী, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, স্টোরকিপার, কোল্ড-চেইন টেকনিশিয়ান ও পোর্টার পদে ঘাটতি থাকায় নতুন বাদ পড়া শিশু খুঁজে বের করা এবং তদারকি থমকে গেছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে যৌথ মূল্যায়ন দল আগামী ছয় মাসের জন্য জরুরি ভিত্তিতে কিছু সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কোনো শিশু যাতে বাদ না পড়ে সে জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক স্থানীয় টিকাদান পরিকল্পনা গ্রহণ, অবিলম্বে শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ এবং শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের বয়সসীমা বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা। মধ্যমেয়াদে (৬ থেকে ২৪ মাস) ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক কৌশলের সঙ্গে মিলিয়ে জাতীয় টিকা কৌশলপত্র হালনাগাদ করা, জেলা ও শহর এলাকায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির আগে টিকাদানের সনদ যাচাই করা, সম্পূর্ণ ইপিআই কার্যক্রম একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) আওতায় আনা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় পর্যায়ের বাইরেও হাম-রুবেলা ও পোলিও পরীক্ষাগার সম্প্রসারণ এবং নজরদারির জন্য পৃথক স্বাস্থ্যকর্মী দল গঠনের তাগিদ দেওয়া হয়।

এই মূল্যায়নের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানিয়েছেন, প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে হাতে পেলে তারা জনস্বাস্থ্যবিদ ও নাইটাইগের (NITAG) সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে শূন্য পদে নিয়োগপ্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। টিকাদানকারীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি সূর্যের আলো বা অধিক তাপমাত্রাযুক্ত খোলা স্থানে আর কোনো টিকাকেন্দ্র না রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। টিকার জোগান সুনিশ্চিত করতে আলাদাভাবে 'বাফার স্টক' গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

জনপ্রিয় সংবাদ

জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু ফরিদপুর জেলা পরিষদের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের

দেশে প্রয়োজনীয় সব টিকা পাওয়া শিশুর হার কমছে, প্রাদুর্ভাবের শঙ্কা

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:০৪:২৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় সব কটি টিকা পাওয়া শিশুর হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও রোগ নজরদারি ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে দেশি ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের এক যৌথ মূল্যায়ন দল জানিয়েছে, দেশের টিকাদান পদ্ধতির অবনতি ঘটেছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে হাম, হুপিং কাশি ও ডিফথেরিয়ার মতো সংক্রামক ব্যাধির বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশে এখনো অনুমোদিত কোনো জাতীয় টিকানীতি নেই; ২০১৩ সালে খসড়া নীতি তৈরি করা হলেও তা পাসের মুখ দেখেনি।

রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক কর্মশালায় গত বুধবার এই মূল্যায়নের তথ্য তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক মঞ্চ গ্যাভি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অধিদপ্তর এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত ৭০ জনের বিশেষজ্ঞ দল নয়টি বিভাগে ভাগ হয়ে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা জনস্বাস্থ্যবিদ ক্যাটরিনা ক্রেটসিঙ্গারের নেতৃত্বে গঠিত এই যৌথ দলটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে টিকাদান কর্মসূচির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করেছে। আগামী মাসের মাঝামাঝি সময়ে দলটি লিখিত প্রতিবেদন ও সুপারিশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেবে।

মূল্যায়ন প্রতিবেদনে শিশুদের সুরক্ষার চিত্র তুলে ধরে জানানো হয়, বিসিজি, পেন্টা ৩ এবং হাম-রুবেলার টিকা পাওয়া শিশুদের 'পূর্ণ সুরক্ষিত' হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে পূর্ণ সুরক্ষিত শিশুর হার ছিল ৮২.৩ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে বেড়ে ৮৩.৯ শতাংশে পৌঁছায়। কিন্তু ২০২৩ সালে তা কমে ৮১.৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৯৫ শতাংশ শিশু। দুর্বল স্থানীয় পরিকল্পনার কারণে প্রতিবছর টিকা পাওয়ার যোগ্য ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিশু টিকার আওতা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। হসেব অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৮ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৯ শিশু হাম-রুবেলার টিকা না পাওয়ায় অনাক্রম্যতায় বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এই ব্যর্থতার ফলেই ২০২৬ সালে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

মাঠপর্যায়ে টিকার কোল্ড চেইন বজায় রাখা ও সংরক্ষণে গুরুতর ত্রুটি চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক জায়গায় টিটেনাস-ডিফথেরিয়া (টিডি) টিকা জমাট বেঁধে যাওয়া এবং দ্বিতীয় স্তরের ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় পাওয়া গেছে। পাশাপাশি তাপমাত্রা ঠিকভাবে পরিমাপ না করা ও তদারকির অভাবও স্পষ্ট। অন্যদিকে, ইপিআইয়ে তীব্র জনবলসংকট কাজ ব্যাহত করছে। বর্তমান জনবলকাঠামো নির্ধারিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালে, যা বর্ধিত জনসংখ্যা ও জটিলতার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। বর্তমানে অনুমোদিত পদের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পদই শূন্য রয়েছে। স্বাস্থ্য সহকারী, পরিদর্শক, ডেটা কর্মী, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, স্টোরকিপার, কোল্ড-চেইন টেকনিশিয়ান ও পোর্টার পদে ঘাটতি থাকায় নতুন বাদ পড়া শিশু খুঁজে বের করা এবং তদারকি থমকে গেছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে যৌথ মূল্যায়ন দল আগামী ছয় মাসের জন্য জরুরি ভিত্তিতে কিছু সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কোনো শিশু যাতে বাদ না পড়ে সে জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক স্থানীয় টিকাদান পরিকল্পনা গ্রহণ, অবিলম্বে শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ এবং শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের বয়সসীমা বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা। মধ্যমেয়াদে (৬ থেকে ২৪ মাস) ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক কৌশলের সঙ্গে মিলিয়ে জাতীয় টিকা কৌশলপত্র হালনাগাদ করা, জেলা ও শহর এলাকায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির আগে টিকাদানের সনদ যাচাই করা, সম্পূর্ণ ইপিআই কার্যক্রম একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) আওতায় আনা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় পর্যায়ের বাইরেও হাম-রুবেলা ও পোলিও পরীক্ষাগার সম্প্রসারণ এবং নজরদারির জন্য পৃথক স্বাস্থ্যকর্মী দল গঠনের তাগিদ দেওয়া হয়।

এই মূল্যায়নের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানিয়েছেন, প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে হাতে পেলে তারা জনস্বাস্থ্যবিদ ও নাইটাইগের (NITAG) সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে শূন্য পদে নিয়োগপ্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। টিকাদানকারীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি সূর্যের আলো বা অধিক তাপমাত্রাযুক্ত খোলা স্থানে আর কোনো টিকাকেন্দ্র না রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। টিকার জোগান সুনিশ্চিত করতে আলাদাভাবে 'বাফার স্টক' গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।